দিল্লির চোখে বাংলাদেশকে দেখে না ওয়াশিংটন

  

পিএনএস ডেস্ক : প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকা সফরকারী মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই-বিগান জানিয়েছেন, এশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে কেন্দ্রবিন্দুতেই বাংলাদেশের অবস্থান। ভূ-রাজনৈতিক ওই অবস্থান বিবেচনায় বাংলাদেশ সফর করছেন স্টেট ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদধারী বিগান।

গত চার বছরে ক্ষমতাসীন ট্রাম্প প্রশাসনের এতো উচ্চপর্যায়ের কোনো প্রতিনিধির এটাই প্রথম বাংলাদেশ সফর। তাৎপর্যপূর্ণ ওই সফরে বুধবার বিকালে ঢাকায় পৌঁছান তিনি। সফরের প্রথম দিন সন্ধ্যায় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে। সেখানে দু’দেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বৃহস্পতিবার দিনভর সিরিজ কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় পার করেন তিনি।

জাতির জনকের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া দিনটির গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক। পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যৌথ সংবাদ সম্মেলনও করেন। সেখানে তার সফরের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন বিগান।

সন্ধ্যায় অবশ্য গণমাধ্যমের সঙ্গে পৃথক মতবিনিময় হয়েছে তার। এদিকে সন্ধ্যায় গণমাধ্যমের ক’জন প্রতিনিধির সঙ্গে মতবিনিময় কালে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই বিগান জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ক সহযোগিতার সমপর্ক বাড়াতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকা সফরে এ নিয়ে তিনি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ সহযোগিতামূলক সমপর্ক রয়েছে। সমপ্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন।

এতেও এই প্রসঙ্গ উঠে আসে বলে জানান বিগান। ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সফরে এ বিষয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে যে মার্কিন চেষ্টা রয়েছে তাতে বাংলাদেশের সক্রিয়তা কামনা করে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম বলে জানান বিগান।

সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ না করেই সমপ্রতি লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোলসহ (ভারত-চীন সীমান্ত), জাপান সাগর, তাইওয়ান এবং হংকং-এ যে উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে তা সমাধানের ওপর জোর দেন তিনি। একইসঙ্গে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নির্দিষ্ট কোনো দেশের বিরুদ্ধে নয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় সুশাসন ও মানবাধিকারের ওপর জোর দেয় এবং আশা করে তার সহযোগী রাষ্ট্রগুলোতেও এসব ইস্যুকে গুরুত্ব দেয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে যথাযথ গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের চর্চা ধরে রাখতে উৎসাহিত করে।

তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আজ সকালে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে তার ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা।

ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগান। পরে অভিন্ন ভেন্যুতে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন তিনি। সেখানে বলেন, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত অংশীদাররিত্ব এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে বিশদ আলোচনা চলছে। বাংলাদেশে এই প্রথম সফর করছেন জানিয়ে, বিগান বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি।

যুক্তরাষ্ট্র মনে করে বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। আমরা এই অংশীদারিত্ব এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক বিজনেস ফোরামে বাংলাদেশ অংশগ্রহণ করবে। আমরা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করবো। মিয়ামিতে বাংলাদেশ কনস্যুলেট খোলার প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র এরইমধ্যে সায় দিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর ফলে সেখানে অবস্থিত বাংলাদেশিরা উপকৃত হবে। কোভিডের কারণে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কার্যক্রমে খানিক বিঘ্ন ঘটছে জানিয়ে ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট বলেন, মিশনের কাজ পুরোদমে শুরু করার জন্য আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি, যাতে ছাত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে।

সংবাদ সম্মেলনের সূচনা বক্তৃতা শেষে ৩টি প্রশ্নের জবাবও দেন তিনি। সেখানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ক একাধিক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা শুধু বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়; বরং বৈশ্বিক অগ্রাধিকার। এ সমস্যা নিয়ে তার সফরে আলোচনা হয়েছে এবং একটি স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র যতদূর সম্ভব সবাইকে নিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের চেষ্টা করবে, যাতে করে রোহিঙ্গাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়। তিনি বলেন, একইসঙ্গে আমি জোর দিতে চাই এ সমস্যা সমাধানের জন্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উদ্যোগের ওপর। এই অঞ্চলের অন্যদেশগুলোরও মিয়ানমারের সঙ্গে কথা বলা দরকার, যাতে করে এই সমস্যার সমাধান হয় জানিয়ে ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র একমত এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আরও বেশি করে এ বিষয়ে আলোচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র ওয়াকিবহাল এবং রোহিঙ্গাদের অধিকারের বিষয়ে বলে আমরা মিয়ানমারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবো। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন মার্কিন মন্ত্রী, বিশেষত বিগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের ঢাকা সফরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। বলেন, আমাদের দুই দেশের যে সলিড বা খাঁটি সম্পর্ক রয়েছে এটি আরও বিস্তৃৃত এবং গভীরতর করতে ‘বন্ধু’ বিগানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকা, এ দেশের যে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং সম্ভাবনা রয়েছে তার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রসহ দুনিয়ার দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে নিবদ্ধ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এবং আমেরিকার সম্পর্ক দিন দিন সুদৃঢ় হচ্ছে। এই উন্নতি অব্যাহত থাকবে, তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। মার্কিন মন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন থেকে বিদায় জানানোর পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন উপস্থিত গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী মোমেন দাবি করেন, বৈঠকে ইন্দো- প্যাসিফিক নিয়ে তার সঙ্গে বিগানের কোনো আলোচনাই হয়নি। ডিফেন্স কো-অপারেশন বা মার্কিন অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব সংক্রান্ত নিজের (পররাষ্ট্রমন্ত্রীর) বক্তব্যের সূত্র ধরে গত ক’দিন ধরে গণমাধ্যমে যে লেখালেখি চলছে তা নিয়েও আনুষ্ঠানিক বৈঠকে কোনো কথাই হয়নি বলে দাবি বরেন মোমেন। তার বক্তব্যটি ছিল এমন ‘ডিফেন্স কো-অপারেশন’ বা অন্য যেসব বিষয়ে আপনারা কয়েকদিন ধরে লিখেছেন, তা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

দিল্লির চোখে বাংলাদেশকে দেখে না ওয়াশিংটন: মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগানের সঙ্গে আলোচনা ও বিদায়ের পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দিল্লির চোখে দেখে না। বরং বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিকে বিবেচনায় নেয় কি না?

এমন প্রশ্নের জবাবে আব্দুল মোমেনের ভাষ্যটি ছিল এমন- ‘যুক্তরাষ্ট্র দিল্লির চোখ দিয়ে বাংলাদেশকে দেখে, এটি আমাদের মিডিয়া বলে। আসলে তারা দিল্লির চোখে দেখে না। আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। সবাই জানে আমাদের মূল্যবোধ ও নীতি আছে। আমাদের অবস্থান সব সময় স্বাধীন। আমরা দেশের স্বার্থের জন্য যা যা দরকার, তাই করবো। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সেজন্য তারা আমাদের স্বাধীনভাবে দেখছে, দিল্লির চেহারা দিয়ে আমাদের দেখে না। শুধু দিল্লির চেহারা দিয়ে দেখলে এখানে আসতেন না।

এখানে তারা এসেছেন আমাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য। বাংলাদেশের সঙ্গে তারা বন্ধুত্বটা আরও গভীর করতে চায়। এ সময় পররাষ্টমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ অনেক বেড়েছে। এর অনেক কারণ আছে এবং এর মধ্যে আছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র এবং এর ফলে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত দৃঢ়।’

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা জটিলতার ইস্যুটি যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি সেক্রেটারি নিজে তুলেছেন জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ছাত্র নিতে তাদের নীতিগত কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু কোভিডের কারণে মিশনের কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ায় তারা ভিসা দিতে পারেনি। তারা পূর্ণ কার্যক্রম শুরু করলে ভিসা দেয়া শুরু হবে। সম্ভবত তারা স্প্রিং সিমেস্টারে যেতে পারবে। ভারত বা পাকিস্তানে ভিসা দেয়া হচ্ছে কারণ সেখানকার মিশনের কার্যক্রম ভালোভাবে চলছে, কিন্তু এখানে ৬০ শতাংশ কম কার্যক্রম হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।

বাংলাদেশের উন্নতি ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বৈশ্বিক দৃষ্টি কেড়েছে: ওদিকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক মনোযোগ পাচ্ছে বলে মনে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন। তিনি বলেন, সুসংবাদটি হলো আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা এবং ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ আরও বেশি মনোযোগ পাচ্ছে। আরও লক্ষ্য অর্জনে আমাদের দৃঢ় সম্পর্ক থাকবে।

মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ইংরেজিতে এবং তার বিদায়ের পর বাংলায় দেয়া প্রশ্নোত্তর পর্ব উভয় ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী মোমেন প্রায় অভিন্ন বক্তব্য দেন। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, মার্কিন মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিনিয়োগ, শিক্ষার্থীদের ভিসার সমস্যা, বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে দেয়া এবং সমুদ্র অর্থনীতি ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি রাশেদ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়ই হত্যাকারীদের আবাসভূমি হতে পারে না। তাকে ফেরানোর বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন। জবাবে মার্কিন মন্ত্রী জানিয়েছেন, আইনি বিষয়টি অ্যাটর্নি জেনারেল দেখছেন।

মন্ত্রী মোমেন এবং বিগান উভয়ে জানান, ঢাকার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার বিশেষত বড় মার্কিন বিনিয়োগ নিয়ে তাদের মধ্যে বিস্তৃত আলোচনা চলছে। গত ৩০শে সেপ্টেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের নেতৃত্বে একটি টিম কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি কিথ কাউথ দেশটির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের আলোচনায় বিনিয়োগের খুঁটিনাটি ঠিক হবে এবং এটি এগিয়ে যাবে বলে বিগান-মোমেন উভয়ে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি মার্কিন উপমন্ত্রীর শ্রদ্ধা: এর আগে সকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই বিগান। জাদুঘর পরিদর্শনকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটরস বুকে তার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন। এতে বিগান লেখেন, স্বাধীনতার ৫০ এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মতো এমন বন্ধু পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র গর্বিত। আমরা আশা করি, আগামী ৫০ বছর এবং এর পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী, স্বনির্ভর ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবে।’ মার্কিন উপ-মন্ত্রীকে পুরো জাদুঘর ঘুরে দেখান বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের কিউরেটর এন আই খান।

এ সময় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল মিলার এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার শাহ আলী ফাহাদ উপস্থিত ছিলেন।
মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী- রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে পুনর্বাসনে সহায়তা করুন ওদিকে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে পুনর্বাসনে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রোহিঙ্গাদের তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের উচিত তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়া। আমরা অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন চাই এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত এ পুনর্বাসনে সহায়তা করা। মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই বিগান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে গতকাল সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এসব কথা বলেন।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। স্টিফেন ই বিগান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘায়িত এ রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান চায়। এ ইস্যুতে ঢাকার প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন যে এ মুহূর্তে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, যা দেশের জন্য অতিরিক্ত বোঝা। সমস্যাটি মিয়ানমারের তৈরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনা করছি, তাদের উচিত নিজেদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়া। শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যু একটি সামাজিক সমস্যা এবং মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের একটি বড় অংশ কক্সবাজারের শিবিরে বসবাস করছে।

মহল বিশেষ তাদের অসামাজিক কার্যকলাপে সম্পৃক্ত এবং বিভ্রান্ত করতে পারে। সুতরাং, তাদের স্বদেশে তাৎক্ষণিক প্রত্যাবাসন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আত্মগোপনে থাকা বঙ্গবন্ধুর দণ্ডিত পলাতক খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরানোর বিষয়েও আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী ও মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বিগান জানান, মামলাটি মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস কর্তৃক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা সেবা আবার চালু করা হবে। মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে মার্কিন সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করবে।

যুক্তরাষ্ট্রে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে বিগান বলেন, মারাত্মক এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সেখানে দুই লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ভ্যাকসিনগুলো পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, আশা করি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সেগুলো বাজারে পাওয়া যাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভাবনীয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অগ্রগতির প্রশংসা করেন স্টিফেন ই বিগান। যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা আরো জোরদার করতে চায় জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার দেশ-বিদেশ থেকে আরো বেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সারা দেশে ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করছে। মহামারির মধ্যে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার পাশাপাশি কোভিড-১৯ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সংক্ষেপে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস উপস্থিত ছিলেন।-মানবজমিন

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন