ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু, মধ্যস্থতায় ধামাচাপা

  

পিএনএস ডেস্ক: ঢাকার ধামরাইয়ে একটি নাম সর্বস্ব হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় শাহিনা আক্তার নামে এক নারীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। নিহতের পরিবারের সরলতার সুযোগ নিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার প্রমাণ মিলেছে হাসপাতাল কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

নিহতের পরিবার বলছে, ভুল অপারেশনের কারণেই রেহেনার মৃত্যু হয়েছে। তবে পুলিশকে জানালে ময়নাতদন্তে মরদেহ কাটাছেড়া করা হবে এ কারণেই তারা অভিযোগ করেননি। এদিকে হাসপাতাল কতৃপক্ষও ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর কথা অকপটে স্বীকার করে বিষয়টি স্থানীয়দের মাধ্যমে সমঝোতা হয়েছে বলে জানান।

সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে সাংবাদিকরা ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে আজাহার হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গেলে তাদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন হাসপাতাল কতৃপক্ষ।

এর আগে সকালে মুমূর্ষু অবস্থায় ওই নারীকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে তার মৃত্যু হয় বলে জানায় পরিবারের সদস্যরা।

নিহত নারী শাহিনা আক্তার (৪৬) পৌরসভার ইসলামপুর এলাকার মৃত বেনু মিয়ার মেয়ে। তিনি তার বড় বোন ও দুলাভাইয়ের পরিবারের সাথে থাকতেন।

নিহতের বড় বোন ফিরোজা বেগম বলেন, ‘বইনেরতো পিত্তথলিতে পাথর হইছিল। বোইনে একা একা যাইয়ে ভর্তি হইয়াই এই অবস্থা হল। আমার বোইনেরে অজ্ঞান করছে। অজ্ঞান অবস্থায় আর জ্ঞান ফিরা আহে নাই বোইনের। আমার বোইনেরে ভুল অপারেশন হইছে না হলে মরত না। ডাক্তার ভুল অপারেশন করছে। এমনি অন্য লোক নিয়া গেছে আমাগো আত্মীয় স্বজন কাউরে নিয়া যাই নাই। আমরা জানি না। মনে করছে, আমার ভাই-বোইনে অপারেশন করবার দিব না এই জন্যে।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘না আমরা কোন অভিযোগ করি নাই। অভিযোগ করলে পুলিশ প্রশাসন হইব, পোস্ট মর্টেম হইব এই কারণে আমরা করি নাই।’

বোন জামাই এমদাদুল হক বলেন, ‘আজ থেকে ২০ বছর আগে হ্যার লাঞ্চের অপারেশন ছিল। এক লাঞ্চ ছিল না। এনাম হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হইছে। এনাম আর অন্য হাসপাতালেও হ্যার অপারেশন করে নাই। কিন্তু এই হাসপাতালে কিভাবে ডাক্তার অপারেশন করল সেটা আল্লাহ পাক জানে আর উনি (ডাক্তার) জানে। হাসপাতালের কেউ আমাদের কিছু বলে নাই আমরা যারা গার্জিয়ান আছি। পরে শুনছি ২৫ হাজার টাকা ঠিক হইছিল অপারেশনের জন্য।

অভিযোগের বিষয়ে বলেন, ‘আমাদের আত্মীয়স্বজন ও গ্রামের মাইনসে কইল, ‘যে রোগী মারা গেছে সে রোগী নিয়া কিছু করলে কিছু হবে না। বা আমরা নিজেরাও চিন্তা করি যে এখন আমরা গরীব মানুষ। এ নিয়া দৌড় পাড়াটা বা একটা কাটাছেড়া করাটা পছন্দ করি না। অর বিয়াসাদি হয় নাই। অর কেউই আমরাই অর দুই ভাই বোন।’

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘স্যার আমাকে বললেন রোগীটা একটু ক্রিটিক্যাল খেয়াল করবেন। যে একটা লাঞ্চ নেই রোগীর। স্যার আমাকে বললেন এখানেই থাকেন অপারেশন দেখেন। পরে স্যার অপারেশন শুরু করলেন আমি ওখানেই দাড়ায়া দেখলাম পুরা জিনিসটা। তো অপারেশন সাকসেসফুল হইছে। আমিতো ভাবছি অপারেশন শেষ পরে চইলা আসছি। এক ঘন্টা পর আমাকে স্যার ডাকলেন। আমি যেয়ে দেখি এক ঘন্টা আগে স্যারদের যে ভাবে দাড়ায় থাকতে দেখছি তারা ওভাবেই দাড়ায় আছেন। স্যার আমার দিকে তাকালেন কিন্তু কিছু বললেন না। তো আমি একটু ঘাবরায় গেলাম যে, এতক্ষণ পরও রোগীর জ্ঞান ফিরে নাই বা স্যাররা এভাবে দাড়ায় আছে। তখন এনেসথেসিয়া স্যার ছিলেন উনি বলতেছেন, রোগী রেফার করতে হবে বক্ষ ব্যধিতে কাগজপত্র রেডি করেন। পরে স্যারি সব লিখে দিলেন।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে রাত ৮টার দিকে হাসপাতালে গেলে প্রতিষ্ঠানটির মালিকপক্ষ সাংবাদিকদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। এসময় হাসপাতাল অনুমোদনের কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেননি তারা। এমনকি নিয়মের তোয়াক্কা না করেই আইসিইউ ছাড়াই অপারেশন থিয়েটার কেন চালু রেখেছেন সে বিষয়ে সদোত্তর দিতে পারেননি হাসপাতাল কতৃপক্ষ।

হাসপাতালের চেয়ারম্যান সোহেল খান বলেন, ‘উনি গত পরশু দিন আসছিল। তার পেটে পাথর। একজন সার্জন তার ল্যাবরোসকপি করছে। আমাদের এখানে আইসিইউ সাপোর্ট নাই বিধায় আমরা রোগী রেফার্ড করছি এনামে। আইজকা সকাল ১১টার সময় রোগী মারা গেছে এনামে।’

ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর দ্বায়ভার কার এমন প্রশ্নে বলেন, ‘এটা ভাই আমি অবগত না। এই বিষয়টা আমি জানি না। তবে দ্বায়ভার আমার এটা। অবশ্যই জানাটা আমার উচিত ছিল।’

মিমাংসার বিষয়ে বলেন, ‘টাকা পয়সা না। ওনারা আমাদের আত্মীয়ও হয়। আমরা সামাজিক ভাবে বইসা আমরা কথাবার্তা বলছি। ওনারাও মামলা-টামলায় যাইতে চায় নাই, আমরাও চাই নাই। এ জন্য লাশ দাফন-টাফন হইছে। আমাদের সাথে ওনাদের সুসম্পর্ক বিধায় ওনারা লাশ দাফন করছে।’

কোন চিকিৎসক অপারেশন করেছেন এ বিষয়ে বলেন, ‘ওনার নামটা আমি জানি না। নামটা আপনাকে একটু পরে দিচ্ছি।

ধামরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, এ ধরণের কোন ঘটনার অভিযোগ আমরা পাইনি। তবে কেউ অভিযোগ করলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নুর ই রিফফাত আরা বলেন, আমাদের স্বপ্রনোদিত হয়ে কিছু করার সুযোগ নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। ওই ক্লিনিকে আমরা রুটিন মাফিক ৪বার পরিদর্শন করেছি। তবে এদের বিরুদ্ধে এখন ব্যবস্থা নিতে লিখিত অভিযোগ লাগবে।’

প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন আছে কি না এমন প্রশ্নে বলেন, ‘আজাহার ক্লিনিকের এখনও লাইসেন্স নবায়ন হয়নি। আমরা সুপারিশ করেছি দেয়ার জন্য। ওদের আইসিইউ সিসিইউ নেই, ওটিতেও সমস্যা ছিলো, সেটা কারেকশন সাপেক্ষে ওদের হাসপাতাল অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।’

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন