বৃহত্তর ঐক্যের জন্য বিএনপির সাত দফা

  

পিএনএস ডেস্ক: ‘তৃতীয় ধারা’র দলগুলোর সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে আন্দোলনে নামার লক্ষ্যে সাত দফা খসড়া দাবিনামা প্রণয়ন করেছে বিএনপি। সেই সঙ্গে ওই দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনার জন্য বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিন সদস্যের সমন্বয়ে একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও নজরুল ইসলাম খান। তবে ‘তৃতীয় ধারা’র প্রবীণ দুই নেতা অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের মধ্যে এখনো সমঝোতা না হওয়ায় ঐক্য প্রক্রিয়া থমকে আছে। বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্রমতে, গত এক সপ্তাহে বেশ কয়েক দফা বৈঠক করে লিয়াজোঁ কমিটি গঠন করেছে বিএনপি। একই সঙ্গে প্রস্তুত করা হয়েছে বৃহত্তর ঐক্যের জন্য সাত দফা দাবির খসড়া। এগুলো হলো—এক. নির্বাচনকালীন সরকার গঠন, দুই. নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, তিন. সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন, চার. নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন, পাঁচ. নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করা, ছয়. বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলার কার্যক্রম স্থগিত করা এবং সাত. খালেদা জিয়ার মুক্তি। এসবের মধ্যে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিটিকে ‘দলীয়’ বলে মনে করেন বিএনপির নেতারা। কারণ নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ বিএনপির সঙ্গে ঐক্যে আগ্রহী বিভিন্ন দলের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও এ সরকারের আমলে মামলা হয়েছে।

সরকারের বিরুদ্ধে একাট্টা হওয়ার জন্য অন্য পাঁচটি দফার ব্যাপারে এরই মধ্যে ওই দলগুলোর নেতারা একমত হয়েছেন বলে জানা যায়। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে নেতৃত্ব নিয়ে। বিশেষ করে নির্বাচনে জয়লাভ করলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন সে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা কঠিন হয়ে পড়েছে বিএনপির জন্য। এ কারণে থমকে আছে বৃহত্তর ঐক্যের প্রক্রিয়া।

এ বিষয়ে বিকল্পধারা সভাপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘কামাল হোসেন কী চান তার জবাব তিনি দেবেন। তবে আমি সুস্পষ্টভাবে বলে দিচ্ছি—সংসদ সদস্য, প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি, এর কিছুই আমি হতে চাই না। আমি একটিরও প্রার্থী নই। তবে ঐক্যের প্রশ্নে আমরা অবশ্যই ক্ষমতার ভারসাম্য চাই। ভারসাম্য না থাকলে স্বেচ্ছাচারী শাসনব্যবস্থা পাকাপোক্ত হয়। যেমন—১৪ দলীয় জোট থাকলেও আওয়ামী লীগ এখন স্বেচ্ছাচারী শাসন চালিয়ে যাচ্ছে।’

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তাঁর দলের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন কোনো দাবি-দাওয়ার মধ্যেই নেই। কত আসন পাওয়া যাবে, ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী নাকি রাষ্ট্রপতি হবেন এ বিষয়ে তিনি চিন্তাও করেন না। এমনকি নেতা হিসেবে তিনি সামনে থাকতে বা জাহির করতেও পছন্দ করেন না। তবে একটি শুভ পরিবর্তনের লক্ষ্যে তিনি কাজ করছেন।’

ঐক্যের বিষয়ে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘বি চৌধুরীর আর কামাল হোসেনের মধ্যে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। তবে আমি বিএনপিকে বলেছি তোমরা চুপ করে থাকো। চিৎকার কোরো না। তারা দুজন, দুই দল বা যুক্তফ্রন্ট আলোচনা করে ঠিক করুক কে কী হতে চায়।’

কৌশলগত কারণে বিএনপির নেতারা অবশ্য এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি। তবে দলের স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইস্যুভিত্তিক ঐক্য তথা যুগপৎ আন্দোলনের কাছাকাছি পৌঁছার পর হঠাৎ করেই দুই নেতার (বি চৌধুরী ও কামাল হোসেন) মধ্যে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা অনুভূত হয়েছে বিএনপির কাছে। এ অবস্থায় বিএনপির কিছুই করার নেই। তাঁরা বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণেই বিএনপি ছাড় দিতে রাজি আছে। এক বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী তাঁরা চান না। কিন্তু তাদের মধ্যে ঐক্য বা সমঝোতা না হলে বিএনপি কী করবে সে প্রশ্ন করেন তাঁরা।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য দাবি করেন, বৃহত্তর ঐক্যের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে আগ্রহী দলগুলো। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক মেরুকরণ বা ঐক্য প্রথমে কিছুটা হোঁচট খায়—এটাই নিয়ম। কিন্তু পরে পরিস্থিতিই তাদের ঐক্যবদ্ধ করে দেয়। সামনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, যা গণতন্ত্র রক্ষায় সব দলকে একমঞ্চে এনে দেবে। চাওয়া-পাওয়া সেখানে কোনো প্রভাব ফেলবে না।’

দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ায় বিএনপির প্রধান দুই নেতা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। কিন্তু এ অবস্থায় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে নেতৃস্থানীয় একজনকে অন্তত এক বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করতে হবে। বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে নির্বাচনের আগেই। কারণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিএনপিকে সুস্পষ্টভাবে ‘বার্তা’ দিতে হবে বলে দলটির মধ্যে আলোচনা আছে।

সূত্রমতে, এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির সামনে বিকল্প দুটি নাম আছে। এক. সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা সভাপতি ডা. বি চৌধুরী এবং দুই. গণফোরাম সভাপতি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন। প্রথম দিকে বি চৌধুরীকে কেন্দ্র করেই বেশি তৎপর ছিল বিএনপি। মির্জা ফখরুল ও ডা. জাফরুল্লাহর উদ্যোগে অনেকটা অগ্রগতিও হয়েছিল। কিন্তু মাহী বি চৌধুরী দেশে ফেরার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। গত ১ জুলাই মির্জা ফখরুলের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি জোট গঠন প্রক্রিয়ার শর্ত হিসেবে ১৫০ আসন দাবি করার পাশাপাশি ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার কথা বলেন। এ নিয়ে কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। যদিও পরে নানাভাবে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করেন যুক্তফ্রন্টের নেতারা। তাঁরা গত ৬ আগস্ট বিএনপির সঙ্গে একমঞ্চে উঠে বক্তৃতাও করেন। কিন্তু ওই ঘটনার রেশ এখনো রয়ে গেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এদিকে ড. কামাল হোসেন হঠাৎ করেই সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য রেখে লাইমলাইটে আসেন। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গেও তাঁর কয়েক দফা বৈঠক হয়। গত ৪ আগস্ট সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের বাসায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নিয়ে আলোচনার শীর্ষে চলে আসেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের তৎপরতার সঙ্গে ড. কামালের ভূমিকার যোগসূত্র থাকার আলোচনা আছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। সার্বিকভাবে কামাল হোসেনের সাম্প্রতিক ভূমিকায় বিএনপি বেশ খুশি হয় বলে জানা যায়। আবার বিএনপির মনোভাব ও তৎপরতায় সংশয় তৈরি হয় যুক্তফ্রন্টভুক্ত বিকল্পধারা, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের মধ্যে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আগামী ২২ সেপ্টেম্বর মহাসমাবেশ করার বিষয়ে কামাল হোসেনের উদ্যোগকেও সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে যুক্তফ্রন্ট। গত ১৫ আগস্ট বি চৌধুরীর বাসায় অনুষ্ঠিত যুক্তফ্রন্টের বৈঠকে উপস্থিত কয়েক নেতা এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কেউ কেউ ওই উদ্যোগের পেছনে বিএনপির হাত আছে কি না সে নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন। যদিও বৈঠকে বৃহত্তর ঐক্যের ব্যাপারে ইতিবাচক অবস্থানে থাকার সিদ্ধান্ত হয়।

ড. কামাল হোসেনের কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে জেএসডি সভাপতি আ স ম রব বলেন, ‘আপাতত ওই কর্মসূচির বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। তারা কর্মসূচি পালন করতে চায় করুক। আমরা যুক্তফ্রন্টের কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ বি চৌধুরী ও কামাল হোসেনকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে মন্তব্য করতে চাই না। আমরা কাজ করে যাচ্ছি। একত্রে কাজ করতে চাইলে তিনি (কামাল হোসেন) আসবেন, অসুবিধা কী!’

জানা গেছে, বিএনপির প্রস্তাবিত সাত দফা আগ্রহী দলগুলোর মতামতের জন্য পাঠানোর পর ওই দলগুলোর কাছ থেকেও বিকল্প প্রস্তাব নেওয়া হবে। এরপর কমন ইস্যুগুলো একত্রিত করে যুক্ত ইশতেহার বা যৌথ ঘোষণা তৈরি করা হবে। এভাবে প্রথমে একই কর্মসূচিতে যুগপৎ আন্দোলন এবং পরে কঠোর আন্দোলন শুরু হলে দলগুলোর এক মঞ্চে গিয়ে ওঠার পরিকল্পনা রয়েছে।

লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের আগে বিকল্পধারা, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব পালন করছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মওদুদ আহমদ আলোচনা করছিলেন গণফোরামের সঙ্গে। আর বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভার ছিল নজরুল ইসলাম খানের ওপর। কিন্তু সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বলা হয়, আলাদাভাবে তিন অংশের সঙ্গে আলোচনায় অনেক সময় তথ্য আদান-প্রদানে শূন্যতা থাকে। তাই সর্বশেষ বৈঠকে লিয়াজোঁ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। সূত্র: কালের কণ্ঠ

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech