একটি অসহায় রাস্তার অাত্নকান্না...

  

পিএনএস ডেস্ক: অামার নাম কংক্রিটের রাস্তা।জন্মের পরে অামি কাচা রাস্তা নামে পরিচিত ছিলাম কিন্তুু কালের বিবর্তনে অামার নাম পরিবর্তন হয়ে অাজ অামি কথিত কংক্রিটের রাস্তা নামে খ্যাত।যদিও অামার বুক চিরে দেখলে কোথায় কোন কংক্রিটের অস্তিত্ব কিঞ্চিৎ পাওয়া যাবে কিনা অামি নিজেও সন্দিহান। তথাপি সরকারী দলিল দস্তাবেজের চাপে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক লুটেরা অামার উপর কংক্রিটের রাস্তা নামটি চাপিয়ে দেয়ার কারনে অাজ অামি ভীত সন্ত্রস্ত হয়েও এই নামে নিজেকে পরিচয় দিতে বাধ্য। অামার অন্যান্য ভাইয়েরা কাচা রাস্তা,মাটির রাস্তা,ইটের রাস্তা, সিমেন্ট ঢালাই রাস্তা,লাল গালিচার রাস্তা এবং মেঠো রাস্তা সহ বিভিন্ন নামের পরিচয়ে পরিচিত। তারাও যারপরনাই অামার মতই বরাবরি সন্দিহান ও সংকোচিত। অামার সৃষ্টি পর থেকেই অামি কার, তা নিয়ে রয়েছে বরাবরি ধ্রুবপদী প্রশ্ন এবং সুবিধাবাদীদের মুখে রয়েছে টক-ঝাল-মিষ্টির সংমিশ্রণজাত একটি সুযোগসন্ধানী বয়ান। কুলীন অর্থাৎ অভিজাত শ্রেনীর লোক বলে অামি নাকি জনগনের সম্পত্তি,অাবার যারা রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধি, তারা বলে অামি নাকি তার অসীম কৃপাময় দৃষ্টির কারনে টিকে অাছি। সমাজের যারা অামাকে তৈরী করতে ঠিকাদারি ব্যবসা করে, তারা বলে অামি নাকি তাদের ইচ্ছা-মর্জ্জির উপর নির্ভরশীল।

কুলীন সমাজের বৈভব ও বিত্তশালীরা অামাকে জনগনের সম্পত্তিরুপে প্রচার প্রোপাগান্ডা চালিয়ে বরাবরি তাদের স্বার্থ হাসিল করে অাসছে। অাজ তাদের লাখপতি থেকে কোটিপতির বনে বিচরন। কিন্তুু অামি হয়ে যাচ্ছি দিনকে দিন অন্তঃসার শুন্য এক বিরানভূমি ন্যায়। এরাই অামার জীর্ণ-শীর্ণ দেহখানি বিউটি পার্লারের ন্যায় খানিকটা লেপে-মুছে নতুন করার চেষ্টা করে এবং তার বিনিময়ে লুটেপুটে খায় অামাকে গড়ার কোটি-কোটি টাকার বাজেট। রাষ্ট যন্ত্রের হরেক রকমের নিয়মকানুনের যাতাকলে পরে অামি বরাবরি বড্ড রকমের প্রতারনার শিকার।রাষ্ট যখন তুলে দেয় অামাকে কুলীনদের হাতে দেখভাল করার জন্য তখনি অামার প্রতি প্রতারণার প্রবল গ্রাস ভর করা শুরু করে। এই প্রতারণার ফাঁদে অামি পরেছি যখন অামাকে তৈরী করা হয়েছে জনগনের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার কথা বলে এবং চলছে নিয়মিত প্রতারণা,যা অাজও চলমান।

শোষনতান্ত্রিক সমাজে অাজ যারা রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধি, তারা অামাকে রীতিমতো ব্যবহার করে ভোট রাজনীতির যুদ্ধে। নির্বাচন অাসার বছরখানেক পূর্ব থেকেই অামাকে সংস্কার নামক প্রতারনার ফাঁদে অাটকায়। সরকার থেকে অামাকে রক্ষার নামে বরাদ্দ অাসে মোটা অঙ্কের নির্বাচনমূখী বাজেট। বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থ যদি হয় ১০০টাকা, তাহলে অামার শরীর উন্নয়নের জন্য এসে পৌছায় ২০টাকা। কিন্তুু অামি রাস্তা নামে খ্যাত বলে এর প্রতিবাদ করার ক্ষমতা অামার যেমন থাকে না পাশাপাশি অামার বুকে যারা নিয়মিত পথিক বেশে চলাচল করে তারা অামার পক্ষে দুই কথা বলার সাহস রাখে না।তারা জানে এমন সব দানব রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে ন্যায় সংগত প্রতিবাদ করলে তারা গুম কিংবা গুপ্তহত্যার শিকার হতে পারে। তাই তারা নিজের জীবন ও পরিবারকে ঝুকিতে রেখে অামার প্রতি অন্যায় ও অবিচারের জন্য কোন প্রতিবাদটুকু করার সাহস রাখে না। শুধু কি তাই? সমাজে অামার মত এমন শোষিত মানুষগুলো ভয়ে তাদের ন্যায্যতাটুকু গ্রহন করতে পারে না।এমনকি মৌলিক চাহিদাও খর্ব হচ্ছে প্রতিনিয়ত প্রতিটি নিষ্পেষিত সাধারন মানুষের।যাদের পক্ষে কথা বলার কেউ সাহস রাখে না। অামার কথা না হয় বাদই দিলাম।কারন অামার কোন নিজস্ব মালিকনা নাই,যতটুকু অাছে শুধু খাতা-কলমে,দলিল-দস্তাবেজ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ।

নির্বাচন অাসলে এই সব রাজনৈতিক জনপ্রতিনিধিরা অামাকে নিয়ে অকপটে মিথ্যাচারের এক একটি অাজগুবি গল্প সৃষ্টি করে,এমন সব মিথ্যাচার চালায়, যা যেকোন সত্যকেও হার মানায়।তারা কিছু কট্টর দল-অন্ধ, সুবিধাভোগী, ভাড়াটে জনগনকে একত্রিত করে লোক সন্মুুখে অকপটে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে অাত্ন-দাম্ভিকতার সাথে প্রচার করে অামি নাকি তারই হাতে গড়া। তাদের বক্তব্যের সারাংশ যদি বলি তাহলে এমন অাপনাদের এলাকায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে অামাদের সরকার যে কংক্রিটের রাস্তা তৈরী করে দিয়েছে, এটা অামাদের সরকার তথা ওমুক রাজনৈতিক দল বলেই কেবল সম্ভব হয়েছে।

যদি অামাদের বিরোধী রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় অাসতো,তাহলে এখানে তো রাস্তা হতোই না বরং খাল তৈরী করতো যাতে অাপনারা সমাজ ও রাষ্ট থেকে জনবিছিন্ন থাকেন।অামাদের দল জনবান্ধব দল,তাই অাপনাদের জন্য এটা করেছি, ওটা করেছি”। অামাকে ব্যবহার করে ৩০ কোটি টাকার বরাদ্দকৃত অর্থের ১৫কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে,এ কথা তারা কখনোই বলবে না।বরং অামি নাকি তাদের দান-দাক্ষিন্য ও কৃপায় তৈরী সেটাই তাদের মূল প্রচার প্রচারনা। অামার সৃষ্টি ও জন্মের ইতিহাসের ইতিবৃত্তের প্রারম্ভিকা নাকি তারই হাত দিয়ে শুরু। জনগনের মাঝে সভা-সমাবেশে অামাকে জড়িয়ে এমন হীন মিথ্যাচার চালিয়ে তার ভোট রাজনীতির মাঠে যুগ যুগ ধরে এভাবেই স্বার্থ হাসিল করে যাচ্ছে কিন্তুু অাজও অামার কোন উন্নতি লোক সমাজে পরিলক্ষিত হয় নাই। কারন অামার নাম রাস্তা। অামি কার, তা সবারই অজানা।

অামাকে তৈরী, মেরামত ও সংরক্ষণের জন্য যখন টেন্ডার অাহব্বান করা হয় বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্টান থেকে,তখন থেকেই শুরু হয়, অর্থ লুটের প্রারম্ভিকতা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অস্ত্রের মহড়া, রাজনৈতিকদলগুলোর সহযোগী সংগঠন গুলোর অস্ত্রের মহড়া সহ গুম, খুন হয়ে থাকে অামার এই টেন্ডারকে কেন্দ্র করে। তুলনামূলক সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ যেসব কম দরদাতা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, তাদের অাহব্বানকৃত দরপত্র অর্থাৎ টেন্ডার জমা দিতেই দেয়া হয় না, লুটপাট নাটকের সাজানো অংশ হিসাবে। ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় বেশী দরদাতা ব্যক্তিকে প্রশাসন টেন্ডার দিতে বাধ্য হয়। এখানেও উভয়ের মাঝে লেনদেন হয় কমিশন অাকারে বিপুল অঙ্কের টাকা।

অামাকে তৈরী করার প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হয় খননের মাধ্যমে, চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকে খনন করতে হবে ১৮ ইঞ্চি, কিন্তুু খনন করা হয় ১২ ইঞ্চি গভীরতা করে। চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকে তৈরীতে প্রয়োজন পাথর কিন্তুু ব্যবহার করা হয় ঠিকাদারের নিজস্ব ভাটার অবিক্রয় উপযোগী ও অব্যাহত কম পোড়া ইট। চুক্তিপত্রে থাকে অামাকে তৈরীতে অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে শক্তিশালী রড,কিন্তুু ব্যবহার করা হয় রডের পরিবর্তে বাশ। শুধু কি তাই? অামার প্রতিবেশী যে সরকারী ভবনটি,তার সৃষ্টির ইতিহাস অারো করুণ ও ভয়াবহ। অামার প্রতিবেশী ভবনটি গড়ে তুলতে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় ঠিকাদারের নিয়োগের প্রক্রিয়া থেকেই শুরু হয় লুটপাট। তাকে যখন কলাম করে তুলা হয় তখন রডের সাথে চলে বাঁশের অানুপাতিক সংমিশ্রন। এভাবে চলতে চলতে যখন ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষের দিকে চলছিল, সেদিন সম্পূর্ণ ছাদ সহ ভবনটি ধসে পরে শতাধিক কন্সট্রাকশন শ্রমিক নিহত হয়,অাহতরা বেশীরভাগই সারাজীবনের জন্য প্রতিবন্ধী হয়ে শয্যায় অথবা হুইল চেয়ারে বন্ধী জীবনযাপন করছে। কিন্তুু দেখার কেউ নেই,প্রতিবাদ করার কেউ নেই। এভাবেই মানবতা প্রতিনিয়ত চাপা পড়ছে লোক চক্ষুর অন্তরালে কিংবা প্রকাশ্যে। কিন্তুু নামধারী মানবতাবাদীরা তাদের মানবাধিকার কার্যক্রম ফাইভ স্টার হোটেল কিংবা প্রেসক্লাবের লম্বা ব্যানারেই সীমাবদ্ধ।

তাই ভূখা সমাজে ঠিকাদারের রাজনৈতিক অনুকূলতা থাকায়, কিছু টাকা রাতের অাধারে ছড়িয়ে ছটিয়ে প্রশাসন সহ সব কিছুকেই স্থবির করে দেয়।

সেক্ষেত্রে অামি অনেকের চেয়ে ভালো বলে নিজে নিজেই অাত্নতৃপ্তির ঢেকুর তুলি। কারন অার কিছু না হোক, অামাকে ব্যবহার করে কেউ এমন পঞ্চ প্রতারনামূলক নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটে নাই এবং ঘটার সম্ভাবনাও নাই। তবে অামি নিভৃতে সকল অকাম-কুকাম ও ভালো কামের রাজসাক্ষী হয়ে অাছি। অামার উপর দিয়ে চলা সকল ভাল ও খারাপ পথিকের নিরব সাক্ষী ও সঙ্গী অামি নিজেই। সুযোগ যদি কোনদিন অাসে,সেদিন সকল অপকর্মকারী হবে অাসামী,দাড়াবে অাসামীর কাঠগড়ায়।সেদিন অামি অট্টহাসি হাসবো এবং দাড়াবো সাক্ষীর কাটগড়ায়। হিসাব চাইব মহান বিচারকের দরবারে, অামাকে সহ রাষ্ট ও সমাজটাকে যারা অন্যায়, অপরাধ ও কুকর্মের স্বর্গরাজ্য তৈরী করেছিল তাদের বিরুদ্ধে।

পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech