সব ঠিক হয়ে যাবে, শীর্ষ নেতাদের হতাশ না হতে বললেন খালেদা জিয়া!

  

পিএনএস ডেস্ক: দেশ ও দলের 'সুদিন' ফিরে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন জামিনে মুক্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দল ও জোটের নেতাদের হতাশ না হয়ে কাজ করে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এরশাদ সরকারের শাসনামলের 'ক্রান্তিকাল' পেরিয়ে ক্ষমতায় আসার কথা স্মরণ করে শীর্ষ নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। কালো মেঘ একদিন কেটে যাবে। সুস্থ হলে আবার তিনি দলের হাল ধরবেন বলেও জানিয়েছেন নেতাদের।

আড়াই বছর পর পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গত সোমবার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। দলের নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সাক্ষাৎকালে আন্দোলনের মাধ্যমে দলের চেয়ারপারসনকে মুক্ত করতে না পারার ব্যর্থতায় অনুতপ্ত হওয়ার কথা বলেন শীর্ষ নেতারা। এ সময় খালেদা জিয়া বলেন, 'কে কী বলেছেন, কী করেছেন- সবই জানি। জেলে থেকেও সব খবরই পেয়েছি আমি।'

দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের পরদিন মঙ্গলবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষস্থানীয় নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের ঘটনায় অনেক দিন পর রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা আলোচনার আবহ তৈরি হয়েছে। বিশ্নেষকদের কেউ কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন পর খালেদা জিয়ার সঙ্গে দল ও জোটের নেতাদের এ সাক্ষাৎ বা বৈঠকে পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে মতবিনিময়ের সুযোগ হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যা খুবই স্বাভাবিক। খালেদা জিয়া প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ পেলে হয়তো ধীরে ধীরে বিএনপি তার সমমনাদের নিয়ে রাজনৈতিক কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারবে। অবশ্য শর্ত সাপেক্ষে মুক্তি পাওয়া
খালেদা জিয়ার সরাসরি রাজনৈতিক বিষয়ে তার কথা বলার ব্যাপারে বিধিনিষেধ রয়েছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা দেখতে এবং ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে শীর্ষ নেতারা তার বাসভবনে গেছেন। এ সময় দেশে বর্তমান করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বিএনপি নেতাকর্মীরা দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন খালেদা জিয়া। এক প্রশ্নের

জবাবে তিনি বলেন, এই সংকটময় মুহূর্তে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই।

বিএনপির নীতিনির্ধারক একাধিক সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার মনোবল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত। ভবিষ্যতে সুদিন ফিরে আসার ব্যাপারে অনেক বেশি আশাবাদী তিনি। নেতাদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন। সম্প্রতি সাক্ষাৎ করতে গেলে ব্যক্তিগত সহকারী শিমুল বিশ্বাসকে আবারও আগের মতো দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন খালেদা জিয়া।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের মানুষের পাশে থাকতে দলের নেতাকর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। সাক্ষাৎকালে তারা সারাদেশে দলীয় ত্রাণ তৎপরতা পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। ব্যারিস্টার মওদুদ জানান, খালেদা জিয়ার মানসিক অবস্থা ভালো। তবে শারীরিক অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি।

সন্তুষ্ট নন শীর্ষ নেতাদের ভূমিকায়: ঈদের দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত গুলশানের বাসভবন 'ফিরোজা'য় নীতিনির্ধারক নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় খালেদা জিয়ার। সংশ্নিষ্ট সূত্রমতে, আড়াই বছর পর এ সাক্ষাৎকালে দলের নীতিনির্ধারক নেতারা কিছুটা বিব্রত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, কারাবন্দি হওয়ার আগে এক-দুই সপ্তাহের মধ্যেই খালেদা জিয়াকে আইনি লড়াই এবং কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে মুক্ত করতে পারবেন বলে জোরালো বক্তব্য ও আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন এসব শীর্ষ নেতা। কিন্তু আড়াই বছরে কোনোভাবেই সফল হননি তারা।

সূত্র জানায়, সাক্ষাতের একপর্যায়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে নিজেদের ব্যর্থতার কথা বলে দুঃখ প্রকাশ করেন শীর্ষ নেতারা। 'ম্যাডাম, আমরা তো ব্যর্থ হয়েছি...' এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে খালেদা জিয়া কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সময় নেতারা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যান। সরকারের কঠোর অবস্থানসহ বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করেন তারা।

ভবিষ্যতের ব্যাপারে শীর্ষ নেতাদের আশ্বস্ত করে বিএনপিপ্রধান বলেন, সবাই যার যার অবস্থান থেকে দেশ ও দলের জন্য কাজ করুন। দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। এই খারাপ সময় থাকবে না। এরশাদের শাসনামলের নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির পরও বিএনপি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে; ক্ষমতায় এসেছে। যারা তার সঙ্গে আঁতাত করেছিল- জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে।

'শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে' দলীয় প্রধানের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সেলিমা রহমান ও ইকবাল হাসান টুকু।

দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যান খালেদা জিয়া। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর গত ২৫ মার্চ সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের সাজা স্থগিত করে মুক্তি দেওয়া হয় বিএনপির প্রধানকে। এরপর স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে এটাই প্রথম সাক্ষাৎ তার।

মান্নার সাক্ষাৎ :মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠকে আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিবিধি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভারত ও চীনের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিয়েও কথা বলেন তারা। মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, উনি বিশ্বাস করেন, সব সংকট কেটে যাবে। বললেন, ঘাবড়ে যাবেন না। আল্লাহ নিশ্চয় দেখবেন। অবশ্য রাজনৈতিক আলাপ সম্পর্কে কিছু বলতে রাজি হননি মান্না।

এ ছাড়া বুধবার বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার আইনজীবী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকনও সাক্ষাৎ করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে। সাক্ষাতের বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে চাইলে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে গেছেন।

ভাইবোনদের সঙ্গে ঈদ :কারাবন্দি হিসেবে চারটি ঈদ পার করার পর এবার মুক্ত পরিবেশে ভাইবোনদের সঙ্গে নিয়ে ঈদের দিন কাটালেন খালেদা জিয়া। ঈদের দিন সকালে বাসায় যান ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার ও তার স্ত্রী কানিজ ফাতিমা এবং সেজ বোন সেলিমা ইসলাম।
লন্ডন থেকে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সকালেই টেলিফোন করে মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমান সিঁথি এবং নাতনি জাইমা রহমান, জাহিদা রহমান ও জাফিয়া রহমানের সঙ্গেও কথা বলেন খালেদা জিয়া।

সূত্র: সমকাল

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন