রাষ্ট্রকেই উৎপলের সন্ধান ও তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে হবে

  

পিএনএস ডেস্ক : পূর্বপশ্চিম নিউজ পোর্টালের বার্তা অফিস তখন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়, বার্তা সম্পাদক বিপুল হাসান। বিপুলকে বলেছিলাম আওয়ামী লীগ বিটে একজন পরিশ্রমী রিপোর্টার দরকার খোঁজ নিতে। বিপুল একদিন আমার কাছে একটি ছেলেকে নিয়ে আসলো। ছেলেটি যখন রুমে প্রবেশ করলো তখন গড়নগাড়ন দেখে মনে হলো, একে দিয়ে রিপোর্টিং হবে। আলাপ করে দেখলাম, আওয়ামী লীগের অনেকের সঙ্গেই তার সম্পর্ক রয়েছে। আত্মবিশ্বাস নিয়ে সে কথা বলছিলো। তবে আমাকে অনুরোধ করছিলো, তাকে সিনিয়র রিপোর্টার পদ দিতে এবং আগে যে কর্মস্থলে কাজ করতো সেখানকার প্রাপ্ত সম্মানি থেকে এক টাকা হলেও বেশি দিতে। তার এই জায়গাটি আমার পছন্দ হলো এবং তার আবদার আমি রক্ষা করলাম। তাকে পছন্দ করার আরেকটি কারণ ছিলো, ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এবং মেধাবীদের প্রতিষ্ঠানখ্যাত নটরডেম কলেজের স্টুডেন্ট ছিলো উৎপল। নটরডেম কলেজে ভর্তি পরীক্ষায়ও সে মেধাতালিকার শীর্ষে ছিলো। কিন্তু নটরডেম থেকে পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে জগন্নাথে ইংরেজী সাহিত্যের অনার্সে ভর্তি হওয়া আমার দৃষ্টি কেড়েছিলো। এবং সেখান থেকে অনার্স শেষ না করে বিএ পাস কোর্সে গ্রাজুয়েশন করার ঘটনায় আমার মনে হয়েছিলো, এ একটু আলাদা প্রথাবিরোধী।


তাৎক্ষণিক তাকে একটি বিশেষ রিপোর্ট করার আইডিয়া দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা করে দেয়। তাকে যোগদাস করায়। একদিকে আওয়ামী লীগ বিটে কাজ করে অন্যদিকে আমার ডিক্রেশন নেয়। কিন্তু কাজ শুরু করতে না করতেই ধরা পড়ে সে একজন খেয়ালি, ভাবুক এবং বোহেমিয়ান ধরণের। ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন বড় নয়। রিপোর্টিংয়ের নেশা থাকলেও বন্ধুপাগল চরিত্র তাকে আড্ডায় টানে। আজ এখানে কাল ওখানে। দিনে রিপোর্টার্স ইউনিটি ও সন্ধ্যার পর কারওয়ান বাজারে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত রিপোর্টারদের সঙ্গে আড্ডায় তাকে যেতেই হয়। আড্ডার সঙ্গে সংবাদকর্মী ও লেখকদের গভীর নৈকট্য রয়েছে। আড্ডা সৃষ্টিশীলতার উৎস। আড্ডার জন্য তাকে আমি কখনও কিছু বলতাম না। কিন্তু অফিস শৃঙ্খলাবোধ সে মানতে চাইতো না। নিয়মের মধ্যে ছকে বাধা জীবন তাকে টানতে পারেনি। এ জন্য বকাঝকা করলেও তাকে মেনে নিতাম। আদর করতাম, ভালোবাসতাম। যার সঙ্গে মিশতো তাকেই আপন করে নিতো। তারই আপন হয়ে যেতাে। আওয়ামী লীগ বিটে কাজ করলেও অন্য রাজনৈতিক বিটে সে ছুটে যেতাে। তাই নয়, স্পাের্টস বিটের প্রতি তার ছিলো বাড়তি আকর্ষণ। ক্রিকেট নিয়ে মাঝেমধ্যে কলাম লিখতো, রিপোর্টিংয়ে জড়িতে যেতো।


এই চরিত্র ভালো লাগলেও সবচেয়ে বেশি তটস্থ থাকতে হতো যে কোন খবর বা ঘটনা আদ্যপ্রান্ত না জেনেই, সত্যতা যাচাই না করেই সেন্সেশন ক্রিয়েট করা রিপোর্টের প্রতি তার সেন্সরশীপ মাত্রা জ্ঞান কম ছিলো। মাঝে মধ্যে অফিস মিটিংয়ে তাকে একগুয়ে, জেদি ও পাগলাটে মনে হতো। যুক্তিতর্ক মানতো না। আবেগতাড়িত থাকতো। তার ইতিবাচক দিকগুলো যেভাবে আমাদের সঙ্গে আটকে রেখেছিলো তেমনি তার নেতিবাচক দিকগুলো বিরক্তকরও ছিলো। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটেছিলো।


কর্পোরেট সংস্কৃতির আগ্রাসনে পতিত সাংবাদিকতা থেকে বেরিয়ে নিজের মতো পূর্বপশ্চিম নিউজ পোর্টাল শুরু করার সময় প্রিন্ট মিডিয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকলেও এখানে আমার অভিজ্ঞতা ছিলো না। যাদের কথার উপরে সরলভাবে আস্থা ও বিশ্বাস করেছিলাম পরবর্তীতে দেখেছি তাদের অভিজ্ঞতা আরো কম। প্রিন্ট মিডিয়ার ক্ষেত্রে তো দূর্বলই। তারপরেও স্নেহভাজন সৈয়দ সারোয়ার রহমান প্রিন্সকে নিয়ে এই প্রতিষ্ঠান বড়সড় করেই শুরু করেছিলাম। প্রত্যাশার বিজ্ঞাপন ধরতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছি। সকল সঞ্চয় ঢেলে দিয়ে ধারদেনা করে নিঃস্ব হয়েছি। কিছু কিছু জায়গায় ঠকেছি। তবুও নিউজ পোর্টালটি বাঁচিয়ে রাখার লড়াই করছি। স্বপ্নের মৃত্যু হতে এখনও দেয়নি। শুরু থেকেই শুভাকাঙ্খি হিসেবে এই প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা হিসেবে ছোটবেলার বন্ধু সঙ্গীতশিল্পী সেলিম চৌধুরী, রাজনীতিবিদ এবিএম জাকিরুল হক টিটন, নির্মাতা ও অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী ভূমিকা রেখেছেন।


আন্তরিকভাবে লেখায় পরামর্শে ও সক্রিয় ভূমিকায় সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন খুজিস্তা নূর-ই-নাহারিন মুন্নি। পূর্বপশ্চিমের বার্তা অফিস এখন মতিঝিলে। সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদক হিসেবে খুজিস্তা নূর-ই-নাহারিন মুন্নি এটির নেত্বত্ব দিচ্ছেন। কোথাও আটকে গেলে সেখানে আমি সহযোগিতা করছি। উৎপল দাস সবার মায়া কাড়তে জানে। মুন্নিরও মাতৃস্নেহ কেড়েছিল। উৎপলকে তিনিই আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন। উৎপল বদলায়নি। তার মতোই কাজ করছিল, অফিসের সবাই তাকে পছন্দ করছিল। কোন বিব্রতকর নিউজ সেন্সর ছাড়াই যদি আপ করে সে জন্য তাকে আর এডিটরিয়াল এডমিন দেওয়া হয়নি।


প্রিন্ট মিডিয়ায় কাজ করতে গিয়ে দেখেছি প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পর্যায়ে যারা থাকেন তারা প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের ব্যাপারেই অবহিত থাকেন। কারণ রাত ১০টায় ছাপা শুরু হয়। বিকেলের বৈঠকেই তার জানা যায়। কিন্তু নিউজ পোর্টাল এতোই স্পর্শকাতর যে প্রধান সম্পাদক, সম্পাদক অনেক রিপোর্ট পোর্টােলে চলে যাওয়ার পরও জানেন না। বার্তা সম্পাদক থেকে নিউজ রুম এডিটর ও শিফট ইনচার্জদের হাতেই সবকিছু থাকে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু হলে তারা মাঝেমধ্যে অবহিত করেন। ২৪ ঘন্টা মিনিটে মিনিটে নিউজ আপ হতে থাকে। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দুনিয়ায় একুশ শতকের কান যেমন সংবাদ প্রধান তেমনি সংবাদ জগতে সকল গণমাধ্যমের মধ্যে অনলাইন মিডিয়া এখন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। উৎপল দাস এমন কোন রিপোর্ট করেননি যাতে কোন ব্যক্তি বা কোন মহল এই প্রতিষ্ঠান বা তার প্রতি ক্ষুব্ধ ও রুষ্ঠ হতে পারেন।


উৎপল দাস একটি সাধারণ পরিবারের অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক চিত্তরঞ্জন দাসের সন্তান। পারিবারিক শত্রুতাও তার সঙ্গে নেই। নেই তার কারো সাথে ব্যক্তিগত বিরোধ। কিন্তু ১০ অক্টোবর অফিস থেকে বের হওয়ার পর উৎপল নিখোঁজ। প্রথম দুই তিনদিন অনুপস্থিত থাকায় মনে করেছিলাম উৎপল স্বভাবসুলভ আচরণে কোথাও ঘুরতে গেছে। গেল দুর্গাপূজার আগে খুব খুশি হয়ে বলেছিলো বেতন পেয়ে মাকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছি। তার খুশি দেখে আমারও আনন্দ হয়েছে। আমাকে বলেছিলো, ১৫ অক্টোবর থেকে লালন সাইজীর তিরোধান দিবস উপলক্ষে লালন স্মরণোৎসব। ছুটি দিলে উৎপল যেতে চাই। তাকে আটকাতে বলেছিলাম আমিও তো যেতে চাই, একসঙ্গেই যাবো। মনে করেছিলাম মোবাইল বন্ধ করে উৎপল হয়তো সেখানেই গেছে। তার অনুপস্থিতির কারণে অফিস থেকে সম্পাদক তাকে চিঠি দিয়েছেন। তার ঠিকানায় লোক পাঠিয়েছেন। কোন সন্ধান মিলেনি!


সবাই উদ্বিগ্ন হতে থাকেন। তার বন্ধুবান্ধবরাও বলেন, তাদের সাথেও যোগাযোগ নেই। সমকালের সংবাদকর্মী উৎপলের বন্ধু রাজীব জানান, উৎপলকে নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। পূর্বপশ্চিম নিউজপোর্টালের সম্পাদক খুজিস্তা নূর-ই-নাহারিন মুন্নি ও যুগ্ম বার্তা সম্পাদক শাহনেওয়াজ সুমনকে নিয় পাগলের মতো মতিঝিল থানায় ছুটে যান। জিডি করেন, সেটি ২২ অক্টোবরের ঘটনা। উৎপলের বাবা চিত্তরঞ্জন দাস এক সহজ সরল শিক্ষক। উদ্বভ্রান্তের মতো পরদিন ২৩ অক্টোবর ঢাকায় ছুটে এসে আরেকটি জিডি করেন। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন যৌথভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি অনুজপ্রতীম শাবান মাহমুদ ও সোহেল হায়দার চৌধুরী আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসেন। র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ ও ঢাকার পুলিশ কমিশানর আসাদুজ্জামান মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা আন্তরিক সহযোগিতার হাত বাড়ান। ২৬ অক্টোবর ঢাকায় উৎপলের বাবা ও দিদি ভাইয়েরা আসেন। তাদের নিয়ে আমরা সংবাদ সম্মেলন করি। সংবাদ সম্মেলনে স্নেহময়ী পিতা ও দিদিদের বুকভাঙা কান্নায় আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়। তারা সরকারের প্রতি তাদের সন্তান ও ভাইকে খুঁজে বের করে দেওয়ার জন্য আকুতি জানান।


উৎপল দাস শুধু সংবাদকর্মীই নন, এই স্বাধীন রাষ্ট্রের একজন নাগরিকও। এভাবে একটি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় উৎপল হারিয়ে যেতে পারে না। রাষ্ট্রকেই তার সন্ধান ও বাবা মায়ের কোলে, আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব। একজন সংবাদকর্মী উৎপল দাস এভাবে নিখোঁজ হতে পারেন না, এভাবে হারিয়ে যেতে পারেন না। ব্যথিতচিত্তে রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকুল আবেদর আমাদের উৎপলের সন্ধান দিন। আমাদের উৎপলকে ফিরিয়ে আনুন। উৎপলের বাবা বাকরুদ্ধ। বোনেরা অঝোরে কাঁদছেন! উৎপলের মা উদ্বভ্রান্ত শয্যাশায়ী। উৎপলকে ফিরিয়ে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব।


[লেখক: প্রধান সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ।]

পিএনএস/জে এ /মোহন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech