ফাইনালের গেরো খুলে বিশ্বকাপে যেতে চায় বাংলাদেশ

  


পিএনএস ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রীর ফোনের বিশেষ গুরুত্ব আছে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের কাছে। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ইতিবাচক কথা যে দেশের প্রধান ব্যক্তির কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি শোনেন মাশরাফি বিন মর্তুজারা। সবশেষ এশিয়া কাপের ফাইনালে তীরে এসে তরি ডোবার পর তীব্র হতাশার মাঝেও শেখ হাসিনার অভিনন্দনবার্তা আশ্বস্ত করেছে পুরো দলকে—গতকাল বলছিলেন দলের সিনিয়র এক ক্রিকেটার। তাই গতকাল স্থানীয় সময় বিকেল ৩টায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলার জন্য অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার রুমে ভিড় করেছেন সিনিয়র ক্রিকেটাররা।

পুরো বিষয়টির সঙ্গে মাঠের ক্রিকেটের সম্পর্ক কতটুকু? প্রধানমন্ত্রী তো আর ব্যাটিং-বোলিং করে দেবেন না। আবার ক্রিকেটে বাইরের টোটকা কাজেও দেয়। আজ ম্যালাহাইড ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ফাইনালের আগে সত্যি সত্যিই এ রকম টোটকা দরকার মাশরাফিদের। ফাইনাল, সে এশিয়া কাপ হোক কি ত্রিদেশীয় কোনো সিরিজ—হারই যেন নিয়তি বাংলাদেশের। এক-দুই করে ছয়টা হয়ে গেছে। সাত নম্বর দিয়ে ফাইনালের গেরো খুলতে চান অধিনায়ক। সে কারণেই কি না প্রধানমন্ত্রীর ফোনের অপেক্ষায় অধৈর্য নন কেউ। সাধারণত ম্যাচের আগে খুব বেশি কথাটথা বলতে চান না ক্রিকেটাররা। ভিআইপিদের আরো এড়িয়ে চলেন। কিন্তু দুপুরে টিম মিটিং সেরে ফেলার পরও মাশরাফির রুমে সিনিয়র ক্রিকেটারদের জড়ো হওয়ার একটাই কারণ—শেখ হাসিনার অনুপ্রেরণার ভাষা তাঁদের খুব পছন্দ।

ফাইনালের শিকল ভাঙার জন্য প্রতিপক্ষ হিসেবে ক্যারিবীয়দেরও তো পছন্দই হওয়ার কথা মাশরাফিদের। আয়ারল্যান্ডের মাটিতে দুইবারের সাক্ষাতে অনায়াসে জিতেছে বাংলাদেশ। মাঝের কটি দিনে ক্যারিবীয়দের শরীরী ভাষাতে বিশেষ কোনো পরিবর্তনও আসেনি। তবু সতর্ক বাংলাদেশ অধিনায়ক—‘এটা ক্রিকেট। দুই ম্যাচ হারায় ওরাও প্রবলভাবে ম্যাচে ফিরতে চাইবে। আর নির্দিষ্ট দিনে ভালো খেলাটা জরুরি। এটা ভালো যে আমরা দল হিসেবে ভালো ক্রিকেট খেলছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ওদের দলে একা হাতে ম্যাচ বের করে নেওয়ার ক্রিকেটার আছে।’ ফাইনালকে ঘিরে এতটাই সতর্ক বাংলাদেশ যে নড়বড়ে ড্যারেন ব্রাভোর বিগ হিটিং নিয়েও আলোচনা হচ্ছে দলের ভেতরে। অথচ এই ক্যারিবীয় ফর্মে নেই। জন ক্যাম্পবেল ফিটনেস ইস্যুতে সবুজ সংকেত পেলে আজ তাঁর না খেলার সম্ভাবনাই বেশি। তবু মাশরাফি বলছেন, ‘কিন্তু সেট হয়ে গেলে ও ভয়ংকর ব্যাটসম্যান।’

বাংলাদেশ দলের আশঙ্কাটা অবশ্য অন্য জায়গায়। ঠাণ্ডার দেশে এলে যা হয় আর কি। বল বেশি বেশি সুইং করবে ভেবে ওপরে ওপরে বল ফেলেন পেসাররা। কিন্তু আয়ারল্যান্ডের দুই মাঠেই ৩-৪ ওভারের বেশি সুইং সহায়তা দিচ্ছে না উইকেট। তাই সুইংয়ের আশায় ওপরে করা বল অনায়াসে ড্রাইভ খেলছেন প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানরা। তাই গতকাল টিম মিটিংয়ে পেসারদের পইপই করে বলে দেওয়া হয়েছে যে সে রকম ক্ষেত্রে দ্রুতই যেন লেংথ অ্যাডজাস্ট করে নেন সবাই। সুইং না করাতে পারলে গুডলেংথ থেকে উইকেট সোজা বল করতে। পেস বোলিংয়ের প্রাথমিক পাঠ এটা। অবাক করা ব্যাপার হলো হাতে গোনা কয়েকটা ঘটনা বাদ দিলে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানরাও বেসিকে ফিরে গেছেন। অযথা ঝুঁকি না নিয়ে উইকেটে থিতু হলে রান আসবেই—জানেন, বোঝেন এবং সেটির প্রয়োগও তাঁরা করছেন আয়ারল্যান্ডে। আর সে কারণেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং আয়ারল্যান্ডকে বাংলাদেশের সামনে সাদামাটা দল বলে মনে হচ্ছে।

যেকোনো কাজে নিজের সামর্থ্যটা ধরে ফেলতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। ৩০০ নিয়ে চাপা উদ্বেগ আছে। আর তার কারণ ওই গন্তব্যে পৌঁছানোর পর্যাপ্ত জ্বালানি বাংলাদেশের ব্যাটিং স্টাইলে নেই। সে কারণেই কি না ডাবলিনে আসার পর থেকেই প্রতিপক্ষ ৩০০ করুক—প্রার্থনায় বসে আছে বাংলাদেশ। পরশু রাতেও এক ইনফর্ম ব্যাটসম্যান বলছিলেন, ‘খুব চাচ্ছিলাম আইরিশরা অন্তত ৩০০ করুক। ৯৯ আর ১০০-র মধ্যে যেমন পার্থক্য, ২৯২ আর ৩০০-ও তাই। কিন্তু ওই প্র্যাকটিসটা তো হলো না!’

আবার সব ম্যাচে টস হারায় প্রথমে ব্যাটিং করে ৩০০-র পেছনে ছোটারও সুযোগ মেলেনি। কিন্তু ৩০০ ধরে এগোনো নিয়েও উদ্বেগ আছে দলে। ওভাবে ভেবে খেলতে নেমে না উল্টো বিপদ ডেকে আনা হয়। তাই দলীয় পরিকল্পনায় ব্যাটসম্যানদের অলক্ষ্যে ৩০০-র ছক ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রথম ১০ ওভারে রান কম উঠুক, কিন্তু উইকেট হারানো যাবে না। আধুনিক ক্রিকেটে মিডল ওভার আর রানখরার পর্ব নয়। বরং গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যাচের গতিপ্রকৃতি ওই সময়টাতেই নির্ধারণ করে দিচ্ছেন ব্যাটসম্যান। টি-টোয়েন্টির প্রভাবে ওয়ানডেতেও শেষ ২০ ওভারে ১৭০-১৮০ রান তুলে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। তবে শর্ত হলো, হাতে উইকেট থাকতে হবে। সেট হয়ে যাওয়া ব্যাটসম্যানকে শেষ ২০ ওভারের ফায়দা নিতে হবে টি-টোয়েন্টির মেজাজে। হাতে-কলমে ছক কেটে অঙ্কটা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের। এখন সেটি মাঠে প্রয়োগ করার দায়ভার অবশ্যই তামিম ইকবালদের।

আশাবাদের ক্ষেত্রও তৈরি করেছেন ব্যাটসম্যানরা। এই সিরিজে টপ অর্ডারই চাপমুক্ত করে দিচ্ছে পরের ব্যাটসম্যানদের জীবন। তামিম ইকবালের উদ্বোধনী সঙ্গী ‘পদে’ টানা দুই ফিফটিতে টিম ম্যানেজমেন্টের মনোনয়ন পেয়েই গেছেন সৌম্য সরকার। আয়ারল্যান্ড ম্যাচে ফিফটি করে নিজেকে তৈরি রেখেছেন লিটন কুমার দাশ। মিডল অর্ডারের মূল ভরসা মুশফিকুর রহিম কিংবা হাল আমলে ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ হয়ে ওঠা মোহাম্মদ মিঠুনও রানে আছেন। আর মাহমুদ উল্লাহর ব্যাটিংয়ে তো স্বর্ণসময়ের ইঙ্গিত। সুযোগ খুব বেশি মেলেনি, তবে যেটুকু মিলেছে তাতে সাব্বির রহমানকে নিয়ে উদ্বেগের কারণ নেই। অবশ্য ফাইনাল-পূর্ব যাবতীয় উদ্বেগ তো একজনকে ঘিরেই—সাকিব আল হাসান। তিনি একা বাইরে বসে থাকলে তাঁর জায়গায় দুজনের কথা ভাবতে হয় যে টিম ম্যানেজমেন্টকে! তার ওপর ক্যারিবীয় দলে ডানহাতি ব্যাটসম্যানের ছড়াছড়ি। অথচ ডাবলিনে ঘুরে বেড়ানো ১৯ জনের বাংলাদেশ স্কোয়াডে বাঁহাতি স্পিনার সাকিব একাই! থিংকট্যাংকের সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই—এটা বোঝার জন্য যে বোলার সাকিবের জন্যই বেশি উদ্বেগ সবার। তাঁর পরিবর্তে যাঁকে ভাবা হচ্ছে, সেই মোসাদ্দেক হোসেন অফস্পিনার। মেহেদী হাসান মিরাজের পাশে তাঁর কাছ থেকে কতটা কী বৈচিত্র্য পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অন্তত সাকিবের দক্ষতা এবং ডানহাতি ব্যাটসম্যানদের নাভিশ্বাস তুলে ফেলা বাইরে বেরোনো বোলিং তো আর পাবে না বাংলাদেশ। অবশ্য টিমের একজন বলছিলেন, ‘আপনি শুধু বোলিংয়ের কথা ভাবছেন! ওর ব্যাটিং এবং ফিল্ডিংয়ের বিকল্প কে?’

মাশরাফিকেও মনে হলো না যে ফাইনালে সাকিবের অনুপস্থিতির আশঙ্কা ভুলে থাকতে পারছেন। তবে সাকিবকে ছাড়া ম্যাচ জেতার অতীত আছে বাংলাদেশের। অবশ্য বাংলাদেশ অধিনায়কের কথাবার্তায় মনে হলো ব্যথাটা কমলেই ফাইনালটা খেলে ফেলবেন সাকিব আল হাসান। আর মাত্র একটি উইকেট নিলেই সবচেয়ে কম ম্যাচে পাঁচ হাজার রান ও ২৫০ উইকেটের বিশ্বরেকর্ড গড়বেন তিনি। আর ফাইনালের বিষে নীল হওয়ার বেদনা তো সাকিবের মনেও আছে।

এই একটি পরিবর্তনের সম্ভাবনা ছাড়া ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে আগের দুই ম্যাচের একাদশ নিয়েই নামছে বাংলাদেশ। সাকিব যদি নিতান্তই না পারেন, তাহলে বিকল্প একজনই—মোসাদ্দেক হোসেন।

লক্ষ্যও অভিন্ন—ফাইনালকে আরেকটি ম্যাচ ভেবে ক্যারিবীয়দের আরেকবার হারানো। জোরাজুরি করে ফাইনালকেন্দ্রিক চাপ দূরে রাখতে চাইছে বাংলাদেশ দল। কিন্তু শত সভাতেও কি আর ফাইনালের হার ভোলা যায়। দেখা যাক, প্রধানমন্ত্রীর উজ্জীবনী ইতিহাসের দায়মুক্তি দেয় কি না বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে!

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech