১০০ আসনে ছাড় দিতে পারে বিএনপি

  

পিএনএস ডেস্ক : নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জোট সম্প্রসারণেরও উদ্যোগ নিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। ফলে বদলে যাচ্ছে জোটকেন্দ্রিক নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ। বর্তমান ২০ দলীয় জোট বহাল রেখেই 'জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট' নামে নতুন আরেকটি জোটে শামিল হয়েছে বিএনপি। এখন সরকার ও বিরোধী জোটের বাইরে থাকা ছোট ছোট ধর্মভিত্তিক এবং বাম ও ডানপন্থি অন্য দলগুলোকেও ঐক্যফ্রন্টে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগবিরোধী নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্য থেকেও প্রার্থী মনোনয়ন দেবে দলটি। নির্বাচনে আসন ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে আগের অবস্থান থেকেও সরে আসছে বিএনপি। এত দিন জোটের শরিকদের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০টি আসন বণ্টনের পরিকল্পনা থাকলেও এখন আরও উদার হয়ে উঠেছে বিএনপি হাইকমান্ড। সম্প্রসারিত জোট এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মিলিয়ে সর্বোচ্চ একশ' আসন পর্যন্ত ছাড়তে রাজি বিএনপি। দলের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এরই মধ্যে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের কাছে আসন বণ্টনের ব্যাপারে যোগ্য নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে বলে বার্তা পাঠিয়েছেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে দলের সঙ্গে থাকা নেতাদের ত্যাগ স্বীকারের বিষয়টি বিএনপি ভুলে যাবে না বলে জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে বিএনপির সঙ্গে নতুন জোট করা দলগুলোর নেতাদের প্রতিও যথাযথ সম্মান দেখানো হবে। তবে কৌশলগত কারণে আসন বণ্টনের ব্যাপারে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি নন বিএনপির কোনো নেতা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশ ও গণতন্ত্রের বৃহত্তর স্বার্থে বড় ছাড় দিতে তারা প্রস্তুত।

এ মুহূর্তে দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করাই বড় চ্যালেঞ্জ। নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়ে আরও যেসব দল তাদের জাতীয় ঐক্য গড়ার ডাকে সাড়া দেবে, সবাইকে নিয়ে আন্দোলন ও নির্বাচন করতে চান। জোট সম্প্রসারণ ও আসন বণ্টন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখনও আলোচনার সময় আসেনি। এখন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ সাত দফা দাবি ও ১১ লক্ষ্য নিয়ে ঘোষিত কর্মসূচি পালনকে প্রাধান্য দিচ্ছেন তারা। আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করে নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপি দুই জোটের শরিক সব দলকেই যথাযথ মূল্যায়ন করবে বলে জানান মির্জা ফখরুল।

২০০৮ সালে ২৬০ আসনে প্রার্থী ছিল বিএনপির। ৪০ আসন ছেড়ে দেওয়া হয় শরিকদের। জামায়াতকে ছাড় দেওয়া ৩৩ আসনে 'ধানের শীষ' প্রতীক ছিল না। বিজেপি, ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে দুটি করে এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টিকে (জাগপা) একটিসহ মোট সাতটি আসন ছেড়েছিল বিএনপি। তবে এসব দলের প্রার্থীরা 'ধানের শীষ' প্রতীকে ভোটে অংশ নেন। ২০১২ সালে জোট সম্প্রসারণে বিএনপির শরিক বেড়েছে। ১৪টি দল গত কয়েক বছরে বিএনপির জোটে এসেছে। সর্বশেষ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে 'জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট' নামে নতুন জোট করেছে বিএনপি। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নতুন ও পুরনো মিত্রদের ধরে রাখা এবং জোট আরও সম্প্রসারণ করতে বিএনপি হাইকমান্ড এবার সর্বোচ্চ একশ' আসন পর্যন্ত ছাড়ার চিন্তাভাবনা করছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, এবার জোটবদ্ধ নির্বাচনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। নিজেদের দীর্ঘদিনের আসনও ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে তারা। বিএনপি থেকে ন্যাপ ও এনডিপি বেরিয়ে যাওয়ার পর জোটের অন্য শরিকদের যথাযথ মূল্যায়নের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

জোট সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল বলেছেন, অনেক দল ক্ষমতাসীন জোটে যোগ দিতে চায়। তবে জোট সম্প্রসারণ হবে কি-না, এ সিদ্ধান্ত পরে হবে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গতকাল বলেছেন, দেশের জনগণের চাওয়া-পাওয়ার জন্যই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সামনে এই ঐক্য আরও জোরদার হবে; আরও সম্প্রসারিত হবে। সরকার ভীত হয়ে ফ্রন্টের নেতাদের সম্পর্কে নানা রকম অপপ্রচার চালাচ্ছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট :বিএনপির নতুন মিত্র ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরাম, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ একশ' আসনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ লক্ষ্যে গণফোরাম ৩০, জেএসডি ৩০ ও নাগরিক ঐক্য ৩০ দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের খসড়া তালিকা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নেতারাও নির্বাচন করতে পারেন। নাগরিক সমাজের জন্য ১০টি আসন চাওয়া হবে। তবে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা আরও বড় হবে বলেও জানিয়েছেন দলগুলোর দায়িত্বশীল নেতারা।

জামায়াতে ইসলামী :২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতকে ৩৩টি আসন দিয়েছিল বিএনপি। দলটি ৩৯ আসনে প্রার্থী দেয়। তবে একটিতে ভোটের আগে বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়ায়। বাকি পাঁচ আসনে বিএনপির বিরুদ্ধে প্রার্থী দিয়ে, দুটিতে বিএনপিকে টপকে দ্বিতীয় হয়। আদালতের রায়ে নিবন্ধন হারানো জামায়াত যুদ্ধাপরাধের বিচারে এবার কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। প্রকাশ্য রাজনীতিতে না থাকলেও জামায়াতের দাবি ৬০টি আসনের। তবে শেষ পর্যন্ত ৪০ আসনের ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নেবে তারা।

জামায়াতের নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াত জোটের কাছে কত আসন চায়- তা এখনই খোলাসা করতে চান না। তারা নির্বাচনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আসনভিত্তিক প্রার্থী ঠিক করা হয়েছে। ২০০৮ সালের চেয়ে এবার বেশি আসন চাওয়া হবে। তফসিলের পর জোটসঙ্গীদের আলোচনায় তা চূড়ান্ত হবে।

নিবন্ধনহীন জামায়াত দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। বিএনপির প্রতীকেও তারা আগ্রহী নয়। জামায়াত নেতাদের দাবি, নিবন্ধন হাইকোর্টে বাতিল করলেও সুপ্রিম কোর্টে আপিল চলছে। ভোটের আগেই এর ফয়সালা হয়ে যাবে। জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, তারা ৪০ আসনের কমে মানবে না। তবে বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতকে এবার সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ৩০টি আসন দেওয়া হবে।

জাতীয় পার্টি (জাফর) :বিগত নির্বাচনের আগে এরশাদের জাতীয় পার্টি ছেড়ে দলটির একাংশ প্রয়াত কাজী জাফর আহমেদের নেতৃত্বে বিএনপির জোটে যোগ দেয়। দলটির দাবি অন্তত ২০ আসন। কিন্তু বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, পাঁচটির বেশি আসন দেওয়া হবে না। জাতীয় পার্টিতে (জাফর) ২০০৮ সালের সংসদে এমপি ছিলেন তিনজন। এ দলের মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, তাদের দলে ১২ জন সাবেক এমপি রয়েছেন। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মতো আরও যোগ্য নেতা রয়েছেন। তারা আশা করেন, বিএনপি যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের নেতাদের মনোনয়ন দেবে।

এলডিপি : কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমের নেতৃত্বাধীন এলডিপির চাওয়া ৩০ আসন। দলটিতে বিএনপির মনোনয়নে নির্বাচিত কয়েকজন সাবেক এমপি রয়েছেন। এলডিপিকেও সর্বোচ্চ পাঁচ থেকে সাতটি আসন দেওয়া হতে পারে বলে বিএনপি সূত্র জানায়।

এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, আসন নিয়ে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি। আলোচনা হলে প্রার্থীর তালিকা জানানো হবে। তবে যুগ্ম মহাসচিব শাহাদত হোসেন সেলিম বলেন, এলডিপিতে অনেক সাবেক এমপি ও যোগ্য নেতা রয়েছেন। সব প্রলোভন ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে তারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছিলেন। তারা আশা করেন, এবার যোগ্য ও জনপ্রিয়তা দেখে বিএনপি মূল্যায়ন করবে।

বিজেপি :২০০৮ সালের নির্বাচনে ভোলা-১ ও ২ আসনে জোটের মনোনয়ন পেয়েছিল আন্দালিভ রহমান পার্থের নেতৃত্বাধীন বিজেপি। ভোলা-১ আসনে আগামীতেও আন্দালিভ রহমানের মনোনয়ন নিশ্চিত। তিনি ঢাকায় একটি আসনেও নির্বাচন করতে চান। তবে দলটি নিশ্চিত করেনি আগামী নির্বাচনে তারা কয়টি আসন চায়।

জমিয়ত :দলটি ২০০৮ সালের নির্বাচনে দুটি আসনে জোটের মনোনয়নে 'ধানের শীষ' প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিল। সম্প্রতি এ দলের মধ্যে ভাঙন দেখা দিয়েছে। একাংশের সভাপতি সাবেক এমপি মুফতি মুহম্মদ ওয়াক্কাস এবারও যশোর-৫ থেকে মনোনয়ন চান। সাবেক এমপি শাহীনুর পাশা সুনামগঞ্জ-২ থেকে মনোনয়ন চান। অপর অংশের নির্বাহী সভাপতি আবদুর রব ইউসুফি, মহাসচিব মহীউদ্দিন ইকরামও জোটের মনোনয়ন চান।

ইসলামী ঐক্যজোট (রাকিব) :ইসলামী ঐক্যজোটের মূলধারা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ছেড়ে গেছে। আবদুর রাকিবের নেতৃত্বে ছোট একটি অনিবন্ধিত অংশ রয়ে গেছে। ২০০৮ সালে ইসলামী ঐক্যজোট দুটি আসনে জোটের মনোনয়ন পেয়েছিল। এবার দলের চেয়ারম্যান আবদুর রাকিব ও মহাসচিব মাওলানা আবদুল করিম প্রার্থী হতে চান।

জাগপা :জাগপার প্রয়াত সভাপতি শফিউল আলম প্রধান ২০০৮ সালের নির্বাচনে দিনাজপুর-২ থেকে জোটের মনোনয়নে 'ধানের শীষ' প্রতীকে নির্বাচন করেন। এবার তার মেয়ে দলের সিনিয়র সহসভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান প্রার্থী হতে পারেন।

কল্যাণ পার্টি :নিবন্ধিত এ দলের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক চট্টগ্রাম-৪ আসন থেকে জোটের মনোনয়ন পাচ্ছেন- এমন দাবি দলটির নেতাদের। আটটি আসনে মনোনয়ন চায় তারা।

খেলাফত মজলিস :নিবন্ধিত দলটি জোটে থাকলেও গতবার কোনো আসনে ছাড় পায়নি। তাদের চাওয়া আগামী নির্বাচনে ১০ আসন। দলের একমাত্র উল্লেখযোগ্য প্রার্থী মহাসচিব ড. আহমেদ আবদুল কাদের হবিগঞ্জ-৪ আসনে মনোনয়ন চান।

ন্যাপ (একাংশ) :নিবন্ধিত ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণির নেতৃত্বাধীন একাংশ ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করেছে। সূত্র জানায়, নীলফামারী-১ আসন থেকে জোটের মনোনয়ন নিশ্চিত না হওয়ায় তিনি জোট ছাড়েন। খণ্ডিত দলের শীর্ষ নেতারাও জোটের মনোয়ান চাইবেন।

ন্যাপের সঙ্গে অনিবন্ধিত এনডিপি খোন্দকার গোলাম মর্তুজার নেতৃত্বাধীন একাংশ জোট ত্যাগ করেছে। অপর অংশ ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে আছে। তারাও শীর্ষ নেতাদের মনোনয়ন চাইবেন।

নিবন্ধিত দল মুসলিম লীগ একটি আসন চায়। এ ছাড়া অনিবন্ধিত এনপিপি, ডেমোক্রেটিক লীগ, সাম্যবাদী দল, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, লেবার পার্টি, বাংলাদেশ পিপলস লীগ, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, ন্যাপ ভাসানীর শীর্ষ নেতারাও মনোনয়ন চান।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech