রাজাকারদের মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে সরকার: মেজর হাফিজ

  

পিএনএস ডেস্ক: মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা খেতাব ইস্যুতে সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেছেন, ‘১৯৭২ সাল থেকে এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করেই যাচ্ছে। যারা ছিল রাজাকার, তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়েছে। যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার, এখন হয়েছে আড়াই লাখ। কারা এগুলো বৃদ্ধি করে?‘

তিনি বলেন, ‘বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৬ জন সচিব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অর্থাৎ এই সরকারের কাজই হলো দলীয় লোকজনকে মুক্তিযুদ্ধের লেবাস পরিয়ে দেয়া। শরণার্থী হওয়া সহজ, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হওয়া এত সহজ না। মুক্তিযোদ্ধা হতে হলে কামান-বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে হয়। মৃত্যুর সাথে প্রতিমুহূর্তে পাঞ্জা লড়তে হয়। একটা কালো কোর্ট গায়ে দিলেই মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায় না।’

রোববার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। জিয়াউর রহমানের ‘বীর উত্তম’ খেতাব বাতিলের প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

মেজর হাফিজ বলেন, ‘৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা স্লোগান দিয়েছিল, “বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো”। আবারও সময় এসেছে। আবারও এই স্লোগান ধরতে হবে। জিয়াউর রহমানসহ সকল মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান জানাতে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’

সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার যদিও নির্বাচিত না তবুও তাদের অনুরোধ করবো, এই ধরনের ঘৃণ্য উদ্যোগ গ্রহণ করে জিয়াউর রহমানের মতো সেরা মুক্তিযোদ্ধার খেতাব নিয়ে টানাটানি করে নিজেরা নব্য রাজাকারে পরিণত হবেন না। জনগণ আপনাদের ঘৃণার চোখে দেখবে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা যারা যুদ্ধ করেছিলাম, আমাদের সামনে একটাই চ্যালেঞ্জ, এই দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশের লুটেরা, ব্যাংক চোর, দুর্নীতিপরায়ণ সরকারের হাত থেকে মুক্ত করে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।’

মেজর হাফিজ বলেন, ‘অনেক রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। বাংলাদেশের ৫টি ক্যান্টনমেন্টে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকেরা ও ইপিআর যদি বিদ্রোহ না করতো তাহলে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হতো কি না সন্দেহ আছে। পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞে সাধারণ মানুষ যখন ভীত সন্ত্রস্ত, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পলায়নপর, সেই সময় গোটা জাতিকে আশা যোগাবার জন্য কালুরঘাট বেতর কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। সেই ঘোষণা জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে। আশার সঞ্চার করেছে।’

তিনি বলেন, ‘এই ঘোষণা বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক মাইলফলক। বাঙালি জাতির হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন মেজর জিয়াউর রহমান এই ঘোষণার মাধ্যমে। আমরা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সম্মান করি। তারা নির্বাচনে জিতেছেন, তাদের অধিকার রয়েছে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার। কিন্তু এই ধরনের ভয়াবহ বর্বর বাহিনীকে মোকাবিলা করার জন্য তাদের কোনো উপায় ছিল না। বাংলাদেশের ৫টি ক্যান্টমেন্টে যশোর, জয়দেবপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সৈয়দপুর ও চট্টগ্রামে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ৫টি ব্যাটেলিয়ন অবস্থান করছিল। যখন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আলোচনার ফাঁদে ফেলে কামান গোলাবারুদ আনা হচ্ছিল। সেসময় আমাদের সৈনিকদের মধ্যে সন্দেহ দানাবেধে ওঠে। আমরা রাজনৈতিক নেতাদের নির্দেশের অপেক্ষা করেছিলাম, যেটি আমরা পাইনি। তারপর এই গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালী জাতিকে রক্ষা করার জন্য মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা, বর্বর দখলদার বাহিনীর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্যে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালী সৈনিকেরা স্বাধীনতাযুদ্ধে আমরা ঝাপিয়ে পড়েছিলাম। তার পুরষ্কার কি পেলাম, আজকে ৫০ বছর পর বলা হচ্ছে জিয়াউর রহমান ‘পাকিস্তানের চর’। কেউ কেউ বলেন তিনি ‘রাজাকার’ ছিলেন।’

মেজর হাফিজ বলেন, ‘বাংলাদেশে ‘রাজাকার’ শব্দটি অত্যন্ত ঘৃণিত। আর একটি শব্দ ইতোমধ্যে ঘৃণিত হয়ে গেছে, যার নাম ‘জামুকা (জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল)’। এরা নব্য রাজাকারের দল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করতে চায়। মুক্তিযুদ্ধ কত ভয়াবহ, এই জামুকা ফামুকা তা কল্পনাও করতে পারে না। মেশিন গানের মুহূর্মূহু শব্দ, যুদ্ধ বিমানের শব্দ উপেক্ষা করে যুদ্ধ করতে হয়। জীবনের বিনিময়ে এই দেশ অর্জন করেছি। রাজনৈতিক নেতারা ছিলেন শরনার্থী। তবু তাদের শ্রদ্ধা জানাতে চাই। তারা একটি সরকার গঠন করে বিশ্বব্যাপি স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু যারা জীবন দিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করলো, জীবনের ঝুকি নিয়ে দেশটাকে স্বাধীন করলো, স্বাধীন বাংলাদেশে তাদেরকে কি সম্মান দেখাবেন না? এইটুকু কি আমরা আশা করতে পারি না?’

তিনি বলেন, ‘গতকাল একজন মন্ত্রী বললেন, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তার তথ্য-প্রমাণ নাকি তাদের কাছে আছে। ১৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ৬টার সময় আমি তৎকালীন উপ-প্রধান সেনাপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসায় গিয়েছিলাম। আমি তাকে বললাম ৩২ নম্বরের ওপরে আক্রমণ চালানো হয়েছে। আপাদমস্তক সৈনিক জিয়াউর রহমান বলেছেন, সো হোয়াট প্রেসিডেন্ট ইজ কিল্ড, ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার। প্রেসিডেন্ট নেই তো কি হয়েছে, উপ-রাষ্ট্রপতি আছেন। আমরা সৈনিক, আমরা সংবিধানকে সমুন্নত রাখবো। আমি এবং সাফায়েত জামিল সাক্ষী। তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু বইয়ে লিখে গেছেন। আমি লেখক নই, তাও একটা বই লিখেছি আমার জীবনের ঘটনা নিয়ে। সেখানে এই ঘটনা লেখা আছে। তিনি সৈনিক, আপাদমস্তক সৈনিক ছিলেন, কোনো ষড়যন্ত্রের সাথে কখনও জড়িত ছিলেন না।’

মেজর হাফিজ আরও বলেন, ‘একটি কাহিনী অবতারণা করা হয়েছে। কর্নেল ফারুক, যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। সে নাকি কোনো সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগে আমরা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। জিয়াউর রহমান বলেছেন, আমি সিনিয়র অফিসার, আমি এসবের মধ্যে নাই, তোমরা পারলে করো। এটা সর্বৈব একটি মিথ্যা কথা।’

তিনি বলেন, ‘এই সেই কর্নেল ফারুক, ৭৭ সালে লিবিয়া থেকে এসে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। তিনি গোপনে এসে বগুড়া ক্যান্টমেন্টে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, ঢাকায় এসে জিয়াউর রহমানের সরকারকে উৎখাত করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। জিয়াউর রহমান দক্ষ সেনানায়ক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, জনগণের প্রিয় একজন রাষ্ট্রপতি। তিনি কঠোর হস্তে ফারুককে দমন করেছেন এবং বিমানে করে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ফারুকের সঙ্গে যদি আতাত থাকতো, তাহলে কেন ফারুক, ১৯৭৭ সালে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে জিয়াউর রহমানকে উৎখাত করতে এসেছিল? এগুলো কোনো কল্পকথা নয়, বাস্তবতা। বাংলাদেশের সব মানুষ জীবিত, ১৯৭৭সাল সেদিনের কথা। মিথ্যাকে সত্য করার জন্য এই সরকার একের পর এক ষড়যন্ত্রের জাল বুনেই চলেছে। আমরা শুধু দেখেই যাচ্ছি।’

জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের আহবায়ক ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অব. সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম, যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন, আব্দুল কাদির ভূইয়া জুয়েল, শিরিন সুলতানা ও গণফোরাম নেতা মোস্তাক হোসেন প্রমুখ।

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন