ফুটবল খেলোয়াড় তৈরির কারখানায় স্থবিরতা

  

পিএনএস (মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : আলোচনায় এখনো বিশ্বকাপ ফুটবল। সর্বত্রই এটি প্রাধান্য পাচ্ছে। ফুটবল পাগল এ দেশের মানুষের যেকোনো আলোচনায় ঘুরে-ফিরে ফুটবল চলে আসছে। অবলীলায় সামনে চলে আসছে আমাদের দেশের ফুটবলের বেহাল দশা।

একসময় ঢাকার ফুটবল মাঠ কাঁপাত যারা, তাদের অনেকেই বেঁচে আছেন। কিন্তু তাদের প্রিয় খেলাটি মাঠে স্বরূপে না থাকার বেদনা তাদের হতাশ করছে বৈকি। মৃত্যুর আগে প্রিয় খেলাটির ভালো অবস্থা দেখে গেলে তারা একটু স্বস্তি নিয়ে মরতে পারবেন বৈকি।

ঢাকার মাঠের খেলা একমসয় এতটাই জমজমাট ছিল যে, মানুষের দৃষ্টি ঢাকা স্টেডিয়ামের দিকে তাক করা ছিল। একটি টিকিট ছিল সোনার হরিনের মতো। চোরাই পথে অর্থাৎ ব্লাকে টিকিট বিক্রি হতো। গার্ডদের সঙ্গে সম্পর্কে তৈরি করে অনেকে খেলা দেখার চেষ্টা করত। আর খেলা নিয়ে সমর্থকদের মাোমারি ছিল বিরক্তির কারণ।

আবাহনী-মোোমেডানের খেলা থাকলে তো কথাই নেই। মার, মার কাট কাট অবস্থা। স্টেডিয়াম পাড়া আর মতিঝিলের ক্লাব চত্বর ক্রীড়াপ্রেমীদের পদভারে প্রকম্পিত থাকত। ১০৯৫ সালের পর থেকে সে উৎসাহে ভাটা পড়ে। ফুটবলের মাঠে নেমে আসে পিনপতন নীরবতা।

বিশ্বকাপ ফুটবল আসর চলাকালীন ঢাকাসহ সারা দেশের ফুটবলের করুণচিত্র সামনে চলে আসছে মিডিয়ার বদৌলতে। একসময় গ্রামের স্কুলগুলোর মাঠেও পালা করে ফুটবল খেলা হতো। শুকনো মৌসুমে আমন ধান উঠার পর গ্রামের নাড়াক্ষেতে আকর্ষণীয় ফুটবল খেলা হতো নিয়মিত।

প্রাথমিক থেকে উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে নিয়মিত প্রতিযোগিতা হতো। হতো থানা থেকে জেলা পর্যায়ের পর বিভাগীয়। সর্বশেষ জাতীয় পর্যায়ে। সেসব প্রতিযোগিতা আজ আর নেই। উদ্যোগের অভাবে জনপ্রিয় ফুটবল মনে আর মুখে আছে বাস্তবের মাঠে অনুপস্থিত। এটি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে খেলোয়াড় তৈরির কারখানা।

ফুটবলে রইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিশ্বকাপে সাড়া জাগানো শুধু নয়; ফুটবল বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়া রাশিয়া বিশ্বকাপের রানার আপ ক্রোয়েশিয়া এক সময় বাংলাদেশ জাতীয় দলের কাছে হেরেছিল। হেরেছিল জাপানও। আজকের বাস্তবতায় বিশ্বাস করা কঠিন যে আমাদের ছেলেদের কাছে ক্রোয়েশিয়া হরেছিল।

মূলত ১৯৯৫ সালের পর ফুটবলে কুফা লাগে। যে কুফা আজও কাঠেনি। আর ক্রোয়েশিয়ার ফুটবল এগোবে না কেন, সে দেশের প্রেসিডেন্টের রাশিয়ার মাঠে সদর্প উপস্থিতি এবং নিজের পয়সায় বিমানের সাধারণ আসনে যাওয়া থেকে শুরু করে বৃষ্টিস্নাত মাঠে বিজয়-বিজিত সব খেলোয়ারের সঙ্গে একই রকম অভিন্ন আচরণ ফুটবলপ্রেমী বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।

একসময় রেংকিয়ে আমাদের চেয়ে পেছনে থাকা ক্রোয়েশিয়া যদি বিশ্বকাপে রানার আপ হতে পারে, আইসল্যান্ড ও পানামার মতো কম জনগোষ্ঠীর মানুষ যদি বিশ্বকাপে যেতে পারে, আমরা ১৮ কোটি মানুষের দেশ কেন সেটা পারব না। কেন আমরা ১১ জন ফুটবলার তৈরি করতে পারব না। এত দৈণ্য আর কতকাল?


সময় চলে যায়নি। তৃণমূল থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে খেলোয়াড় বাছাই করার কাজটা আগে শুরু করতে হবে। বাছাইয়ের পর এখান থেকে নির্বাচন করে সে নির্বাচিতদের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশ্বমানের করে গড়ে তোলার চেষ্টা আন্তরিকভাবে করলে একদিন নিশ্চয় ফল মিলবে। ক্রিকেটের মতো ফুটবলেও বিশ্বকে মাতাবে বাংলাদেশ, সেখানে পতপত করে উড়বে লাল-সবুজের পতাকা।

এসময় ঢাকার দৈনিকগুলোয় ফলাও করে খবর ছাপা হতো ফুটবল খেলোয়াড়দের দলদলের। কী টান টানি উত্তেজনা। ক্লাবপাড়াগুলো জমজমাট থাকত। কিন্তু সব উৎসাহে ভাটা পড়ে তখনই, যখন ওয়ান ম্যান ওয়ান ক্লাব নিয়মটি বেঁধে দেওয়া হয়। আগে ঢাকা মাঠে বিদেশী লেখোয়াড়রা আসত। একসময় সেটাকে সীমিত করে দেয়া হেয়। এসবের ফলে ফুটবল ক্রমেই ঝিমিয়ে পড়ে।

ঝিমিয়ে পড়া ফুটবলকে চাঙা করতে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে হাইস্কুল, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় পর্যায় থেকে শুরু প্রতিযোগিতার মাধ্যমে খেলোয়াড় বাছাই করার কাজটি যত দ্রুত শুরু করা হবে আর যাবে, ততই মঙ্গল। এর পাশাপাশি স্কুল-কলেজের মাঠ থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকার মাঠগুলো পুনরুদ্ধার ও সংস্কার সময়ের দাবি।

লেখক : বার্তা সম্পাদক- পিএনএস

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech