ছাত্রলীগের অতীতও সুখকর নয়

  

পিএনএস (মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : এ নির্মম, পৈশাচিক, বর্বর, হৃদয়বিদারক, দুঃখজনক, অপ্রত্যাশিত, অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্ম দিল ছাত্র নামের কলঙ্ক, ছাত্র রাজনীতির নামে খুনের নেশায় মত্ত একদল সিমার।যাদের দ্বারা খুন হলেন একজন সাধারণ ছাত্র। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের নির্মম বলি হলেন বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ।

কুষ্টিয়ার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবী ছাত্র আবরার উচ্চ শিক্ষার জন্য রাজধানীর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন। তিনি দ্বিতীয় বর্ষের (১৭তম ব্যাচ) ছাত্র ছিলেন। থাকতেন বুয়েটের শেরে বাংলা হলের নিচতলায় ১০১১ নম্বর কক্ষে। এক বুক আশা নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য রাজধানী ঢাকার শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসে নিজের সাথীদের হাতেই লাশ হয়ে ফিরলেন শেষ ঠিকানায়।মায়ের বুক খালি করে স্বজনদের শোক সাগরে ভাসিয়েছে ছাত্র নামের খুনি চক্র।

অসহায় ও দিশাহীন আবরারের বাবা আকুতি জানিয়ে বলেন, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।পড়তে এসে লাশ হয়ে ফেরার মিছিলে যোগ হলেন আবরার। ভিন্নমত প্রকাশের কারণে তার এই নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হলো বলে মিডিয়ার খবরে প্রকাশ।আবরারের লাশটিজুড়ে নির্মম অত্যাচার-নির্যাতনের চিহ্ন সাক্ষ দিচ্ছে খুনিরা এ ব্যাপারে কতটা নির্দয়, অমানবিক আচরণে দক্ষ ও পটু।

এ ঘটনাটি তখন ঘটল যখন সীমাহীন অপরাধের দায়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দুই বড় নেতাকে বহিষ্কার করা হলো। ক্যাসিনোর মতো জুয়ায় গা ভাসিয়ে সহজে ধনকুবের বনে যাওয়া, মাদক, অস্ত্র ও অর্থের নেশায় আক্রান্ত দলীয় নেতাদের আটক করা হচ্ছে। এমন সময় বুয়েটে ছাত্রলীগ নেতাদের হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠায় প্রশ্ন জাগছে, এরা এত শক্তি ও সাহস পায় কোথায়? কোন খুঁটির জোরে ওরা এভাবে কুদছে। হচ্ছে বেপরোয়া।

যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি সম্রাটসহ ইতিমধ্যে যাদের আটক করা হয়েছে. তাদের কজনের কাছে টর্চারের যন্ত্রপাতি পাওয়া গেছে।অবৈধ অস্ত্র, অর্থ, মাদক আর জুয়ার নেশা যাদের পেয়ে বসেছে, তাদের কাছে ইলেকট্রিক শকসহ টর্চারের যন্ত্রপাতি থাকে কেন, প্রায় এক ও অভিন্ন কায়দায় সাপের মতো পিটিয়ে আবরার হত্যার মধ্য দিয়ে সেটা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে গেছে।সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে নিয়ে তারা কতটা যেতে পারে, হতে পারে সিমারের চেয়েও বড় কিছু- এর প্রদর্শনেই যেন অবাধে চলছে।

মিডিয়ায় খবর এসেছে, যে কক্ষে ডেকে নিয়ে দফায় দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয় আবরারকে, সেখানে প্রায়ই মদের আসর বসত। তারা রাতে মদ খেয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করত। কেউ কিছু বলতে গেলে অশ্রাব্য ভাষায় গালি হজম করতে হতো। এতে আশপাশের রুমের শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারতেন না। পুলিশ ওই রুম থেকে কয়েকটি মদের বোতল উদ্ধার করে। একই সঙ্গে উদ্ধার ৫-৬টি স্টাম্প।কক্ষটি ছাত্রলীগ রাজনৈতিক কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করত। এটি মূলত ব্যবহার হতো নির্যাতন কক্ষ হিসেবে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যুবলীগের শীর্ষ নেতারা ইলেকট্রিক শকসহ টর্চারের যন্ত্রপাতি নিজের অফিসে রাখলে, ছাত্রলীগ এর বাইরের থাকবে কেন?ছাত্রলীগের যেমন স্বাধীনতা যুদ্ধসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গৌরবজনক অতীত রয়েছে, তেমনি রয়েছে কলঙ্কজনক অধ্যায়ও।সফিউল আলম প্রধানের সাত খুন এর অন্যতম উদাহরণ।আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে ঘোষণা দিয়ে সরে যাওয়া, সম্প্রতি ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে অব্যাহতি দেওয়া এবং সর্বশেষ বুয়েটে ছাত্রলীগ নেতাদের দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ডটি এর জ্বলন্ত প্রমাণ।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় কারা শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছে, এর উত্তর সবার জানা। এটা কারো জন্যই শুভ লক্ষণ নয়। ছাত্ররা রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে নিজের, পরিবারের ও জাতির সর্বনাশ করছে। তারা লেখাপড়ার বদলে ভর্তি বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, মাদকে আসক্ত ও ব্যবসা, টেণ্ডারবাজি, চাঁদাবাজিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এ জন্য করছে খুনখারাবিও।যা থেকে বুয়েটের মতো মেধাবীদের শিক্ষাপিঠও যে মুক্তি নেই, জাতি তা-ই প্রত্যক্ষ করল।

দেশ ও জাতিকে ভবিষ্যতে যারা নেতৃত্ব দেবে, তাদের সঠিকপথে পরিচালিত করা অবশ্যকর্তব্য। ছাত্র নং অধ্যয়ন তপঃ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় এর যেন বালাই নেই। এটা একটি জাতির জন্য শুভ লক্ষণ হতে পারে না। যে ছাত্র রাজনীতি ছাত্রদের কল্যাণে নিবেদিত নয়, সে রাজনীতি মানবকল্যা্ণের কাজেও আসবে না। শিক্ষার্থীদের বিপদগামীর পথগুলো থেকে ফিরিয়ে এনে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি সময়ের দাবি। একই সঙ্গে আবরারের খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে শিক্ষাঙ্গনে রক্তপাত ও প্রাণহানির ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না বলে মনে করে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

প্রতিবেদক : বিশেষ প্রতিনিধি- পিএনএস

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন