ভাইরাস জ্বরের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

  

পিএনএস (মো. সহিদুজ্জামান) : ফ্লু বা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট রোগ। প্রায় সব ধরনের ফ্লুতে জ্বর হয়। এ ছাড়া অন্যান্য ভাইরাস যেমন ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা, ইবোলা ও নিপাহ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলেও জ্বরের লক্ষণ প্রকাশ পায়। আমাদের দেশে সচরাচর মানুষের যে জ্বর হয়, তা সাধারণত ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দ্বারা হয়ে থাকে।

মার্চ-এপ্রিল মাসে সাধারণত এই জ্বরের প্রকোপ দেখা যায়। তবে ইদানীং বছরজুড়েই এই জ্বরে অনেক মানুষকে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। এবার ভাইরাসজনিত জ্বরের তীব্রতা বেশি। কিছু ভাইরাস জ্বরে রোগীদের অবস্থা অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়ছে। এই রোগীদের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে।

বর্তমানে ভাইরাস জ্বর একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তবে কোন ধরনের ভাইরাস দ্বারা কোন জ্বর হচ্ছে তা শনাক্ত করা জরুরি। সাধারণ ফ্লুর মতো এসব ভাইরাল রোগের লক্ষণ দেখা দিলেও জটিলতার আশঙ্কা বেশি থাকে। সতর্ক থাকলে এসবের জটিলতা এড়ানো সম্ভব। তবে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং হৃদ্‌যন্ত্র, ফুসফুস ও লিভারের অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তিসহ যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য এসব জ্বর ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশে ইতিমধ্যে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেক বেড়েছে। এবার বিশেষ করে চিকুনগুনিয়ায় অনেক মানুষ ভুগেছে। সোয়াইন ফ্লু ও বার্ড ফ্লু আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হলেও সোয়াইন ফ্লু এইচ১ এন১ ভাইরাসে আক্রান্ত কমপক্ষে ১৯ জন রোগী গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বরিশাল ও দিনাজপুরের হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে বলে সরকারি সূত্রেই জানা গেছে। এর আগে ২০০৯ সালের জুন থেকে গত বছর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় সোয়াইন ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে কয়েকজনের মৃত্যু ঘটে। ওই সময় আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১০ হাজারের বেশি। এমনকি এ বছরও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ কয়েকটি দেশে সোয়াইন ফ্লুর প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

বিগত বছরগুলোতে বার্ড ফ্লু এইচ৫ এন১ ভাইরাসের কারণে বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পোলট্রি শিল্পের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এই বছরের জানুয়ারিতে ধামরাই ও রাজশাহীর দুটি মুরগির খামারে সংক্রামক এইচ৫ এন১ বার্ড ফ্লু ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। রাজশাহীতে ঝাঁকে ঝাঁকে মৃত্যু হয়েছে কাকের। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ এশিয়ার পাঁচটি দেশ বার্ড ফ্লুর নতুন ভাইরাস এইচ৭ এন৯-এর ঝুঁকির মুখে রয়েছে, কেননা এসব দেশে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় খোলাবাজারে হাঁস-মুরগি বিক্রি হয়।

বিগত বছরগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি ছিল। এ বছর ঢাকায় মশার শরীরে স্থান করে নিয়েছে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কেউ কেউ না কেউ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এডিস ইজিপটি ও এডিস এলবোপিকটাস নামক দুই প্রজাতির এডিস মশা দ্বারা চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাস রোগ ছড়ায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, চিকুনগুনিয়া মানুষ ছাড়াও বানর, বাদুড়, ইঁদুর ও পাখিদের হতে পারে, এ ছাড়া বানর ও সমগোত্রীয় অনেক প্রাণী ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাসের ধারক হিসেবে কাজ করে থাকে। এসব প্রাণী থেকে মানুষে এ রোগের সংক্রমণ হতে পারে। এ ছাড়া মানুষ থেকে মানুষেও এসব রোগের সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। শূকর বিভিন্ন ভাইরাসের মিশ্রণ-আধার বা বাহক হিসেবে কাজ করে। আমাদের দেশে শূকর পালন অপরিকল্পিত হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে শূকর ও শূকর পালনকারীর স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ জরুরি।

আমাদের দেশে এসব ভাইরাসজনিত রোগবিস্তারের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে অধিক জনসংখ্যা, ঘনবসতি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো ও অব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা এবং ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার ও পয়োনিষ্কাশনের অভাব উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বিশ্বায়নের ফলে মানুষ ও দ্রব্যাদির দ্রুত স্থানান্তর, অনিয়ন্ত্রিত সীমান্ত, জলবায়ুর পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নে মশা ও ভাইরাসের প্রজনন বেড়ে যাওয়া এবং কৃষিকাজে পোকামাকড় দমনে অপরিমিত কীটনাশকের ব্যবহারে মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে গিয়ে এসব রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে।

যেসব দেশে এসব সংক্রামক রোগ মহামারি আকার ধারণ করেছে, সেসব দেশ থেকে আসা যাত্রীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা এবং মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভ্রমণের সময় যাত্রীদের সাধারণ স্বাস্থ্য ঘোষণাপত্র সরবরাহ করে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানার বসিয়ে যাত্রীদের মনিটরিং করার কথা বলা হলেও গবেষণায় দেখা গেছে, থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে একটি দেশে ভাইরাল ফিভারের কোনো ব্যক্তিকে সঠিকভাবে শনাক্তকরণ এবং প্রবেশে বাধা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়, তাই সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আলাদা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

সঙ্গনিরোধ আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় আমদানি করা গবাদিপশু ও পশুজাত পণ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই দেশের ভেতরে প্রবেশ করছে। বৈধ ও অবৈধ পথে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে আসা অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত গবাদিপশু দেশের মানুষ ও পশুপাখির যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আক্রান্ত পশুপাখির সরাসরি বা মলমূত্রের সংস্পর্শে এসে সুস্থ পশু ও মানুষ আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া এসব পশু জবাইয়ে রক্ত ও আক্রান্ত মাংস, নাড়িভুঁড়ি, কলিজা, কিডনি, মগজ, টিউমার, সিস্ট বা অন্য কোনো আক্রান্ত অঙ্গ মানুষ, বিড়াল, কুকুর, শিয়াল বা অন্য কোনো মাংসাশী প্রাণী ভক্ষণ করে থাকে, যারা পরবর্তী সময়ে এসব রোগের জীবাণু সুস্থ গবাদিপশু ও মানুষে ছড়িয়ে থাকে। আমদানি করা রোগাক্রান্ত পশুর সঙ্গে আসা মশা, মাছি, আঠালি ও মাকড় দেশের ভেতরে রোগের জীবাণুসহ ছড়িয়ে যেতে পারে।

মৌসুমি জ্বরকে শুধু সাধারণ জ্বর বা ফ্লু হিসেবে বিবেচনা না করে প্রকৃত জীবাণুর অনুসন্ধান প্রয়োজন। প্রয়োজন জ্বরের প্রকৃত উৎস খুঁজে বের করা। এ পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ ও পশুপাখির স্বাস্থ্যকে আর আলাদা করে না দেখে ‘এক স্বাস্থ্য বা ওয়ান হেলথ’ হিসেবে বিবেচনায় আনতে হবে। স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। অন্যথায় নতুন নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেবে।

[প্রথম আলোর সৌজন্য, মো. সহিদুজ্জামান: অধ্যাপক, প্যারাসাইটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।]

szaman@bau.edu.bd

পিএনএস/জে এ /মোহন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech