ইসিকে সাংবিধানিক ক্ষমতা চর্চার তাগিদ দেবে বিএনপি

  


পিএনএস ডেস্ক: নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের সাংবিধানিক ক্ষমতা চর্চার তাগিদ দেবে বিএনপি। সেই সঙ্গে দলটির তরফে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তুলে ধরা হবে নির্বাচনকালীন ‘সহায়ক সরকারের’ প্রয়োজনীয়তার কথা। নির্বাচন কমিশনের দাওয়াত অনুযায়ী আগামী ১৫ই অক্টোবর রোববার সংলাপে অংশ নেবে দলটি। ফলাফল যাই হোক, সে সংলাপে দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও কমিশনকে শক্তিশালী করতে কিছু মৌলিক প্রস্তাব ও পরামর্শও তুলে ধরবেন দলটির নেতারা। এদিকে চিকিৎসার জন্য দুই মাস ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আগামী সপ্তাহে তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতিতে প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সংলাপে দল ও জোটের দৃষ্টিভঙ্গি ও ফোকাস পয়েন্টগুলো নিয়ে ইতিমধ্যে চেয়ারপারসনের সঙ্গে আলোচনা করে নিয়েছেন মহাসচিব। বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা এমন তথ্য জানিয়েছেন।

সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রক্রিয়া বাতিল করেছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অটল থেকে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। ২০দলীয় জোটের অংশগ্রহণবিহীন সে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার ইতিমধ্যে প্রায় চারবছর রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। এ সময় বিএনপি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি থেকে সরে আসেনি। তবে দলটির তরফে ‘সহায়ক সরকার’ নামে নতুন ফর্মুলা দেয়ার ঘোষণা রয়েছে। অন্যদিকে নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে সরকার। বিএনপি নেতারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, বর্তমান সরকারের অধীনে কোনোদিন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। যে নামেই আখ্যায়িত করা হোক, একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে। তাই বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে এ ব্যাপারে তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতা চর্চার মাধ্যমে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানালেও সায় মেলেনি। দলটির সিনিয়র নেতারা বলছেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে সুনির্দিষ্ট একটি প্রস্তাবনা দিয়েছিল বিএনপি। সরকারের তরফে সে প্রস্তাবনার ব্যাপারে ইতিবাচক কোনো পদক্ষেপ আসেনি। ফলে বর্তমান কমিশন নিয়ে প্রথম থেকেই প্রশ্ন তুলে এসেছেন বিরোধী জোট। তারপরও দেশের সংবিধানকে সম্মান জানিয়ে ইতিবাচক পথেই এগিয়েছে বিএনপি। নেতারা বলেন, নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক কিছু ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে কমিশন স্বাভাবিকভাবে সে ক্ষমতার চর্চা করতে পারে না। উল্টো তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী। বর্তমান কমিশনের আচরণেও তার ব্যতিক্রম লক্ষণীয় নয়। নির্বাচন কমিশন যে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘রোডম্যাপে লেভেল প্লেয়িং শব্দটি একবারও উল্লেখ করা হয়নি। রোডই যখন নেই, তখন ম্যাপে কী হবে?’ ফলে নির্বাচন কমিশনের এ সংলাপের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী নয় বিএনপি। নেতারা বলছেন, রাজনীতিতে এখন বেসিক প্রশ্ন হচ্ছে- নির্বাচনকালীন সরকার কী হবে? ইসিকে তো সেই সরকারের অধীনেই কাজ করতে হবে। তাই সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকারের সংলাপ। কিন্তু সরকার সে উদ্যোগ নিচ্ছে না। সরকারকে এ ব্যাপারে তাগিদ দেয়ার কথাও বলবে ইসির সংলাপে। তারা বলছেন, দৃশ্যত, এখন পর্যন্ত সরকার অনড়। তাই সামনের দিনগুলোতে কৌশল-পাল্টা কৌশলের চূড়ান্ত পর্বটি আসছে সামনে। তারপরও গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল হিসেবে নিয়মতান্ত্রিক পথে প্রতিটি সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা করবে বিএনপি। তাই সংলাপে অংশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তা চর্চার তাগিদ দেয়া হবে। সেই সঙ্গে নীতিবোধ ও বিবেককে প্রাধান্য দিয়ে দায়িত্ব পালনের দাবিতে জোর দেয়া হবে।

বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, ১৫ই জুলাই চিকিৎসার উদ্দেশে লন্ডন যাওয়ার দুইদিন আগে ১৩ই জুলাই দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছিলেন খালেদা জিয়া। সে বৈঠকে যে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছিল তার অন্যতম হচ্ছে- নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপ। সে বৈঠকেই সংলাপের প্রস্তাবনাগুলো তৈরির নির্দেশনা দেন তিনি। এ জন্য কয়েকজনকে দায়িত্বও দেয়া হয়। সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন নিয়ে ২০১৬ সালের ১৯শে নভেম্বর খালেদা জিয়ার দেয়া প্রস্তাবই মুখ্য হবে। ওই প্রস্তাবটি সামনে রেখেই সংলাপের প্রস্তাবটি তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে সংলাপ শুরুর আগে জোটের নিবন্ধিত শরিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি মহাসচিব। সেখানে সব দলের পক্ষে ‘কিছু কমন প্রস্তাব’ অগ্রাধিকার দিয়েই নিজেদের প্রস্তাব চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। ইতিমধ্যে সংলাপে অংশ নেয়া বিরোধী জোটের শরিক দলগুলো সে প্রস্তাব ইসিতে তুলে ধরেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএনপির প্রস্তাবের মধ্যে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে তার মধ্যে রয়েছে- নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করতে গণপ্রতিনিধিত্ব আইনের (আরপিও) কয়েকটি ধারা সংশোধন, নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাস ও নির্বাচনকালীন সময়ে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সব নির্বাচনী এলাকায় মোতায়েন, নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করতে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণ, কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করণের মতো বিষয়গুলো। এছাড়া ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা হালনাগাদকরণ, নতুন ভোটার নিবন্ধীকরণ, প্রবাসী ও কারাবন্দি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ভোটার করার বিষয়ে প্রস্তাব থাকবে। সূত্র জানায়, প্রস্তাবে প্রার্থী ও পোলিং এজেন্টদের ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা সরবরাহ, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেয়ার কথা থাকবে। নির্বাচনের কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিদেশি পর্যবেক্ষক সংস্থা ও বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নাম ও তালিকা প্রকাশ করতে হবে। প্রস্তাবনায় রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্যে আনুগত্য পোষণকারী কোনো প্রতিষ্ঠানকে পর্যবেক্ষক না করার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হবে। বিশেষ করে নির্বাচনে গণমাধ্যমে স্বাধীনভাবে দায়িত্বপালনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সূত্র জানিয়েছে, ইসি’র নিজস্ব সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব দেবে বিএনপি। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য পোষণকারী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে অতিসত্বর প্রত্যাহার করে নেয়াসহ প্রত্যাহারকৃত কর্মকর্তাদের যেকোনো ধরনের নির্বাচনী দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখা ও রাজনৈতিক মতাবলম্বী প্রেষণে নির্বাচনী কর্মকর্তার দায়িত্ব না দেয়ার কথা বলা হবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় মাঠ পর্যায়ে কর্মরত জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের প্রত্যাহার করে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণার পর থেকে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ পর্যন্ত সরকারের স্বরাষ্ট্র, অর্থ, তথ্য, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা, পররাষ্ট্র, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাখার প্রস্তাব থাকবে। বিএনপি নেতারা বলছেন, নির্বাচন কমিশন একদিকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করছে অন্যদিকে সরকার বিরোধী নেত্রীর বিরুদ্ধে একের পর এক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করছেন। আদালতের অনুমতি নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি বিশেষ উদ্দেশ্যমূলক। একদিকে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের মন্ত্রীরা সরকারি অর্থ ব্যয় করে সারা দেশে ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলকে সাংগঠনিক কর্মসূচি পালনে বাধা দেয়া হচ্ছে এবং সারা দেশে বিরোধী নেতাকর্মীদের ধরপাকড় করা হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে চাইলে নির্বাচন কমিশনকে এ রাজনৈতিক নিপীড়ন বন্ধে ভূমিকা রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক ক্ষমতা চর্চার মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ নিলে বিএনপি সহযোগিতা করবে। এসব বিষয় সংলাপে তুলে ধরা হবে। বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, সংলাপে দলের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করবেন। দলের স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও যুগ্ম মহাসচিবদের সমন্বয়ে এ প্রতিনিধি দলটি গঠন করা হবে। ইসি’র সংলাপ নিয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আমরা কেমন নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনী ব্যবস্থা ও নির্বাচনের পরিবেশ চাই তা দুইটি বক্তব্যে জাতির উদ্দেশে তুলে ধরেছেন আমাদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বর্তমান নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের আগে তিনি যে প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছিলেন সেটা এবং পরে ‘ভিশন-২০৩০’ যে প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছেন সেখানে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলেছেন। আমরা নেত্রীর এ দুইটি বক্তব্যের ভিত্তিতে আমাদের পরামর্শগুলো তুলে ধরবো।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech