ডিমলা সীমান্তে ভারতীয় গরু আসছে দেদারছে : শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ

  

পিএনএস, ডিমলা নীলফামারী প্রতিনিধি : নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলায় গত ১৭ জুন সকালে বোর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নীলফামারীর ডিমলা সীমান্তে থানারহাট কোম্পানীর (কলোনী বাজার) বিজিবি’র সদস্যরা সীমান্তে টহলরত অবস্থায় ভারতীয় ১০৩টি গরু আটক করেন। শনিবার সীমান্তে কলোনী বাজারে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়নের তিস্তা নদীর ভারতীয় সীমান্ত ঘেষা ঝাড়শিংহেরশ্বর চর দিয়ে প্রায় দেড় শতাধিক গরু দেশের অভ্যান্তরে প্রবেশ করলে বিজিবি জোয়ানারা সীমান্তে টহলরত অবস্থায় ১০৩টি গরু আটক করে ক্যাম্প সংলগ্ন বাবুলের বাড়ীতে নিয়ে এসে রাখা হয়।

এসব ভারতীয় গরু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রনকারী ময়নদ্দিন, শফিকুল ইসলাম, আছর উদ্দিন, ফরহাদ হোসেন, এন্দা মামুদ, বদিউজ্জামান ও আব্দুল খলিল প্রথমে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রন করে তাদের কাছ থেকে গরু খুব অল্প টাকায় ক্রয় করে তা অবৈধ খোয়াড়ে রেখে কিছু গরুর বুড়িমারী স্থল বন্দরে কাস্টমস এ গরু প্রতি ৫’শ ৫০ টাক শুল্ক দিয়ে গরুগুলিকে বৈধ করে দেশের বিভিন্ন গরু ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রয় করেন।

তারা আরো বলেন, মাত্র ৪৮ ঘন্টার মধ্যে করিডোর করা এসব গরু বিক্রয় করতে হবে। তা না হলে স্থানীয় ইউপি’র কাছে রশিদ সংগ্রহ করে গরুগুলিকে বৈধ করতে হবে। কিন্তু গরু ব্যাবসায়ী শুকুর আলীর পুত্র বরক আলী (৫৫), হামিদুল ইসলামের পুত্র জুয়েল ইসলাম (৪৫),নফর উদ্দিনের পুত্র হাকিনুর ইসলাম (৪৩) ও নুর ইসলাম জানালেন ভিন্ন কথা ।

এসব ব্যবসায়ীরা জানান, ভারত থেকে অবৈধ পথে এসব গরু আসায় গরু প্রতি প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা ব্যয় হয়ে যায় বিভিন্ন খাতে। সল্প পরিমাণ টাকা শুল্ক জমা করলেও সব দিক ম্যানেজ করতে গরু প্রতি আরো প্রায় ৩ হাজার টাকা দিতে হয়। কোথায় কোথায় দিতে হয় বলতেই তারা বলেন, এখানে ইউপি চেয়ারম্যানের জন্য গরু প্রতি রাখতে হয় ৪’শ, বিজিবি’র জন্য ২’শ, যারা গরুগুলি সীমান্ত থেকে খোয়াড় পর্যন্ত আনে তাদেরকে ১’শ, যার জায়গা ব্যবহার করে হাট বসানো হয়েছে তাকে ১’শ ৫০, খোয়াড় পরিস্কার পরিছন্নকারীকে ৫০, যে ব্যক্তি করিডোর করার জন্য যায় তাকে ১’শ। বাকী আরো দুই হাজার টাকা কোথায় দেওয়া হয় তা আমরা জানি না।

সরজমিনে শনিবার ১৭ জুন’১৭ ১০৩টি গরু বাবুলের খোয়াড় নামক স্থানে দেখা গেলেও বুড়িমাড়ী করিডোরে শুল্ক জমাদান কারী বুলবুল সংবাদকর্মীদের সামনে কয়টি গরুর শুল্ক জমা দেওয়া হয়েছে তা দেখাননি। এমনকি সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতে তারা করিডোর করা নম্বর কোন গরুর গায়ে দেননি। তবে তাদের মধ্যে একজনকে বলতে শুনা গেছে আজ (শনিবার) ৬০টি গরুর করিডোর করা হয়েছে। বাকীগুলোকে পূর্বের কোন নম্বর বসানো হবে। স্থানীয় একজন সমাজ সেবক নাম প্রকাশে অনৈচ্ছুক শর্তে বলেন, এভাবেই শুভংকরের ফাঁকির মতো প্রতিনিয়ত লাখ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে এই সীমান্তে।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে ঈদকে সামনে রেখে সীমান্তে গরু চোরাচালানে সক্রীয় হয়েছে গরু ব্যবসায়ীরা। আর এরই ফাঁকে তারা সবদিক ম্যানেজ করায় সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। একই ভাবে দেখা যায়, উপজেলার খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের কিসামতের চর সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে ভারতীয় গরু আসলেও এ সীমান্তে কোন খোয়াড় না থাকায় সরকারের শুল্প ফাঁকি দিয়ে ভারতীয় শতশত গরু দেশের অভ্যান্তরে ঢুকে যাচ্ছে। কিন্তু এ সীমান্তে খোয়াড় থাকলে সরকারের আয় হত প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা।

এ ব্যাপারে সীমান্তবর্তী এলাকা খগাখড়িবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ রবিউল ইসলাম লিথনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কিসামত চর সীমান্ত দিয়ে গরু দেশের অভ্যন্তরে ঢুকছে। কিন্তু দোহলপাড়ায় এক সময় একটি খোয়াড় ছিলো এখন তা অনুমোদন পাচ্ছে না। ফলে সরকার রাজম্ব হারাচ্ছে বলেও তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, শনিবার প্রায় শতাধিক গরু এ সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে চলে গেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বলেও আমি শুনেছি। কিন্তু করার কিছুই নেই। এ বিষয়ে পূর্ব ছাতনাই ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল লতিফ খাঁনের সাথে মুঠোফোন কথা হলে তিনি গরু প্রতি টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, এখানে গরু নিয়ে কোন অনিয়ম হয় না। সীমান্ত দিয়ে গরুগুলি আসায় তা খোয়াড়ে রেখে বুড়িমারী করিডোরে শুল্ক জমা দিয়ে গরুগুলি বৈধতা পাচ্ছে।

সীমান্তে গরু আসছে বিষয় নিয়ে সরাসরি কথা হয় থানারহাট কোম্পানী কোমান্ডার আনোয়ার হোসেনের সাথে তিনিও গরু নিয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও কোম্পানী কোমান্ডারকে টাকা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আমরা এ ভারতীয় গরু দেশের অভ্যান্তরে ঢুকলেই তা আটক করে শুল্ক জমা দিয়ে রশিদ দেখে গরু গুলিকে ছেড়ে দেই। তবে সীমান্তে যেন এসব চোরাচালান না হয় সেদিকে লক্ষ্য দিয়ে সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে। তবে এত টাকা গরু গুলির পিছনে বিভিন্ন জায়গায় ব্যাবসায়ীদের দিতে হয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ব্যবসা করতে হলে তো তাদেরকে এসব করতে হবে।

উল্লেখ্য, ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালিগঞ্জে ২টি, পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়শিংহেরশর, পূর্বছাতনাই গ্রামে রয়েছে ৩ টি ও খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের দোহলপাড়া গ্রামে রয়েছে ১টিসহ মোট ৬টি খোয়াড় রয়েছে। যদি কোন গরু ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে কিংরা অবৈধভাবে গরু নিয়ে আসা হয় তাহলে সেই গরুগুলি এইসব খোয়াড়ে রেখে তা সরকারের নীতিমালা অনুসরণ করে বুড়িমারী স্থলবন্দরে কাষ্টমস অফিসে গরুর শুল্ক জমা দিয়ে তা কাগজপত্রাদি সংগ্রহ করে দেশের অভ্যান্তরে বিক্রয় করা হয়। বর্তমানে অলিখিত ও মৌখিক নির্দেশে এসব অবৈধ খোয়াড়ে রেখে তা বৈধতা পাচ্ছে গরুগুলি।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech