বিচ্ছিন্নতাই বড় দুর্ভোগ

  


পিএনএস, রাঙামাটি: পরিমাণে কম হলেও নৌপথে আসছে নিত্যপণ্য। প্রাণ ফিরতে শুরু করেছে বিধ্বস্ত রাঙামাটিতে। কিন্তু সেই প্রাণ বন্দি শহরের ভেতরেই। কারণ সড়কপথে এখনো বিচ্ছিন্ন পার্বত্য এ শহর।

পাহাড়ধসে কোথাও রাস্তার ওপর মাটির স্তূপ জমায়, আবার কোথাও রাস্তাই ধসে পড়ায় পাঁচ দিন পরও রাঙামাটির সঙ্গে যান চলাচল শুরু হয়নি। এমনকি হালকা যান চলাচলেরও উপযোগী হয়নি এ পথ। আর তাই জ্বালানিসংকট রয়েই গেছে।

এদিকে প্রশাসন গত শুক্রবার উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করলেও গতকাল শনিবার রাঙামাটিতে আরো দুজনের লাশ পাওয়া গেছে। তারা হলো জুরাছড়ি উপজেলার দুমদুম্যা এলাকার চিয়ং চাকমা (১৭) ও চিবেচোগা চাকমা। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইকতেয়ার আরাফাত এ তথ্য জানিয়েছেন।

এ ছাড়া রাঙামাটিতে এর আগে নিহত একজনের লাশ পরিবারের সদস্যরা দাফন করে ফেলেছিল বলে গতকাল তথ্য পায় জেলা প্রশাসন। এ নিয়ে পাহাড়ধসে কেবল রাঙামাটিতেই মৃতের সংখ্যা হলো ১১৩। সে হিসাবে পাহাড়ধসে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার—এই পাঁচ জেলায় ১৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

টানা বৃষ্টির পর পাহাড়ধসে রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের সংযুক্ত সাতটি সড়কের ১৪৫টি স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭টি স্থানে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি মূল সড়কটি। এই সড়কের কোনো কোনো অংশ পুরোটাই ধসে পড়েছে।

সড়ক সংস্কার ও সড়কের ওপর পরে থাকা মাটি অপসারণে কাজ করছে সওজ অধিদপ্তর এবং সেনাবাহিনী। তবে রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকায় গতকাল স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে অনেককে মাটি অপসারণ এবং দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে দেখা গেছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও রয়েছে।

এই সড়ক পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে কোথাও সংস্কার, আবার কোথাও নতুন করে তৈরি করতে হবে বলে জানিয়েছে সওজ অধিদপ্তর ও সেনাবাহিনী। তবে দুই-তিন দিনের মধ্যে হালকা যান চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী আবু মুছা বলেন, আবহাওয়া যদি বিরূপ আচরণ না করে, তবে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই সড়কটিকে চলাচলের উপযোগী করা যাবে।

সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগের প্রধান মেজর জেনারেল সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, ‘আশা করছি আগামী তিন দিনের মধ্যেই এই সড়কে হালকা যানবাহন চলাচল করতে পারবে। আর আগামী এক মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ সড়ক স্বাভাবিক করা যাবে। ’

গতকাল রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সড়কের ঘাগড়া এলাকার দেপ্প্যছড়ি এলাকায় প্রায় ১০০ মিটার রাস্তা ধসে পড়ে প্রায় দেড় শ ফুট নিচের ঢালুতে চলে গেছে। রাস্তার কোনো চিহ্নই নেই সেখানে। তবে গতকাল বৃষ্টি না হওয়ায় ওপরের পাহাড়ের সরু পথ এবং নিচে ভেঙে পড়া মাটির ওপর দিয়েই হেঁটে চলাচল করতে হতে দেখা গেছে অনেককে। রাস্তা সংস্কারের কাজ করছিলেন সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগ এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মীরা।

সওজ রাঙামাটি অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ এমদাদ হোসেন বলেছেন, চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটির পথে ৬১ কিলোমিটার স্থান সদর উপজেলার সাপছড়ি শালবাগান এলাকায় পাহাড় ভেঙে পড়ে সড়কে গভীর খাত সৃষ্টি হয়েছে। তাই সেখানে পাশের পাহাড় কেটে নতুন সড়ক তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে সড়কটি পুরোপুরি যান চলাচলের জন্য উপযোগী করতে অনেক সময় লাগবে।

প্রকৌশলী এমদাদ বলেন, সড়কে কাদামাটি পরিষ্কার এবং সড়ক মেরামতে সওজের কর্মীদের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরা সহযোগিতা করছেন।

সওজের হিসাব মতে, রাঙমাটি সদরের সঙ্গে মানিকছড়ি-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, ঘাগড়া-চন্দ্রঘোনা-বাঙালহালিয়া-বান্দরবান, বাঙালহালিয়া-রাজস্থলী, রানীরহাট-কাউখালী, বাঘাইছড়ি-নানিয়ারচর-লংগদু সড়ক আছে। এর বাইরে শহর অঞ্চলের পাঁচটি সড়কও সওজ এর অধীনে। সব সড়ক কমবেশি ধসে গেছে।

এ ছাড়া খাগড়াছড়ির পথে ষষ্ঠ কিলোমিটার স্থানে রাস্তার একটি অংশ ৭০ ফুটের মতো দেবে গেছে উল্লেখ করে প্রকৌশলী এমদাদ বলেন, ওই স্থানটি পুরোপুরি মেরামত করা অনেক কঠিন হবে। সে কারণে সেখানে একটি বেইলি ব্রিজ তৈরি করে যোগাযোগব্যবস্থা স্বভাবিক করার কথা ভাবা হচ্ছে।

সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয়ের কারণে চট্টগ্রাম ও বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতকারী লোকজন বিপাকে পড়েছে। চট্টগ্রামমুখী লোকজন মালামালসহ দীর্ঘ পথ হেঁটে এবং অটোরিকশায় করে ২৫ কিলোমিটার দূরের ঘাগড়ায় গিয়ে বাসে চড়তে পারছে।

গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘাগড়া থেকে কলাবাগান পর্যন্ত সড়কে জমে থাকা মাটির স্তূপ সরিয়ে নিচ্ছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশনের ১৯ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর মো. শাহরিয়ার ইফতেখার বলেন, ঘাগড়া থেকে রাঙামাটির পথে সাপছড়ি পর্যন্ত সড়কে জমে থাকা মাটি সরিয়ে চলাচলের উপযোগী করার কাজ চলছে।

অন্ততপক্ষে ছোট যানবাহন যাতে চলাচল করতে পারে সে জন্য সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান মেজর শাহরিয়ার ইফতেখার। দুই-এক দিনের মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে সাপছড়ি পর্যন্ত সড়ক হালকা যান চলাচলের উপযোগী করে তোলা যাবে বলে মনে করেন তিনি।

তবে বর্তমানে রাঙামাটি থেকে অটোরিকশাযোগে ফুরোমন পাহাড় গিয়ে সেখান থেকে প্রায় ১০ মিনিট হেঁটে দেপ্প্যছড়ির শালবাগানের ধসেপড়া অংশটি পার হয়ে আবার সেখান থেকে অটোরিকশাযোগে গন্তব্যে যাওয়া যাচ্ছে। আবার ঘাগড়া থেকেও ছাড়ছে রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে যাতায়াতকারী যাত্রীবাহী বাস।

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে রাঙামাটি : রাঙামাটি-কাপ্তাই নৌ রুটটি চালু হওয়ার পর এবং রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে হেঁটে চলাচল শুরুর পর রাঙামাটিতে প্রতিবেশী রাণীরহাট থেকে সবজি আসতে শুরু করেছে। তবে বাড়তি দাম নিচ্ছিল ব্যবসায়ীরা। সে ক্ষেত্রে দাম নিয়ন্ত্রণে গতকাল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত শহরের বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালিয়েছেন। এর পর থেকে সহনীয় দামে পণ্য বিক্রি হতে দেখা গেছে।

এ ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন জেলা প্রশাসক।

বনরূপা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবু সৈয়দ বলেছেন, ‘আমরা প্রশাসনের নির্দেশনা বাজারের সকল ব্যবসায়ীকে জানিয়ে দিয়েছি। কেউ যেন এই দুর্যোগের সুযোগ না নেয় এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কারণ না হয় সেটা স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ’

তবে জ্বালানি তেলের সংকটে বিপাকে পড়েছে শহরবাসী। শহরের প্রায় কোনো খোলা দোকানেই তেলের মজুদ নেই। কিছু পেট্রল পাম্পে তেল থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা পেট্রোলিয়ামের সঙ্গে কথা বলে রাঙামাটিতে তেল পরিবহনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে প্রশাসন।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান বলেন, ‘জ্বালানি তেলের সংকট দুই-এক দিনের মধ্যে কেটে যাবে। আমরা কথা বলেছি। তারা (জ্বালানি তেল কম্পানি) বিকল্প উপায়ে তেল পাঠানো শুরু করছে রাঙামাটিতে। ’

সেনাবাহিনীর জিওসি মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম তালুকদারও বলেছেন, ‘তেল কম্পানিগুলো বাড়তি টাকা না নিয়েই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রাঙামাটিতে তেল পাঠানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। ’

স্বেচ্ছাশ্রমে সড়ক সংস্কার : জেলা বিএনপির সভাপতি হাজী মো. শাহ আলম ও সাধারণ সম্পাদক দীপন তালুকদার দীপুর নেতৃত্বে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, শ্রমিকদলসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা গতকাল সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে সংস্কারকাজ করে। তারা পাহাড় থেকে নেমে আসা মাটি, গাছ ও আবর্জনা সরিয়ে সড়কে ছোট যান চলাচল উপযোগী করার চেষ্টা করে।

এ ছাড়া স্থানীয় যুবকরা এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে রাঙামাটি পর্যটন করপোরেশন সড়কের ওপরে পড়ে থাকা মাটি অপসারণ করে সড়কটি চলাচল উপযোগী করেছে।

রাঙামাটি শহরের বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন একত্র হয়ে দুর্গতদের সহায়তা করার জন্য একটি কমিটি করেছে। সাজিদ বিন জাহিদ মিকিকে আহ্বায়ক এবং নূর তালুকদার মুন্নাকে সদস্যসচিব করে কমিটি করা হয়েছে। শহরের সামাজিক সংগঠন জীবন, ইয়ুথ, প্রিয় রাঙামাটি, এনসিটিএফ, এফএফএসসহ বিভিন্ন সংগঠন এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠকরা।

রাঙামাটি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগেও ত্রাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও রাঙামাটির দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে এসেছে।

ঢাকা থেকে আসছে বিএনপির প্রতিনিধিদল : পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে এবং তাদের ত্রাণ সহায়তা দিতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে একটি দল আজ রবিবার রাঙামাটি আসছে।

লঞ্চই ভরসা : রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পার্বত্য এই শহরে যাওয়া-আসার প্রধান অবলম্বন এখন লঞ্চ। রাঙামাটি থেকে কাপ্তাইয়ে এবং কাপ্তাই থেকে রাঙামাটিতে লঞ্চে আসা-যাওয়া করছে বেশির ভাগ মানুষ। কাপ্তাই থেকে বাস বা অটোরিকশায় করে চট্টগ্রামে যাওয়া যাচ্ছে। আবার কাপ্তাই হয়ে রাঙামাটি আসা যাচ্ছে। এ কারণে বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে উপশহর কাপ্তাই।

রাঙামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মাঈনুদ্দিন সেলিম জানিয়েছেন, যাত্রীর সংখ্যা বাড়ায় লঞ্চের সংখ্যা দুটি থেকে বাড়িয়ে তিনটি করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে আরো বাড়ানো হবে বলে তিনি জানান।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech