টানা বর্ষন আর উজানের ঢলে তিস্তার পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপরে

  

পিএনএস, নীলফামারী প্রতিনিধি : অবিরাম বৃষ্টিপাত আর পাহাড়ী ঢলে তিস্তা নদীর পানি নীলফামারীর ডালিয়া তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ণ বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে তিস্তায় পানি অল্প অল্প করে বাড়তে থাকে।শনিবার বিকাল ৩ টায় ২০ সেন্টিমিটার (বিপদসীমা ৫২ দশমিক ৪০) উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তায় পানি বৃদ্ধির কারনে জেলার ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার তিস্তাপারের নিম্নাঞ্চল ও চরের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে।

অপরদিকে পানির চাপে তিস্তা সেচ প্রকল্পের দিনাজপুর সেচ নালার নীলফামারীর জলঢাকায় দুটি স্থানে ১’শ ফুট ভেঙ্গে গেছে। এতে জলঢাকার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন পানির নীচে তলিয়ে গেছে।পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেচ নালা ভেঙ্গে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। শনিবার সকালে ওই সেচ নালার জলঢাকার কাঁঠালী ও দেশীবাড়ী নামক স্থানে পানির চাপে ভেঙ্গে যায়। অপরদিকে অবিরাম বৃষ্টিপাত আর পাহাড়ী ঢলে তিস্তা নদীর পানি নীলফামারীর ডালিয়া তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা সকালে বিপদসীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান এ খবর নিশ্চিত করেছেন। অপর দিকে এক নাগাড়ে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে নীলফামারী জেলাসহ পাশ্ববর্তী এলাকা সমুহ। জেলার উপর দিয়ে বহমান ছোট বড় ৩০ টি নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করেছে। শুধু নদী লাগোয়া গ্রাম নয়। অবিরাম বর্ষনের কারনে মাঠঘাট, বাড়িঘর, সড়ক, ফসলী জমি সব কিছু তলিয়ে গেছে। সেই যে গত বুধবার (৯ আগষ্ট) হতে বৃষ্টি শুরু হয়েছে তা থামবার নাম নেই। জেলার প্রতিটি নদী এখন বিপদসীমায়। অবিরাম বর্ষনে জনজীবন থমকে গেছে। রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচল কমে গেছে। মানুষজন জরুরী প্রয়োজন ছাড়া বাড়ি হতে বের হচ্ছেনা।

ভারী বর্ষন ও নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করায় এ জেলার ২০ লাখ মানুষজন চরম দুর্ভোগে পড়েছে। কৃষকদের মতে জেলার ৫০ হাজার হেক্টর আমন ধানের জমি তলিয়ে গেছে। গত ২৪ ঘন্টার বৃষ্টি নীলফামারী জেলার গত কয়েক বছরের রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে। নীলফামারী সদরে ১৯৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। জেলা শহরের প্রতিটি পাড়া মহল্লা পথঘাট ও বাসা বাড়ি বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে।

এ ছাড়া এ জেলার ডোমার উপজেলায় ২২৩, ডিমলা উপজেলায় ১৫০, জলঢাকা উপজেলায় ২০৭, সৈয়দপুর উপজেলায় ২৫০ ও কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ২৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে জেলা কৃষি বিভাগ। অপর দিকে গত ২৪ ঘন্টায় তিস্তা অববাহিকার ডালিয়া পয়েন্টে ১৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সুত্র জানায়। কয়েক দিনের ভারি বর্ষণে তিস্তা নদী ছাড়াও পানি বিপদসীমা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বুড়ি তিস্তা, চারালকাটা, বুড়িখোড়া, যমুনেশ্বরী, খড়খড়িয়া, দেওনাই, খেড়ুয়া, শালকি, নাউতারা, কুমলাই, ধুম, ধাইজান, চিকলি, আউলিয়া খানা, ইছামতি। জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক গোলাম মোহম্মদ ইদ্রিস জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারনে কৃষি বিভাগের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। শনিবার সাপ্তাহিক সরকারী ছুটি থাকলেও সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঠে নামানো হয়েছে। আবাদী জমিতে যে সব স্থানে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি রয়েছে তা অপসারন করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। প্রয়োজনে জমির আইল কেটে পানি নিস্কাশনের নির্দেশ দেয়া হয়।
জেলা প্রশাসক মোহম্মদ খালেদ রহীম জানান, প্রশাসনের সকল স্থরের সরকারী কর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। কোথায় কি ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে তা নিয়ে রিপোর্ট তৈরীর কাজ করা হচ্ছে। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার তিস্তা ব্যরাজ ডালিয়া পানি উনয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সর্তকীকরণ কেন্দ্র সুত্র জানায়, শুক্রবার (১১ আগষ্ট) তিস্তা অববাহিকায় ডালিয়া পয়েন্টে ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল ১৩২ মিলিমিটার। একই সুত্র মতে, গত বুধবার ১৫৮ ও বৃহস্পতিবার ১৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল তিস্তা অববাহিকায়। ফলে গত ৯৬ ঘন্টায় ৬৪০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। শনিবার সকাল সারে ১০ টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত ছিল। এ ছাড়া তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তা ব্যারজের ৪৪টি স্লুইচ গেট সার্বক্ষনিক খুলে রাখা হয়েছে।

জেলা সদরের খোকসাবাড়ি ইউনিয়নের ইছামতি শাখা নদীর পানি উপচে ওই ইউনিয়নের কুমারপাড়া গ্রামটিকে তলিয়ে দিয়েছে। গ্রামের শতাধিক বাড়িঘর ও রাস্তাঘাট ও আবাদী জমির উপর দিয়ে স্রোত বয়ে যাচ্ছে।বন্যা কবলিত পরিবারগুলোকে স্থানীয় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় দেয়া হয়েছে বলে জানান ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান। এ ছাড়া ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের পূর্বখড়িবাড়ি মৌজার তিনটি গ্রামের এক হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। ১৫ টি পরিবারের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলিন হয়েছে।

৫০ পরিবার বসতঘর সরিয়ে নিয়েছে বলে জানায় ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন। ডিমলা উপজেলার পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড় সিংহের চর গ্রামে ৭৪৫টি পরিবারের ঘরবাড়িও তলিয়ে গেছে বলে জানান ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খান। খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের কিছামত গ্রামে ২৩০টি পরিবারের বসদঘরের ভেতর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানান ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম লিথন। জলঢাকা উপজেলার খুটামারী ইউনিয়নের বুড়িখোড়া নদীর পানি উপচে জেলেপাড়া গ্রামের ৫৫টি পরিবারের ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে বলে জানান ইউপি চেয়ারম্যান আবু সাঈদ শামীম। নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাহিনুর আলমের নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের সকল সহকারী কমিশনার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগন সহ সকল সরকারী বিভাগের লোকজন মাঠে নেমে পরিস্থিতি পর্যক্ষন ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরপণ করছেন।

তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজার রহমান জানান, চারদিনে অবিবরাম বর্ষনের পানি ছাড়াও উজানের ঢলে তিস্তা নদীতে বন্যা দেখা দিয়েছে।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল



 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech