বুঝলে ভালো, না বুঝলে থাক!

  

পিএনএস (মোস্তফা মামুন) : চেনা এক ভদ্রলোক দেশের বড় দুই দলের একটির অন্ধ সমর্থক। এতটাই যে বিশ্বাস করেন, যারা অন্য দল করছে, তাদের দুনিয়া তো বটেই, আখিরাতেও জবাবদিহি করতে হবে। এমন লোকের সংখ্যা বাংলাদেশে কম নেই, তাই এটা বলার মতো কোনো ঘটনা নয়। বলার মতো ঘটনা হলো, একবার স্থানীয় একটি নির্বাচনের আগে দেখি, তিনি বিরোধী দলের প্রার্থীর পক্ষে। বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঘটনা কী ভাই? আপনি...’

তিনি হেসে বললেন, ‘ভাই, এটা তো স্থানীয় নির্বাচন। বিরোধী দলের মানুষটা ভালো, আমার চেনা লোক। আমাদের দলের প্রার্থীটা বিরাট টাউট।’

‘তাই বলে আপনি নিজের দলের বিরুদ্ধে ভোট দেবেন?’

‘দেব, কারণ এখানে তো আর মার্কা নেই।’

একটা সময় এ রকমই ছিল ছবিটা। যদিও নানা হিসাব-নিকাশ মিলে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নির্বাচনই হয়ে যেত, তবু একটা পর্দা ছিল। ছিল বলে, অরাজনৈতিক কিছু ভদ্রলোক নির্বাচিত হয়ে যেতে পারতেন। স্কুলের হেডমাস্টার, স্থানীয় সমাজসেবী কিংবা দানবীর প্রবাসীরা বসতে পারতেন চেয়ারম্যান-মেয়রের আসনে। মার্কাভিত্তিক হওয়ার পর আর সেই সুযোগ নেই। যেমন জানার সুযোগ নেই চেনা সেই ভদ্রলোক এখনকার সময়ে হলে মার্কার সমীকরণটা কিভাবে সামলাতেন। সম্ভবত এমন দিন দেখবেন না বলে চিরবিদায় নিয়েছেন বেশ আগে।

নষ্ট রাজনীতি জাতীয় নির্বাচনকেই প্রায় শেষ করে দিয়েছে, তবু কেন যে হঠাৎ সবাই স্থানীয় নির্বাচনের রাজনৈতিকীকরণের পক্ষে গেলেন সে এক বিস্ময়। বলা হলো, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতেও এভাবেই নির্বাচন হয়। চূড়ান্ত কুযুক্তি। উন্নত দেশে সব নির্বাচনই রাজনৈতিকভাবে হয়। কারণ তা না হলে, স্থানীয় নির্বাচন করার লোকই পাওয়া যেত না। সেই সমাজে সাধারণত যাদের মধ্যে মানুষের জন্য কাজ করার মানসিকতা আছে, তারাই রাজনীতিতে আসে। টাকা করে বা বড় উকিল হয়ে বা বাবার মৃত্যুর পর গদি দখল করতে কেউ রাজনীতিবিদ হয়ে যায় না। নির্বাচনকে ধরেই নেওয়া হয় ক্যারিয়ার রাজনীতিকদের দায়িত্ব। তাই সব পর্যায়েই নির্বাচন রাজনৈতিক।

এই পর্যায়ে জাভেদ ভাই এসে বলল, ‘এবার কী নিয়ে গল্প ফাঁদছ?’

‘সিটি নির্বাচন নিয়ে একটু লেখার চেষ্টা করছি।’

জাভেদ ভাই উদাস হয়ে যায়। স্বগতোক্তির মতো করে বলে, ‘অথচ কী জানো, আওয়ামী লীগকে বাঁচিয়ে রেখেছে এই সিটি নির্বাচন।’

এটাও জাভেদ ভাইয়ের স্বভাব। এমন একটা পাঞ্চ লাইন দেবে যে পাল্টা প্রশ্ন করতে বাধ্য হতে হয়। ‘কিভাবে? বুঝিয়ে বলো।’

‘১৯৯১ সালে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যখন হেরে গেল তখন সমাজে একটা ধারণা ছড়িয়ে পড়ল যে আওয়ামী লীগ আর কোনো দিন ক্ষমতায় যেতে পারবে না। নীরব ভোটারদের মধ্যে আওয়ামী বিরোধিতার বিষ এমন বাসা বেঁধে আছে যে এটা আর দূর হওয়ার নয়। সত্যি বললে আওয়ামী লীগকেও সেই ভয় পেয়ে বসেছিল। সেখান থেকে তারা উদ্ধার হলো সিটি নির্বাচন দিয়ে।’

‘মোহাম্মদ হানিফের জয়ের কথা বলছ?’

‘ইয়েস। বছর আগে ঢাকার সব কয়টা আসনে বিএনপি জিতেছে। শেখ হাসিনা দুই আসনে অখ্যাত দুজনের কাছে হেরেছেন। সেই সময় ঢাকায় হানিফের অবিশ্বাস্য বিজয় আওয়ামী লীগকে এই ভরসা দেয় যে সম্ভব। আওয়ামী কর্মীদের মধ্যে বিশ্বাসটা ফিরে আসে। একই কাজ হয় চট্টগ্রামে মহিউদ্দিনের জয়েও।’

‘সেটা তো অনেক পুরনো ব্যাপার। ২৫-২৬ বছর আগের একটা ঘটনা দিয়ে তো রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করা যায় না। রাজনীতি চলমান...’

‘চলমান সেই রাজনীতিতে এর পরের গল্পও আছে। যেমন ধরো, ২০০৫ সালে বিএনপি যখন ক্ষমতায় তখন চট্টগ্রামে মহিউদ্দিনের জয়টা কিন্তু আওয়ামী লীগকে আবার ভরসা এনে দিল। তখনকার সর্বময় ক্ষমতার মালিক তারেক রহমান চট্টগ্রামে থেকে নির্বাচনের ফল বদলাতে চেয়েছিলেন। মানুষ নির্বাচন অফিস ঘেরাও করে ফল ছিনিয়ে নিয়েছিল।’

‘ঠিক মহিউদ্দিনের এই জয় ছিল অবিশ্বাস্য।’

‘এখানেই কিন্তু শেষ নয়। গত নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যদি চারটি সিটি করপোরেশনে না হারত তাহলে রাজনীতির গতিপ্রকৃতি অন্যদিকেও যেতে পারত।’

‘কিভাবে?’

‘আওয়ামী লীগ অনেক কাজ করেছিল। বিশেষ করে বরিশালে হীরণ এবং রাজশাহীতে লিটন বলতে পারো শহর দুটির ছবিই বদলে দিয়েছিলেন। তার পরও এই হারে আওয়ামী লীগ বুঝতে পারে জনমত তাদের দিকে নয়। তাই তারা আর কোনো অবস্থায়ই তত্ত্বাবধায়কের দিকে যায়নি। নইলে কে জানে, কোনো ফর্মে হয়তো সমঝোতা মেনে নিত।’

‘হুঁ। কিন্তু তুমি তো এটা বলতে পারো না যে আওয়ামী লীগ খুলনার মেয়র পদটা লুট করে নিয়েছে। কিছু অনিয়মের খবর আছে, বাংলাদেশে সব সময়ই থাকে। এমন কোনো নয়ছয় তো হয়নি।’

‘আমি নিয়ম-অনিয়ম নিয়ে কথা বলছি না। আমি বলছি, যে সিটি নির্বাচন আওয়ামী লীগকে এত কিছু দেয় সেই নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের কী টালবাহানা। নির্বাচন দেয় আবার স্থগিত করে দেয়। দেখো ঢাকা সিটি করপোরেশনে আনিসুল হকদের নির্বাচনের সময় তিন বছর পেছাল। আনিসুল হক মারা যাওয়ার পর হাওয়া উঠিয়ে আবার নির্বাচনটা হাওয়ায় উড়িয়ে দিল। তারপর গাজীপুরের কারবারটা দেখো! না, এটা আওয়ামী লীগের খুব অন্যায়। বুঝলে, সিটি নির্বাচন হচ্ছে সিনেমার ট্রেলারের মতো। এই একটুখানি দেখে পুরো হালচালটা আন্দাজ করা যায়।’

সিটি নির্বাচন আসলেই সিনেমার ট্রেলারের মতো। ভোটের স্রোতটা কোন মুখী এর একটা আঁচ পাওয়া যায়। আওয়ামী লীগ গতবার এই আঁচটা টের পেয়েই সম্ভবত পরবর্তী রণকৌশলটা সাজিয়েছিল দারুণ। অথচ এবার সেই সুযোগটাই যেন নিতে রাজি নয়। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস? হতে পারে।

সেই আত্মবিশ্বাস আওয়ামী লীগকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাতে লাভবান কে হবে? হয়তো বিএনপি। কিন্তু আমরা যারা, মানে আপনি, আমি আমাদের লাভ-ক্ষতির কোনো অঙ্ক নেই।

ধরা যাক, আওয়ামী লীগ গিয়ে বিএনপি এলো তাতে বিএনপির কর্মী-ক্যাডারদের আঙুল ফুলবে, ফুলে কলাগাছ হবে, কিন্তু আমাদের সেই আগাছারই জীবন।

একটা কৌতুক বলি। বিরোধীদলীয় এক প্রার্থী নির্বাচনে দাঁড়িয়ে বিপুল প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্রশ্ন করা হলো, ‘আপনারা কেন নির্বাচন করতে এলেন?’

‘সরকারের লোকজন কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে দুর্নীতি করে। একেকজনের পাঁচটা-ছয়টা বাড়ি। দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি।’

‘এসব দূর করার জন্যই তাহলে আপনাদের নির্বাচন?’

‘আরে না, আমাদের বুঝি গাড়ি-বাড়ি করে আরাম-আয়েশ করতে ইচ্ছা করে না!’

বুঝলেন তো! বুঝতে পারলে ভালো। না বুঝলে থাক!

[দৈনিক কালের কণ্ঠের সৌজন্য লেখক : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক]

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech