সবাই যখন একহাত নিচ্ছে...

  

পিএনএস (মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : সবাই এক হাত নিচ্ছে বিএনপিকে। আমিও এর বাইরে নই। সময় পেলে বলতে ছাড়ি না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অব্যাহত এত হামলা-মামলা-নির্যাতনের পর দলটি এখনো টিকে আছে। আছে শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে। শত অত্যাচার-নির্যাতনে ন্যূব্জ অসহায় নেতা-কর্মী ও দেশপ্রেমিকদের হৃদয়জুড়ে।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রবক্তা। শনির্ভর বাংলাদেশের রূপকার ছিলেন যিনি। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে যে দেশে না-খেয়ে সাড়ে ৪ লাখ মানুষ মরেছিল, তাঁর কর্মপ্রেরণায় বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পেরেছিল। জিয়াউর রহমান সূচিত সুবজ বিপ্লবের মাধ্যমে তা সম্ভব হয়েছিল।

জিয়াউর রহমান এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘দিল্লির দাসত্ব করার জন্য বাংলাদেশের জন্ম হয়নি।’ তৎকালীন দৈনিক আজাদ জিয়াউর রহমানকে উদ্ধৃত করে উল্লিখিত সংবাদ শিরোনামে প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। জিয়াউর রহমানের ওই বক্তৃতা মেজর জলিলের মতো হওয়ায় চীনপন্থী অনেক বিপ্লবী খুশি হন। ভারতপন্থীরা স্বাভাবিকভাবেই রুষ্ট হন। খুশির বন্যা বয় ভাসানী অনুসারীদের মধ্যে। ফলে ভাসানীর অনুসারী অনেকেই কালক্রমে তাঁর সঙ্গে চলে আসেন।

কবি ও সাংবাদিক আবদুল হাই শিকদার রচিত ‘জোতির্ময় জিয়া এবং কালো মেঘের দল’ নামের একটি গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ছিল আজ রাজধানীতে। বক্তাদের মধ্যে কজন বিএনপিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ভারতপ্রীতি বিএনপিকে কখনো ক্ষমতায় নিবে না। কেউ এটা ভেবে থাকলে তা হবে চরম ভুল।’

তুমুল করতালি দিয়ে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা ওই বক্তব্যকে স্বাগত জানায়। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিবসহ দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরী জিয়াউর রহমানের কর্মময় জীবন, জনসম্পৃক্ততা ও পরামর্শ গ্রহণের দিকগুলো গুরুত্বসহ আলোচনায় তুলে ধরেন। বর্তমান বিএনপিকে জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং কর্মজীবনে দেশ ও জাতির জন্য করা কাজগুলো অনুসরণের পরামর্শ দেন তিনি।

দেশ ও জাতির বৃহৎ স্বার্থে জিয়াউর রহমানের মতো যে কোনো সমস্যায় তৃণমূল থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময়ের আহ্বান জানান ডা. জাফর উল্লাহ। তার মতে, জিয়াউর রমহমানের আদর্শ অনুসরণ করলে বিএনপি সব বাধা অতিক্রমে সক্ষম হবে। তার এ বক্তব্যের মধ্যে অন্যতম ছিল খালেদা জিয়াকে গুলশান কার্যালয়-কেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের দুঃখ-কষ্ট শেয়ার করা। এ জন্য খালেদা জিয়াকে আরেকজন সহকারী রাখার কথাও বলেন তিনি।

খালেদা জিয়া এককালের আপষহীন নেত্রী। অনেক চড়াউ-উতরাই ফেরিয়ে তিনি রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে রাজপথে দীর্ঘ ৯ বছর সংগ্রাম করে স্বৈরাচার হটিয়ে ক্ষমতায় আসেন। রাজপথের অভিজ্ঞতা তাঁর কোনো অংশে কম নয়। প্রায় প্রতি সপ্তাহে অভিশ্বাস্য, অগ্রহণযোগ্য অভিযোগে করা হাস্যকর হয়রানিমূলক মামলায় হাজিরা দিতে হয় তাঁকে। পঞ্চবাহিনীর শত্রুরা তার স্বামীকে হত্যা করে তাঁকে বিধবা করেছে। ছোট ছেলেকে হারিয়ে তিনি শোকে কাতর। আরেক ছেলে দেশান্তরি! স্বামীর স্মৃতিধন্য বাসভবন থেকেও তাকে উচ্ছেদ করা হয়েছে! প্রতিটি ব্যাপারই দায়িত্বশীলদের ভাবায় বৈকি।

এত হয়রানি, অপবাদ, অনাচার, কষ্ট ও হামলা-মামলার পরও তিনি হাত মিলাননি রাষ্ট্রঘাতী কোনো শক্তির সঙ্গে। লোভ দেখানো থেকে শুরু করে এমন ভয়-শঙ্কা কম দেখানো হয়নি, যাতে তিনি কাবু হন। কিন্তু না, তিনি অবিচল থেকেছেন দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে। সামান্যতম আপষ করলে খালেদা জিয়াকে এতকিছু সহ্য করতে হতো না বলে মনে করেন তার চরম শত্রুও।

আজকে যে দলটির বিরুদ্ধে সক্রিয় পঞ্চবাহিনীর দোশররা, সে দলটিকে অক্টোপাসের মতো চেপে ধরেও একজন প্রথম সারির নেতাকে পর্যন্ত আদর্শ চ্যুৎ করা যায়নি। এ অর্জন নিশ্চয় খালেদা জিয়ার। হাজারো প্রলোভন, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত, হামলা-মামলা ও অকথ্য নির্যাতনের পরও নেত্রীর প্রতি শতভাগ আস্থা ও বিশ্বাসে অচিবল এই দলের নেতারা। এই সত্যটা সহজেই বোঝা যায়। এতকিছুর পরও দল ভাঙতে না পেরে ‘আসল বিএনপি’ নামে দোসর সৃষ্টি অপচেষ্টা চলে, যারা বিএনপি অফিসের আশপাশে গেলেই উত্তম-মধ্যম দ্বারা আপ্যায়িত হয়।

অব্যাহত মানবাধিকার লঙ্ঘন, সভা-সমাবেশের অধিকার কেড়ে নেয়া ও ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ হওয়ার পরও যারা আদর্শচ্যুৎ হননি একজন প্রথম সারির নেতাও, নীরবে হজম করছেন সব অত্যাচার-নির্যাতনের স্টিম রোলার। তাদের এ কষ্ট কখনো বৃথা যেতে পারে না। ইতিহাস তা বলে।তবে বিনা পরিশ্রমে সুফল কমই মিলে। এ জন্য শ্রমের প্রয়োজন আছে। সেটা রাজপথে দিতে হবে। আজকে যখন খোদ ক্ষমতাসীন দলের দ্বিতীয় ব্যক্তি বলেন, ‘কর্মসূচি দিয়ে বিএনপি নেতারা বাসায় হিন্দি সিরিয়াল দেখে’ তখনও যদি দায়িত্বশীল নেতাদের টনক না নড়ে, তাহলে নড়বে কবে?

দেশ, দেশের জনগণ, দেশের অর্থ-সম্পদ, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে রক্ষায় বিএনপিকেই দায়িত্ব নিতে হবে। দেশের কঠিন সংকটকালে বিএনপিরই এই মহৎ কাজগুলো করার ঐতিহ্য রয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে সিপাহি-জনতার বিপ্লব, দেশকে স্বনির্ভর করায় এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচার হটিয়ে গণতন্ত্র রক্ষায় বিএনপি অবদান কার না জানা।

আজ যখন পিলখানার দরবার হলে শতাধিক চৌকস, মুক্তিযোদ্ধা দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়, সীমান্তে বাংলাদেশীদের অবাধে গুলি করে পাখির মতো মারা হয়, শেয়ারবাজার থেকে ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীর অর্থ লুট হয়, ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অর্থ পাচার হয়, উন্নয়নের নামে কতিপয় ব্যক্তির ভূড়ি বাড়ে, জনগণের উপর ট্যাক্সের বোঝা বাড়ে, গ্যাস-বিদ্যুতের বিল বাড়ে অবিশ্বাস্য গতিতে তখন জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের নিজ হাতে তিল তিল করে গড়া বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীদের চোখ-কান বন্ধ রেখে বিবেক জাগ্রত না করে বসে নীরবে থাকার সুযোগ নেই। সুযোগ নেই, সুযোগ পেলেই বিএনপিকে এক হাত দেখানো বিবেকের প্রতিনিধি জাতীয় ব্যক্তিত্বদের।


লেখক : সাধারণ সম্পাদক- ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন
ই-মেইল : jalam_prodhan72@yahoo.com

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech