জিয়ার ‘বীর উত্তম’ খেতাব কেড়ে নিলে কঠিন প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি রিজভীর

  

পিএনএস ডেস্ক: দেশে-বিদেশে বর্তমান সরকারের মাফিয়া দুঃশাসনের যে সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে সেটিকে আড়াল করতেই রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রীয় খেতাব কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্তের কথা বলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।

তিনি বলেছেন, ‘সরকারের প্ররোচনায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) জিয়াউর রহমানের ‘বীর উত্তম’ খেতাব কেড়ে নেয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটি শেখ হাসিনার আদেশেই করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়ার পাঁয়তারা করছে। খুব দ্রুতই এই সরকারের অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবে। মিথ্যা বলা ও কলঙ্ক রটনাই আওয়ামী লীগের জীবিকা উপার্জনের একমাত্র উপায়। কারণ এরা জনগণ দ্বারা পরিত্যাজ্য।’

জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রীয় খেতাব কেড়ে নেয়া হলে বিএনপিসহ জাতীয়তাবাদী শক্তি রাজপথে সুনামির ন্যায় ধেয়ে এসে প্রতিরোধ গড়বে বলেও হুঁশিয়ারি দেন রিজভী।

বুধবার (১০ ফেব্রয়ারি) দুপুরে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

রিজভী বলেন, ‘জামুকা মহান স্বাধীনতার ঘোষক, রণাঙ্গণের বীর মুক্তিযোদ্ধা, জেডফোর্সের অধিনায়ক সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রীয় খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে গণমাধ্যম থেকে জানা যায়। সংবাদে আরও বলা হয়- জামুকা’র সভার সভাপতি ও মুক্তিযোদ্ধাবিষয়ক মন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে স্বাধীনতার পর জিয়াউর রহমানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বীর উত্তম’ খেতাব দেয়া হয়। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর পর তাঁর রাষ্ট্রীয় খেতাব কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের অবিনাশী কুটিল প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ।’

বিএনপির এই শীর্ষনেতা বলেন, ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ঠুর থাবায় জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ধ্বংস করতে না পেরে দেশমাতৃকার এই মহান বীরের অবদানকে মুছে ফেলার জন্য ব্যর্থ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই সরকারপ্রধানের পদলেহনকারী কতিপয় ব্যক্তি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের এমনিতেই তালিকা থেকে বাদ দিয়ে এবং নানা ধরনের অপকর্মের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে বিতর্কিত হয়েছেন, সেজন্যই এখন জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রীয় খেতাব বাতিলের চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছেন।’

সরকারের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘শহীদ জিয়া, বেগম জিয়া এবং তারেক রহমানের নামে বিষোদগার করলেই আওয়ামী নেতাদের কবিরা গুনাহ মাফ করে দেন প্রধানমন্ত্রী। এরা তমসাবৃত মোহান্ধ বুদ্ধির উন্মাদ আস্ফালনে লিপ্ত রয়েছে। এরা সহজাত বিচার-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছে। এদের মনে-মস্তিষ্কে অন্ধকার নেমেছে। এরা এক ধরনের প্রতিবন্ধী। এরা কুৎসা সঞ্চারিত মনের বিকারগ্রস্ত ব্যক্তি। এরা প্রধানমন্ত্রীর অসহিষ্ণু মননের বাইপ্রোডাক্ট। জিয়া, জিয়া পরিবার এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর লাগামহীন ক্রোধ এবং অন্ধ অসুয়া চরিতার্থ করার এরা হুকুম বরদার। যে মহান ব্যক্তি দেশের জন্য অকুতোভয়ে লড়াই করেছেন সেই জিয়াউর রহমানের ন্যায় বীরের খেতাব মাফিয়া রাষ্ট্রশক্তির জোরে কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করা হলেও জনমনে যে ইতিহাস রচিত হয়ে আছে সেই ইতিহাস অমর, অব্যয়, অক্ষয়- তা রাষ্ট্রযন্ত্রের হুমকিতে কখনও মুছে ফেলা যাবে না।’

রিজভী বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের কীর্তি দেশবাসীর অন্তরে আজও অম্লান। জিয়াকে নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আবেগ তা যুগে যুগে মানুষের হৃদয়ে বহমান থাকবে। সূর্যের আলোকে আটকানো যায় না, এর বিশাল ব্যাপ্তি পৃথিবীসহ সৌরলোকে ছড়িয়ে পড়ে। বীরত্ব শব্দটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজন হয়, চাকুরি রক্ষায় কিংবা প্রমোশন বা ইনক্রিমেন্ট আদায়ের জন্য নয়। শহীদ জিয়া ছিলেন সেই বীর যিনি দেশপ্রেমে পরিপূর্ণ একজন ব্যক্তি। তাই ‘৭১ এ নিজের ও পরিবারের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে সেই দুঃসময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূন্যতায় পাকিস্তানী কমান্ডারকে হত্যা করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন জিয়া। তিনি ঐ দুর্যোগময় মুহূর্তে কাউকে নাকে তেল দিয়ে ঘুমানোর কথা বলেননি।’

এসময় তিনি শহীদ জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রীয় খেতাব কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্তে তীব্র ঘৃণা, নিন্দা, ধিক্কার ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে এ ধরনের কুটিল সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসার আহ্বান জানান।

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘মে-দিনের কবিতা’র উদ্ধৃতি দিয়ে দলের নেতাকর্মীর উদ্দেশ্যে রিজভী বলেন, ‘আমি বিএনপিসহ সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ও জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রতি আহবান জানাচ্ছি- “মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না- পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা”।’

এসময় তিনি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘উদ্যোগ’ কবিতার “আজ দৃঢ় দাঁতে পুঞ্জিত হাতে প্রতিরোধ করো শক্ত, প্রতি ঘাসে ঘাসে বিদ্যুৎ আসে জাগে সাড়া অব্যক্ত”- পঙক্তিগুলোও উচ্চারণ করেন।

বিএনপির এই শীর্ষ নেতা আরও বলেন, ‘ক্ষমতাসীন নিশিরাতের অটো সরকারের চারদিকে ক্রমশ: অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। বিশ্বের কাছে এদের পরিচিতি এখন মাফিয়া সরকার। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে একের পর এক এই সরকারের ভোট ডাকাতি, অপকর্ম, লুটপাট, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের ফিরিস্তি উঠে আসছে। বিশ্ববাসী জেনে গেছে যে, বাংলাদেশে এখন বিনা ভোটের যে সরকার ক্ষমতায় আছে তারা মাফিয়া। বাচাল মন্ত্রীরা ও তাদের দালালগণ সপ্তস্বরে সরকারের পক্ষে প্রমাণহীন মিথ্যা সাফাই গাইলেও সত্যকে ঢাকতে পারছে না। গত পাঁচ দিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন ঘোষনা করেছিলেন, আল-জাজিরার বিরুদ্ধে মামলা করবেন। পরে শুনলাম মামলা করতে ভয় পেয়েছেন। কারণ মামলার পর টলমল মাফিয়া সরকারকে সামলাবে কে? এখন থলের বিড়াল বেরিয়েছে। তখন তো বাঘ বেরুবে। দুনিয়ার সামনে তাদের দুর্নীতি, লুণ্ঠন, অর্থপাচার, হত্যা-গুম খুন, অপকর্মের মহাসাগর উন্মোচিত হয়ে পড়বে। এই দেশের জনগণ জানে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যেসব অপকর্মের প্রামাণ্যচিত্র ও প্রতিবেদন প্রকাাশিত-প্রচারিত হচ্ছে তা প্রকৃত ভয়াবহ অবস্থার এক পার্সেন্টও না।’

তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসীনদের সবাই ডুবে আছে ফ্যাসিজম, মাফিয়া ও গুন্ডাতন্ত্রে। পুরো দেশেই এই মাফিয়াদের দাপটে মানুষের নাভিশ্বাস দশা। ফরিদপুরের কালকিনি থেকে নিজেদের দলের বিদ্রোহী প্রার্থীকে পুলিশ সুপারের মাধ্যমে মাফিয়া স্টাইলে তুলে আনা হচ্ছে ঢাকায় আওয়ামী লীগ অফিসে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে। যশোরের কেশবপুরের অটো ভোটের এমপি শাহীন চাকলাদার তার এলাকার থানার ওসিকে থানায় বোমা মেরে একজন পরিবেশ কর্মীকে ফাঁসানোর নির্দেশ দিচ্ছেন। তাকে ফেলে দেয়ারও হুকুম করছেন। এই কাজটি সম্পূর্ণরুপে মাফিয়া ডনদের কাজের অনুরূপ।’

রিজভী বলেন, ‘কুমিল্লার লাকসাম উপজেলায় গোবিন্দপুর ইউনিয়নে রবিবার একটি গ্রাম্য মাহফিলে অস্ত্র নিয়ে মঞ্চে উঠে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন শামীম বক্তাকে লাঞ্ছিত করেছেন। নিজেকে সন্ত্রাসী এবং গু-াদের চেয়ারম্যান হিসাবে ঘোষণা করছেন। মাহফিলে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের সামনে হুমকি দিয়ে বলছেন, “আমি গুন্ডা-মাস্তান থেকে বিনা ভোটে চেয়ারম্যান হয়েছি। যারা মাহফিল আয়োজন করেছো আমি তাদেরকে খুন করবো, কারো লাশ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাদের ঘরবাড়ি মরুভূমি বানিয়ে দিবো। মায়ের পেট থেকে বের করে জবাই করবো।” বাংলাদেশের চারিদিকে আওয়ামী দুর্বৃত্তপনার যে বিভিষিকা পরিব্যাপ্ত হয়েছে সেগুলোকে আচ্ছাদিত করতেই দেশমাতৃকার বীর সন্তান জিয়াউর রহমানের যুদ্ধের খেতাব কেড়ে নিতে যাচ্ছে মাফিয়া রাষ্ট্রযন্ত্র। স্বেচ্ছাচার ও দুর্নীতির চাপে গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদকে জলাঞ্জলি দেয়ার পর সেটিকে জায়েজ করতে এখন নানান অপকর্মের আশ্রয় নিয়েছে এই সরকার। তার সর্বশেষ কুৎসিত নাটক হলো জামুকা কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের খেতাব কেড়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত।’

এসময় তিনি আরও বলেন, ‘ভুয়া ও হয়রানিমূলক মামলায় বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান, দলের প্রকাশনাবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক এমপি হাবিবুল ইসলাম হাবিবসহ সাতক্ষীরার ৩৪ জন নেতাকর্মী, পাবনায় ৪৭ জন নেতাকর্মীকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফরমায়েশী সাজা প্রদান এবং দলের বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক আলহাজ সালাহউদ্দিন আহমেদকে অযথা কারাগারে প্রেরণের ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র উদ্যোগে আগামীকাল ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকাসহ সারা দেশের মহানগর ও জেলা সদরে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি পালন করা হবে। ঢাকায় উক্ত কর্মসূচি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল সালাম, যুগ্ম-মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু, বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন