বরিশালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট

  

পিএনএস, বরিশাল: বাবুগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ রাকুদিয়ার গ্রামটি সেজেছে উৎসবের সাজে। গোয়ালঘর থেকে পুকুর, হাস-মুরগির খামার সবই সাজানো হয়েছে। সাজ সাজ রব গ্রামের ১৯৮টি পরিবারে। এ গ্রামের ১৯৮ নারীর ভাগ্যবদলের চিত্র স্বচক্ষে দেখতে মঙ্গলবার (১৮ অক্টোবর) বাবুগঞ্জ আসছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম।

এ গ্রামের হতদরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক।

সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এসডিএফ) নামের একটি এনজিওর আমন্ত্রণে তাদের 'নতুন জীবন' শীর্ষক প্রকল্পের কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন তিনি। সেখানে নারীরা দেখাবেন কিভাবে নিজেদের দারিদ্র্যকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে পাঠিয়েছেন জাদুঘরে। তাকে শোনাবেন নিজেদের জীবনযুদ্ধ জয়ের গল্প।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে বরিশাল বিমানবন্দরে পৌঁছান বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট। সেখান থেকে গাড়িতে করে যাচ্ছেন ওই গ্রামে। এসময় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বহুমুখী দুর্যোগ আশ্রয়ণ কেন্দ্র পরিদর্শন করার কথা রয়েছে। এছাড়া উজিরপুরের ভরসাকাঠি গ্রামে দুর্যোগ আশ্রয়নকেন্দ্র, স্কুল এবং গ্রামের রাস্তাঘাট ও কালভার্ট পরিদর্শন করার কথা রয়েছে তার। দুপুর ১টার দিকে তার ঢাকায় ফেরার কথা।

দেহেগতি ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান জানান, দক্ষিণ রাকুদিয়া গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।

বিশ্বব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তার মাধ্যমে নিজেদের পরিশ্রমের দ্বারা অতি অল্প সময়ে দারিদ্র্য দূর করেছে ওই গ্রামের ১৯৮ পরিবার। এটি বিশ্বে একটি মডেল হতে পারে। সেই খবর শুনেই তাদের সফলতার কাহিনী শুনতে আসছেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট। বিশ্বব্যাংকের প্রধানের আগমন উপলক্ষে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে প্রশাসন। রাকুদিয়া গ্রামকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরেই সেখানে নজরদারি করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন।

দক্ষিণ রাকুদিয়া গ্রামে সোমবার থেকেই মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়েছে। গণমাধ্যম কর্মীদের ক্ষেত্রেও চালু করা হয়েছে বিশেষ পাশ। বাবুগঞ্জের ইউএনও আফরোজা বেগম পারুল বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক প্রধানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধ পরিকর।’

দক্ষিণ রাকুদিয়া গ্রামের গৃহবধূ শিউলি বেগম বলেন, ‘স্বামী, ২ ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে ৫ জনের সংসার। অভাব অনটনের কারণে বড় ছেলে ঢাকায় একটি গার্মেন্টসে কাজ করে। ছোট ছেলে নবম শ্রেণি ও মেয়ে ৪র্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী।

২০১২ সালে এসডিএফ’র 'নতুন জীবন' প্রকল্প থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নেই। এর সঙ্গে বিয়ের সময় পাওয়া কিছু গহনা বিক্রি করে ২৭ হাজার টাকায় একটি গাভী কিনি। সেই গাভীর দুধ বিক্রি করেই ঋণের টাকা শোধ করি। পরের বছর ঋণ নেই ২০ হাজার টাকা। আরও একটি গাভী কেনেন। গোবর দিয়ে তৈরি করেন কম্পোস্ট সার। বছরজুড়ে শুধু কম্পোস্ট সার বিক্রি করেই এখন আয় হয় প্রায় ১২ হাজার টাকা। সেই সঙ্গে বাজারে প্রতিদিন বিক্রি করি ৪ লিটার দুধ।’ এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি শিউলিকে। বর্তমানে ৫টি গাভী আছে শিউলির। আরও দুটি গাভী রয়েছে বর্গা দেওয়া।

এছাড়া আরও ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে পুকুরে মাছ চাষ শুরুও করেছেন তিনি। বর্তমানে পুকুরে লক্ষাধিক টাকার মাছ রয়েছে বলে জানান শিউলি।

গাভী পালন ও মাছ চাষের পাশাপাশি বাড়ির আঙ্গিনায় বিভিন্ন ধরনের সব্জির চাষ করে এখন পুরোই স্বাবলম্বী তিনি। যা দিয়ে ঋণ পরিশোধের পাশাপশি সংসার ও ছেলে-মেয়ের লেখা পড়ার খরচ ভালোভাবেই চলে যাচ্ছে। মাত্র ক’বছর আগেও দুবেলা দুমুঠো খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হত তাদের। অথচ শিউলি বেগমের সেই দুর্দিন এখন ইতিহাস। সংসারে ফিরে এসেছে সুখ এবং স্বচ্ছলতা। এই সাফল্যের গল্প শুধু শিউলি বেগমের একার নয়। দক্ষিণ রাকুদিয়া গ্রামের ১৯৮টি পরিবারেই রয়েছে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের এমন কাহিনী।

এসডিএফ প্রকল্পের দেহেরগতি ইউনিয়নের ফেসিলেটর নকিবুল ইসলাম জানান, বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় গ্রামের মানুষের স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য ২০১২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তায় এসডিএফ তাদের কার্যক্রম শুরু করে দেহেরগতি ও চাঁদপাশা ইউনিয়নে।

প্রথমে তারা বাবুগঞ্জের দেহেরগতি ইউনিয়নে ১৫টি সমিতির মাধ্যমে সদস্য সংগ্রহ শুরু করে। পরে তারা সেখানে ২০১৪ সালে নিজেদের অর্থায়নে সমিতি পরিচালনা করার জন্য জমি কিনে ১২টি ঘর নির্মাণ করে। এছাড়া আরও তিনটি ঘর রয়েছে ভাড়ায় নেওয়া। বর্তমানে ১৫টি সমিতির আওতায় তাদের সদস্য রয়েছে এক হাজার ৮৪৪ জন। এদের জন্য বিশ্বব্যাংকের ঋণ দেওয়া রয়েছে ৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

একই চিত্র বাবুগঞ্জের চাঁদপাশা ইউনিয়নে। চাঁদপাশা ইউনিয়নের সমিতির আওতায় সদস্য রয়েছে এক হাজার ৮১৩ জন। তাদের ঋণ দেওয়া রয়েছে ৩ কোটি ৬৭ লাখ ১৪ টাকা।

এই সদস্যদের কাছ থেকে প্রথমে ৫ টাকা করে চাঁদা নিলেও পরে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তা ১০ টাকা করা হয়। সমিতির যৌথ অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে আলাদা কমিটি রয়েছে।

পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech