রাজনৈতিক দলগুলো কি এক-এগারোর কথা ভুলে গেলো?

  

পিএনএস, এবিসিদ্দিক : এক-এগারোর কথা আর কেউ মনে রাখলো না। লাভবান আওয়ামীলীগতো মনে রাখার কথাই না, আর বিএনপি’র মনে রাখার পরিবেশ নেই। এক-এগারো আওয়ামীলীগের জন্য সুভাগ্যের দরজা খুলে দিয়েছে। আপোষহীন বিএনপি জন্য সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। লগি-বৈঠা সন্ত্রাস পরবর্তী বাংলদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পঞ্জিকায় সর্বশেষ সেনা-হস্তক্ষেপের কলঙ্কিত দিন তথা কথিত এক-এগারোর। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি নির্বাচনভিত্তিক গণতন্ত্র আরও একবার অস্তমিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে। আরও একবার সম্মতিভিত্তিক সরকার ব্যবস্থার ওপরে চড়াও হয় সেনাবাহিনী সমর্থিত অবৈধ সরকার। আওয়ামী লীগের চরম নৈরাজ্যের সুযোগে প্রভাবশালী রাষ্ট্র, সংস্থা ও দেশের কিছু লোকের আশীর্বাদধন্য সেনা-নিয়ন্ত্রিত একটি অবৈধ সরকার প্রতিষ্ঠা হয় বাংলাদেশে।

সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখল ও দু বছরের দুঃশাসনে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার অভিযোগে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে বর্তমান মহাজোট সরকার নীরব ভূমিকা পালন করায় অনেকেই তৎকালীন সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আঁতাতের কথা বলেছেন। সরকার ১/১১-এর নায়কদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর ব্যাপারে আশ্চর্যজনকভাবে নীরব। মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনদের শাসন ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বর্তমান আওয়ামী নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা ওই সরকারকে তাদের আন্দোলনের ফসল হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাদের সকল কর্মকান্ডকে বৈধতা দেয়ার ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের রাজনীতিতে নানা উত্থান-পতনের এক পর্যায়ে ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে সমঝোতা এবং প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আওয়ামী লীগ মনোনয়নপত্র দাখিল করেও পরে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়। মহাজোট ঘোষিত ২১ ও ২২ জানুয়ারি ২ দিনের হরতাল ও মাঝখানে একদিন বিরতি দিয়ে ১৫ জানুয়ারি থেকে ৪ দিনের অবরোধ কর্মসূচি দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিত বলে দাবি করে জরুরি অবস্থা জারি ও প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে ইয়াজউদ্দিনকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নামে সাময়িকভাবে জরুরি অবস্থা জারির কথা বলা হলেও তা দীর্ঘায়িত হয় এবং ফখরুদ্দীন সরকার সংবিধান লঙ্ঘন করে দু বছর ক্ষমতায় থাকে। সহসাই গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি ‘কিংস পার্টি’।

শুরুর দিকে সরকার ৯০ দিনের কিংবা সর্বোচ্চ ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচন হবে বলে ধারণা দেয়া হলেও সে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় দু বছরান্তে, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা সেদিন যে অসাংবিধানিক সরকার গঠন করেছিল, দুই বছরের মাথায় বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার আপোসহীন নেতৃত্বের কারণে সেই সরকার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি নির্ধারিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১১ দিন আগে সামরিক অভ্যুত্থান না হলেও সেনাবাহিনী প্রধানসহ শীর্ষ ব্যক্তিরা রাষ্ট্রক্ষমতা করায়ত্ত করেছিলেন। বন্দুকের জোরে রাষ্ট্রপতিকে জিম্মি করে সরকার প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ ও জরুরি অবস্থা জারির ঘোষণায় স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে পদত্যাগ করেন উপদেষ্টা পরিষদের দশ সদস্যের ৯ জন। আর পরবর্তী সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত উপদেষ্টা পরিষদের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল হক ভারপ্রাপ্ত উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এদিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন এবং অল্প সময়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার লক্ষ্যে দু-একদিনের মধ্যেই নতুন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রতিশ্রুতিদেন। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত ঢাকাসহ জেলা শহরগুলোতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়। তবে ২৪ ঘণ্টার মাথায় ১২ জানুয়ারি এ কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়। একদিন পর বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা ও মার্কিন পাসপোর্টধারী ড. ফখরুদ্দীনকে প্রধান করে অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। এক্ষেত্রেও সংবিধান লঙ্ঘন প্রমাণিত সত্য। সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নতুন প্রধান উপদেষ্টার শপথবাক্য পাঠ করান।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ নেতা বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, আবদুল জলিল, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, শেখ সেলিম, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, তৎকালীন এলডিপি সভাপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নেতা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আসম আব্দুর রবসহ মহাজোটভুক্ত দলের নেতারা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জেআর মোদাচ্ছের হোসেন, সাবেক দুই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান ও বিচারপতি লতিফুর রহমান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি ফজলুল হক, ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার মাহফুজুর রহমান।

অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াসহ চারদলীয় জোটভুক্ত দলের নেতারা এ অনুষ্ঠান বর্জন করেন। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ফখরুদ্দীন শপথ গ্রহণের কয়েকদিন পর কয়েক দফায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, মেজর জেনারেল (অব) এম এ মতিন, ব্যবসায়ী তপন চৌধুরী, বেগম গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব) মতিউর রহমান, আইয়ুব কাদরী, আনোয়ারুল ইকবাল, ইফতেখার আহমেদ এবং ড. চৌধুরী সাজ্জাদুল করিম। ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর সংবিধানের ৫৮(গ)(৬) অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই শপথ অনুষ্ঠান শেখ হাসিনাসহ ১৪ দলের নেতারা বর্জন করেন। তবে প্রধান উপদেষ্টা ড. অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে মেনে নিতে তাকে পর্যবেক্ষণ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ৭৩ দিনের মাথায় সেই সরকারকে পদত্যাগ করিয়ে আবার নতুন করে আরেকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ফলে এর মেয়াদ কতদিন হবে তা নিয়ে তখন জনমনে নানা কৌতূহলের জন্ম দেয়।

ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে যারা উপদেষ্টা ছিলেন তারা হলেন মাহবুবুল আলম, সফিকুল হক চৌধুরী, ধীরাজ কুমার নাথ, আজিজুল হক, অধ্যাপক সুফিয়া রহমান, ইয়াসমিন মোর্শেদ, ড. শোয়েব আহমদ, মেজর জেনারেল (অব) রুহুল আলম চৌধুরী ও অধ্যাপক মাঈনুদ্দীন খান। ক্ষমতা দখল করে প্রায় দুই বছর জরুরি অবস্থা জারি রেখেছিলো সেনা সমর্থিত অবৈধ সরকার। সেনাবাহিনী প্রধান মইন উ আহমেদ ও ফখরুদ্দীন ক্ষমতা দখলের পর তাদের লক্ষ্য ছিলো বাংলাদেশকে রাজনীতিশূন্য করা। বিশেষ করে বিএনপিকে মাইনাস করা। তাদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাজনীতিকরা। ব্যবসায়ীরাও রেহাই পাননি।

দুর্নীতি দমনের নামে সে সরকার ও তাদের যৌথবাহিনীর দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক অধিকারহীন অবস্থায় তাদের নির্যাতনের শিকার হয়েছে কতজন, কত টাকা তারা লুট করেছে তার হিসাব সম্ভবত পাওয়া যাবে না। তারা তাদের শাসনামলের প্রথমদিকে দেশকে বিরাজনীতিকরণের (মাইনাস টু ফর্মুলা) লক্ষ্যে বিএনপি চেয়ারপার্সন, বিরোধী দলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ শ শ রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপের পর বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন-নিষ্পেষণের স্টীম রোলার নেমে আসে। সেই সময়কার শাসকগোষ্ঠী এই নির্যাতনকে যৌক্তিকতা দিতে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের আশ্রয় নিয়েছিল। তারা এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলের জন্য দুর্নীতির ধুয়া তুলেছিল। তাদের সেই লক্ষ্যটি ছিলো বাংলাদেশকে শেষ বিচারে একটি তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করা।

২০০৭ সালের ৭ মার্চ গভীর রাতে যৌথবাহিনীর সদস্যরা ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল রোডের বাসভবন থেকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের সময় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে না ছিল কোনো মামলা, না ছিল কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা। ৮ মার্চ রাত ১১টায় কোর্টে হাজির করা হয় তাঁকে। তারেক রহমানের গ্রেফতারের কয়েকমাস পর গ্রেফতার করা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে। উদ্দেশ্য জাতীয়তাবাদী এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রাজনীতিকে কবর দেয়া। কেন্দ্রীয় কারাগারের অন্ধপ্রকোষ্ঠে নির্মম নির্যাতনের মধ্যে একে একে দুই বছর পার করেন দেশের স্মরণকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই তরুণ নেতা।

কলঙ্কিত এক-এগারোর আগে উল্লেখযোগ্য ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ছিল ৩ জানুয়ারি শেখ হাসিনা ও এরশাদের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা, ৭ ও ৮ জানুয়ারি অবরোধের ডাক, ৪ জানুয়ারি নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের ওপর পশ্চিমা কূটনীতিকদের গুরুত্ব আরোপ, ৭ জানুয়ারি টানা অবরোধ চলাকালে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস ও ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর বৈঠক, ৮ জানুয়ারি বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা, ৯ জানুয়ারি বঙ্গভবনের আশপাশে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চোরাগোপ্তা হামলা বৃদ্ধি, ১০ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিরোধে শেখ হাসিনার হরতাল-অবরোধসহ ৮ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা। ১১ জানুয়ারি দুপুরের পর থেকে দেশে গুমোট অবস্থার সৃষ্টি হয়।

বিকাল ৪টায় পূর্বনির্ধারিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক বাতিল করা হয়। তিন বাহিনী প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা বঙ্গভবনে যান। তারা সন্ধ্যা পর্যন্ত বঙ্গভবনে অবস্থান করেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিটিভির স্ক্রলে প্রথম জরুরি অবস্থা ঘোষণার কথা জানানো হয়। রাত ৮টার পর তিন বাহিনীর প্রধান, পুলিশের আইজি, র্যাব, বিডিআরসহ সব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের সঙ্গে সেনাপ্রধান লে. জেনারেল মইন উ আহমেদ সেনাসদরে বৈঠক করেন। রাত সাড়ে ৮টায় সব উপদেষ্টাকে বঙ্গভবনে ডেকে পাঠানো হয়। সেখানে উপস্থিত সেনা কর্মকর্তারা উপদেষ্টাদের ব্রিফ করে পদত্যাগ করতে বলেন। শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন ৯ উপদেষ্টা।

প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন ড. ইয়াজউদ্দিন। সন্ধ্যার পর থেকেই ‘কিছুক্ষণের মধ্যে রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন’ মর্মে বিটিভিতে জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত রাত ১১টা ২০ মিনিটে বিশেষ স্থান থেকে আসা একটি বক্তব্য জাতির উদ্দেশে পড়ে শোনান ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। তাতে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে তাঁর পদত্যাগ ও জরুরি অবস্থা ঘোষণার প্রেক্ষাপট এবং সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা ছিল। উপদেষ্টাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে বিচারপতি ফজলুল হককে প্রধান উপদেষ্টার অন্তর্র্বতীকালীন দায়িত্ব দেয়া হয়। রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়। রাজনৈতিক সংবাদ প্রকাশে জারি করা হয় নিষেধাজ্ঞা। রাস্তায় নামে সেনাবাহিনী। রাতেই জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইয়ের ডিজি পদ থেকে মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দারকে বদলি করা হয়। শুরু হয় গ্রেফতার অভিযান। কামাল মজুমদারকে গ্রেফতার করা হয় সবার আগে।

মোসাদ্দেক আলী ফালু, হাজি সেলিম, নাসির উদ্দিন পিন্টুসহ সাবেক এমপি ও নেতাদের বাসায় হানা দেয় যৌথ বাহিনী। পরদিন ১২ জানুয়ারি নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ শপথ নেন। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের সরকার রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়নমুক্ত করার নামে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করে। সেই টাস্কফোর্সের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পদক্ষেপ শুরুতে সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবে নিলেও পরে দেশের রাজনীতি ও রাজনীতিকদের হেয় করে এক ধরনের রাজনীতিশূন্যতা সৃষ্টির মাধ্যমে উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার প্রবণতা জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার করে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের ৭৯ জন ভিআইপি রাজনীতিবিদকে বহু মামলায় জড়িয়ে দিনের পর দিন ব্ল্যাক হোলে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতনের পর কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। প্রশ্ন ওঠে রাজনৈতিক নেতাদের বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে।

এমনকি হাইকোর্ট থেকেও একাধিক মামলার কার্যক্রম স্থগিত হয়। যদিও অনেকটা নজিরবিহীনভাবে বিচার সংক্রান্ত হাইকোর্টের অসংখ্য আদেশ সুপ্রিমকোর্টে স্থগিত হয়ে যায়। সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে প্রথমে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও পরে ২ সেপ্টেম্বর বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে সংসদ ভবন এলাকার বিশেষ কারাগারে বন্দী রাখা হয়। কিন্তু এর আগেই সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়। পরে নিজ নিজ দলের নেতৃত্ব থেকে তাদের বাদ দেয়ার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে প্রধান দু দলে তথাকথিত সংস্কারের চেষ্টা চালানো হয়। এই সংস্কার করা না গেলেও দলগুলোতে সীমিত আকারে ভাঙন সৃষ্টি করা সম্ভব হয়।

দুই নেত্রীকে বিচারের আগেই কারাবন্দী করে রাখার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সমঝোতার মাধ্যমে দেশত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্র চলে যান। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানো চেষ্টা হলেও তিনি যেতে রাজি হননি। তাঁর গ্রেফতার হওয়া দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোকে মেরে ফেলা হবে বলে ভয় দেখানো হয়। কিন্তু তাতেও বেগম খালেদা জিয়া দমে যাননি। তিনি স্পষ্ট করে ঘোষণা দেন, এই দেশ ছাড়া আর কোনো দেশে তাঁর কোনো ঠিকানা নেই, এদেশেই তিনি জন্মেছেন, এদেশেই মৃত্যুবরণ করবেন। বেগম খালেদা জিয়ার এই আপোসহীন মনোভাবের কারণে সেদিন মাইনাস টু ফমুর্লা ব্যর্থ হয়। শুরুর দিকে দেশী-বিদেশী যেসব মহল থেকে সরকারের প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছিল, তাদেরও মোহ ভাঙতে শুরু করে বছর না ঘুরতেই। বাজারে আগুন লাগে। ১৭-১৮ টাকা কেজির মোটা চাল ৪০-৪৫ টাকায় গিয়ে ঠেকে। দ্বিগুণ হয়ে যায় ভোজ্যতেল, গুঁড়ো দুধসহ বহু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। মূল্যস্ফীতি আকাশ ছোঁয়। বন্ধ হয়ে যায় অনেক মিল-কলকারখানা, স্থবির হয়ে পড়ে উন্নয়ন কর্মকান্ড। স্তব্ধ হয়ে পড়ার উপক্রম হয় অর্থনীতির চাকা। বিনিয়োগে ধস নামে।

দ্রব্যমূল্যর পাশাপাশি সার নিয়ে সঙ্কট, দুই নেত্রীকে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর জোর চেষ্টা, ব্যর্থ হয়ে কারারুদ্ধ করা, রাজনৈতিক দলে সংস্কারের নামে দল ভাঙার অপচেষ্টা, গ্রেফতারকৃতদের বিচারের মুখোমুখি করতে পক্ষপাতমূলক আচরণ, প্রতিষ্ঠিত অনেক ব্যবসায়ীকে ঢালাও অপরাধী সাব্যস্ত করে আটক, নির্যাতন এমনকি অনিয়মতান্ত্রিকভাবে মোটা দাগের অর্থ আদায়সহ বহু বিতর্কিত পদক্ষেপের কারণে তাদের প্রতি অনাস্থা তৈরি হয়। দায়িত্ব নিয়েই ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন সরকার নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তছনছ করে দেয়। সংস্কারের নামে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও নিয়োগপ্রাপ্তদের বিতর্কিত কর্মকান্ডে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি মারাত্মক ক্ষুণœ হয়। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয়ে পড়ে বক্তৃতাসর্বস্ব। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির লক্ষণীয় কোনো উন্নতির পরিবর্তে সংখ্যার বিচারে সরকারি হিসাবেই অপরাধ বেড়ে যায়। সব কথার শেষ কথা হলো-এক-এগারোর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের গণতন্ত্র আবারো বাধাগ্রস্থ হলো।

পিএনএস/মো: শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech