‘প্লিজ বেগম জিয়াকে হাঁটতে দিন, তিনি হাঁটলে গণতন্ত্র হাঁটবে’

  


পিএনএস ডেস্ক: জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ ক্রমেই বাড়ছে।নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই টান টান উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। আর এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতিতে সহিংসতার যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল তার একটা প্রাথমিক আলমত লক্ষ্য করা গেছে গত শনিবার। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প পরিদর্শন ও ত্রাণ সহায়তা করতে যাওয়ার পথে ফেনী ও মিরসরাইয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলায় চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়বেশ কয়েকটি গাড়ি। আহত হন সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন।

এসব ঘটনা নির্বাচন কেন্দ্রীক সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কাকে আরো স্পষ্ট তুলছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা যেন আমাদেরকে এক অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে সামনের পরিস্থিতি নিয়ে আমরা সবাই উদ্বিগ্ন।এ উদ্বেগ শুধু দেশবাসির মধ্যেই নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও। এরই মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা গণতান্ত্রিক আচরণ বজায় রাখার জন্য সকল পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে যতটুকু জানি তাতে গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত পরমতসহিষ্ণুতা। গণতন্ত্র তো হলো সেই পরিবেশ- যেখানে সব দল মত ও বিশ্বাসের মানুষ তাদের সব চিন্তা-চেতনা মুক্তভাবে প্রকাশ ও চর্চা করতে পারে।গণতান্ত্রিক সমাজে যেমনটি কারো মত প্রচারে বাধার সৃষ্টি করা যায় না, তেমনি কোনোভাবেই কাউকে আঘাত তো দূরের কথা, অসম্মান করাও যায় না। ফলে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে হলে নিজেদের মত নিজেদের মতো করে জনগণের কাছে উপস্থাপনের মাধ্যমেই করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যত্যয় হলে গণতান্ত্রিক রীতিনীতির ব্যত্যয় হবে, সমাজ হারাবে গণতান্ত্রিক চরিত্র। ঘটবে গণতন্ত্রের বিপর্যয়। সমাজে প্রভাব বিস্তার করবে পেশিশক্তি।

আজ বাংলাদেশ কী সে পথেই এগুচ্ছে? আমরা গত কয়েক বছর ধরে কী দেখলাম। সরকার ও বিরোধী পক্ষ গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিবর্তে এক বিরাট শক্তির মহড়া দিয়েছে। দু’পক্ষের এই শক্তির প্রতিযোগিতায় দেশের অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। সমাজ হারাচ্ছে তার স্বাভাবিকতা।এসব কেন হয়েছে,অবশ্য এর জবাব হাসিনা-খালেদার কাছে ভিন্ন। তবে আমরা জনগণ জানি, এসব কিছুর দায় তারা কোনো মতেই এড়াতে পারেন না। কিন্তু তাতে আমাদের কী বা করার আছে!

রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতা বলে কথা। যখন যার হাতে তখন তারা নিজের মতো করেই এই শক্তিকে ব্যবহার করেন। আর সেই শক্তির প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সাধ্য কার বা আছে!

অন্যথা আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই গণতান্ত্রিক রীতিনীতিতে বিশ্বাস করি- তবে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের স্বাধীনভাবে কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেয়া জরুরি। এর আগে আমরা কী দেখলাম, ২০১৪ সালের জানুযারি মাসের প্রথমার্থে দেশের প্রধান বিরোধি ২০ দলীয় জোট যখন ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির ডাক দিলো সরকার সেটা পালন করতে দিলো না, বরং জোটনেত্রী বেগম জিয়াকে বালুর ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হলো গুলশান কার্যালয়ে। এরপর বিরোধী জোট ডাক দিলো অনির্দিষ্ট হরতাল-অবরোধের। পরবর্তীতে যা হবার তাই হলো। আমার মতো অনেকের ধারণা- ওই সময় সেই কর্মসূচি তাদের পালন করতে দিলে সরকারের কীবা ক্ষতি হতো। কিন্তু সেটা করতে না দেয়া এবং ম্যাডামকে অবরুদ্ধ করে রাখার ফলে আমরা কী দেখলাম- জনগণ ঘরের মধ্যে অবরুদ্ধ হলো, গোটা দেশ অচল হলো। গণতান্ত্রিক রীতিতে যা সহজেই এড়ানো যেত।

এরপর অবশ্য বিরোধী জোটের ছাড়ে ওবং সরকারের রাজনৈতিক কূটকৌশলেই দেশের পরিস্থিতিটা শান্ত হলো। রাজনীতিতে কৌশল অবলম্বন করা দোষের কিছু না। তবে সেটা হতে হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে। এরপর আমরা দেখলাম- ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই জাতীয় রাজনীতিতে একটা পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু হয়, প্রায় তিন মাস ধরে বিরোধী জোটের যে রাজনৈতিক আন্দোলন চলছিল,সেই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। ২৪ মার্চ, ২০১৫ থেকে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলন কর্মসূচি তিন সিটিতে হরতাল স্থগিত করা হয়। এছাড়া পুরো আন্দোলনও অঘোষিতভাবে স্থগিত করার ইঙ্গিত মিলে জোটের পক্ষ থেকে।

ফলে বলা যায়- ওই সময় সব দলই নির্বাচনমুখী হয়। ওই সময় ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নামেন। আমরা জানি, গণতান্ত্রিক রীতিনীতিতে যে কোনো নির্বাচনে সকলের অংশগ্রহণ একটি সুন্দর নির্বাচনের পূর্বশর্ত। সে হিসেবে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নামার বিষয়টি ছিল খুবই ইতিবাচক।এতে সিটি নির্বাচন অনেকটাই অলংকৃত হয়। এছাড়া বেগম জিয়ার অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচনী শর্তও পূরণ হয়। সিটি নির্বাচনের প্রচারণায় খালেদা জিয়া মাঠে নামায় একটা উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

কিন্তু আমাদের উদ্বিগ্ন করে ওই সময় বেগম খালেদা জিয়াকে কালো পতাকা প্রদর্শন, ইটপাটকেল নিক্ষেপ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে কাওরানবাজারে তিন তিনবারের নির্বাচিত সাবেক খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তার গাড়ি বহরের বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। রাজধানীর বাংলামোটরেও তার গাড়িবহরে হামলা হয়। এসব ঘটনা পুলিশের চোখের সামনে ঘটলেও অনেকটা নির্বিকার থাকতে দেখা যায়। এছাড়া হামলার পর জড়িতদের গ্রেপ্তার না করে উল্টো খালেদা জিয়ার নিরাপত্তারক্ষী ও বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।এসব হামলাকে জনরোষ ও নাটক বলে আখ্যায়িত করা হয়। এ ঘটনায় ওই সময় বিএনপি হরতালেরও ডাক দেয়।

চার বছরপর আজ আমরা আবার কী দেখছি, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে-ফের রাজনীতিতে যেন অশনিসংকেত। বেগম জিয়াকে পুনরায় ঘরের ভেতরে আবদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর বাস্তবে যদি সেটাই করা হয় তবে কী ঘটবে তা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি।

এ কথা সবারই জানা, আমরা যতই দুই নেত্রীকে দোষারোপ করি না কেন, দেশের বেশীর ভাগ জনগণ কিন্তু তাদের ছায়াতলে। ফলে দুই নেত্রীর প্রতি রয়েছে দেশের জনগোষ্ঠীর এক বিশাল অংশের জনসমর্থন। ফলে ইচছা করলেই কেউ কাউকে দমাতে পারবে না, এটাই বাস্তবতা।

ফলে যে অবস্থা চলছে তা অব্যাহত থাকলে বলা যায়- অঘোষিতভাবেই বেগম জিয়া ঘরে না হয় কার্যালয়ে আবারো আবদ্ধ হয়ে পড়তে পারেন। আর এতে করে কী হবে- আবারো দেশে ফিরে আসবে সেই পুরনো রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা এবং হরতাল অবরোধ।

দীর্ঘ ঘাত-প্রতিঘাতের পর দেশের রাজনীতিতে আজ যখন সবদল নির্বাচনমুখী হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের সংলাপেও সবদলের অংশগ্রহণে একটা ইতিবাচক পরিবেশ তৈরির ইঙ্গিত মিলছে ঠিক তখনই বেগম জিয়ার গাড়িবহরে হামলা খুবই ন্যাক্কারজনক ঘটনা। হামলাকারীরা যে দলেরই হোক তাদেরকে আইনের আওতায় আনার বিষয়টি জাতি প্রত্যাশা করে। কিন্তু মন্ত্রী-এমপিদের এ বিষয়ে দায়িত্বহীন বক্তব্য জাতি খুবই আশাহত। কেননা, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গাড়িবহরে হামলার বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর, এটা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এরপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তার না করে বরং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও অন্যান্য নেতারা যেভাষায় কথা বলছেন তা আরো বেশি উদ্বেগজনক। কেননা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে বিএনপিই পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছেন আওয়ামী লগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী এবায়দুল কাদের। কাদের এও বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিএনপি কতটা আন্তরিক? তাদের কনসানটা শুধু রাজনীতির। এছাড়াও এ ঘটনা অন্যান্য নেতা, মন্ত্রী-এমপিরা যেভাষায় কথা বলছেন তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। হামলা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত কিংবা জড়িতদের আইনের আওতায় না এনে উল্টো দায়ভার বিএনপির ঘাড়ে চাপালে সেটা দেশবাসীর কাছে কোনোভাবেই যোগ্য হতে পারে না। বরং ক্ষমতাসীনদের ভূমিকা নিয়ে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে সবমহলে কমবেশি প্রতিক্রিয়াও হচ্ছে।

এরমধ্যে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদক গোলাম মর্তুজার ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে কিছুটা অনুভব করা যায়। গোলাম মর্তুজা লিখিছেন, ‘খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা সাজানো’- আওয়ামী লীগের বক্তব্য। বক্তব্যের এই অংশটি একদম সঠিক। হামলা এবং পরবর্তী প্রচারণা- পুরোটাই সাজানো। হামলাকারী হিসেবে যাদের পরিচয় জানা গেল, স্পষ্ট ছবি দেখা গেল তারা সবাই আওয়ামী লীগ- ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী- ক্যাডার। তাদেরকে দিয়ে হামলার পরিকল্পনা ‘সাজালো’ বিএনপি! বিএনপির সাজানো’ পরিকল্পনায় অংশ নিল ছাত্রলীগ!

সাংবাদিকদের উপর আক্রমণ কেন? বিষয়টি খুবই পরিস্কার। সাংবাদিকদের কেন এত বড় সাহস হবে যে, বিএনপির সংবাদ প্রচারের উদ্যোগ নেবে? এ ধরনের সাহস দেখালে পরিণতি কী হতে পারে, তার একটি রিহার্সেল দেওয়া হলো মাত্র। নিজেদের দলদাসে পরিণত করলে ‘অসম্মান’ বলে কোনো শব্দ নিয়ে ভাবতে হয় না। লাথিকে ‘সম্মানজনক’ পুরস্কার মনে করতে হয়।

‘কেন খালেদা জিয়া সড়ক পথে গেলেন, কেন আকাশ পথে গেলেন না’- এই প্রপাগান্ডায় নিজেদের সম্পৃক্ত করতে হয়, অথবা নীরব থেকে প্রপাগান্ডায় সম্মতি জানাতে হয়।

ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বহীন বক্তব্যে এরকম অনেকে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করছেন। ফলে বিষয়টি বুঝতে দেশবাসীর মোটেও অসুবিধা হচ্ছে না। ক্ষমতার মোহ কাটিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের লোকজনও বিষয়টি কিছুটা হলেও অনুভব করতে সক্ষম হবেন বেলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

তাই মনে পড়ে গণতন্ত্র সম্পর্কে আব্রাহাম লিংকনের সেই কথা “…government of the people, by the people, and for the people.”। ফলে আমরা যদি গণতন্ত্রের প্রতি সামান্যতম বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা রাখি তবে সবাইকে সেই চর্চা করার সুযোগ দেয়া উচিত। সবশেষে, আমি সরকারের প্রতি আহবান রাখবো- দয়া করে ম্যাডাম জিয়াকে নিরাপদে রাস্তায় চলতে দিন হাঁটতে দিন। তিনি হাঁটলে, গণতন্ত্র হাঁটবে, তিনি রাস্তায় চলতে পারলে দেশের সব কিছুই স্বাভাবিকভাবে চলবে। অন্যথা, তিনি ঘরে আবদ্ধ হয়ে গেলে আমরাও আবদ্ধ হয়ে যাবো। কিন্তু আমরা সাধারণ জনগণ আর আবদ্ধ হতে চাই না। প্লিজ, ম্যাডামকে বাধা দিবেন না। তাকে নির্বিঘ্নে চলতে দিন। -ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech