কলেজ জাতীয়করণ প্রসঙ্গে কিছু কথা

  

মো. শরীফুর রহমান আদিল: স্বল্প খরচে মানসম্মত শিক্ষা, দেশের প্রান্তিক জনগণের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ এবং বাল্যবিবাহ রোধে সরকার প্রতিটি দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে স্কুল ও একটি করে কলেজকে জাতীয়করণ করার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছিল। কিন্তু সরকারের নেওয়া মহতী এ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে পর্যবসিত হচ্ছে! কলেজের বয়স, শিক্ষার্থী সংখ্যা, কলেজের পাসের হার ইত্যাদি বিষয়কে প্রাধান্য না দিয়ে জাতীয়করণের জন্য বেশ কিছু কলেজকে মনোনয়ন দেওয়া হলো?

সরকার চারটি শর্ত রেখে নীতিমালা প্রণয়ন করার কী দরকার ছিল, যদি সেই নীতিমালার কোনো প্রতিফলন না ঘটিয়ে কেবল এমপি, মন্ত্রীদের সুপারিশ আর আমলাদের সুপারিশের বিনিময়ে জাতীয়করণের জন্য প্রতিষ্ঠান মনোনয়ন পায়? কেনই বা সরকারের দেওয়া জাতীয়করণের জন্য প্রতিটি শর্ত থাকার পর অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে? এমনও দেখা গেছে যে বিভিন্ন স্থানের মন্ত্রী, এমপি, শিক্ষা কর্মকর্তাসহ অনেকের অসচেতনতার কারণে অনেক যোগ্য ও মানসম্মত কলেজকেও জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসা হয়নি। পরিশেষে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা প্রতিদিনই তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে—বিভিন্ন ধরনের বিক্ষোভ, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান কিংবা হরতালের মতো কর্মসূচি দিয়ে। আর এসব কর্মসূচি পালন করে কিছু কিছু কলেজ সফলও হয়েছে, অর্থাৎ ওই সব কলেজের নাম জাতীয়করণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, আবার কোনো কোনো অযোগ্য কলেজের নাম জাতীয়করণের তালিকায় থাকলেও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কর্মসূচি কিংবা সংবাদমাধ্যমে ওই সব কলেজের অযোগ্যতা আর টাকা লেনদেনের মাধ্যমে যোগ্য করানোর চেষ্টা বেরিয়ে এলে তাদের বাদ দেওয়া হয় এবং অন্য যোগ্য কলেজকে জাতীয়করণের আশ্বাস দেওয়া হয়, যেমন—তালিকায় নোয়াখালীর চরজব্বার কলেজকে বাদ দিয়ে তার বদলে সৈকত কলেজকে অন্তর্ভুক্ত করানো; আবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী কলেজকে অন্তর্ভুক্ত করে নাজিরহাট কলেজকেও একই উপজেলা থেকে জাতীয়করণের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে! কিন্তু অযোগ্য কলেজকে মনোনয়ন দেওয়ায় কোনো শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ রকম একটি যোগ্য কলেজের নাম ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া ডিগ্রি কলেজ, যার আয়তন, প্রতিষ্ঠাকাল, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, ফলাফল সব শর্তই পূরণ করেও তারা জাতীয় হয়ে উঠতে পারছে না। তাদের বাদ দিয়ে শেখ ফজিলাতুন্নেছা কলেজকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসা হয়। এ জন্যই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ফুলবাড়ীয়া উপজেলার ওই কলেজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলে। দীর্ঘ ৪৩ দিন নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে পুলিশের গুলি কিংবা বেধড়ক লাঠিপেটায় শিক্ষক ও ভ্যানচালকের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে!

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এ কোন সমাজে আমরা বাস করছি, যেখানে শিক্ষক কিংবা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা তাদের আঙিনায় আন্দোলন করতে পারবে না? বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় স্পষ্টই দেখা গেছে যে পুলিশ কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রবেশ করে ছাত্র-শিক্ষকদের বেধড়ক পেটাতে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিক্ষক ও ভ্যানচালক হত্যাকারী অতি উৎসাহী পুলিশ সদস্যের বিচার হবে কি? প্রশ্ন জাগে, পুলিশ কীভাবে একজন শিক্ষকের গায়ে তাঁর কর্মস্থলে এসে লাঠির আঘাত দিতে পারে? কে দেবে এই উত্তর? শিক্ষকদের বেতন দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না, তার মানে তাঁকে মূল্যায়ন করতে হয় সম্মান দিয়ে; কিন্তু আপনি পুলিশের অ্যাকশনে শিক্ষকের মৃত্যুকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? কেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সুরক্ষা আইন তৈরি হলেও শিক্ষকদের সেখানে আওতাভুক্ত করা হলো না? শিক্ষকরা কি এতই অবহেলিত? কেন জাতীয়করণ নিয়ে এই অসন্তোষ? কারা এই অসন্তোষ তৈরি করল, তাদের কি বিচার হবে?

শিক্ষককে লাঠিপেটা করতে হবে কেন? কেনই বা শিক্ষকদের জন্য রাবার বুলেট ব্যবহার করতে হবে? তারা তাদের দাবি আদায়ে নিজের কর্মস্থলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে পারবে না? তারা কি রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাংচুর করছিল, নাকি জনজীবনের স্বাভাবিকতাকে বাধা দিচ্ছিল? আর কত শিক্ষকের প্রাণ গেলে উপযুক্ত বেতন না দিয়ে সম্মানের বুলি শোনাবেন শিক্ষামন্ত্রী? আর কত শিক্ষক লাঞ্ছিত হলে এই সম্প্রদায়ের জন্য সুরক্ষা আইন তৈরি করবেন? আর কত পুলিশের বুটের লাথি আর বন্দুকের নলের আঘাত কিংবা বুলেট খেলে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসবেন? কেন মন্ত্রী-এমপিদের ডিও লেটারকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে? নীতিমালা থাকলে আবার ডিওর বিষয়টি আসবে কেন? এর দ্বারা কি বিষয়টিকে রাজনৈতিক বলে প্রমাণিত হয় না?

তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, কেউ কেউ ফুলবাড়ীয়ার ঘটনাকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার মনে করে শিক্ষক কিংবা ভ্যানচালকের মৃত্যুকে মূল্যহীন করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ কোন সমাজ, যেখানে শিক্ষকের মৃত্যুর পরও আমরা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার পথ খুঁজি? একজন শিক্ষকের করুণ মৃত্যুর পরও কোনো শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে কোনো একটা বিবৃতি দেওয়ার সাহস দেখায়নি সেইসব শিক্ষক সমিতি।

আমাদের মনে রাখা দরকার, পৃথিবীতে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একেবারে নিঃশর্তভাবে সন্তানের কল্যাণ চায়, এক হলো মাতা-পিতা আর অন্যটি হলো এই শিক্ষক সমাজ। অথচ এই তাদের নিয়ে আজ প্রশ্ন তোলা হচ্ছে! বলতে দ্বিধা নেই যে ফুলবাড়ীয়া ডিগ্রি কলেজের মতো দেশের সব মাধ্যমিক ও কলেজ শিক্ষকদের মনে জাতীয়করণ নিয়ে এ ধরনের ক্ষোভ বিদ্যমান, যার বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের মানববন্ধনের মধ্য দিয়ে। যা হোক, শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবার কাছে সমগ্র শিক্ষক সম্প্রদায়ের দাবি ফুলবাড়ীয়া ডিগ্রি কলেজের ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে পরবর্তী সময়ে না ঘটে, তার জন্য ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো ফুলবাড়ীয়া ডিগ্রি কলেজসহ সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণের আওতায় নিয়ে আসার ত্বরিত ঘোষণা দেওয়া।


লেখক : প্রভাষক, দর্শন বিভাগ, ফেনী সাউথ ইস্ট ডিগ্রি কলেজ।


পিএনএস/বাকিবিল্লাহ্

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech