রোহিঙ্গা মেরে নৌকা ভরে লাশ নদীতে

  

পিএনএস ডেস্ক: ধীরগতিতে বয়ে চলা সংকীর্ণ মায়উ নদীর পাশে খুবই ছোট একটি পল্লী মং নু। যেখানে ৭৫০টির মতো ঘরে রোহিঙ্গারা দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করে আসছিল। মুসলমানরা তাদের বৌদ্ধ প্রতিবেশীদের সঙ্গে এক বেঞ্চে বসে চা পান করত—এমনই ছিল সম্প্রীতির সহাবস্থান। তাদের এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অবসান ঘটে ২৫ আগস্ট। শান্তির বদলে এখন সেখানে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে ছেয়ে আছে আকাশসীমা, যা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে এখনো দেখা যায়।

রাখাইনের একটি পল্লীর নাম মং নু। সেখানে থেকে পালিয়ে আসতে পারা ১০-১২ জন গ্রামবাসী তাদের বাড়িতে থাকা অবস্থার শেষ মুহূর্ত এবং দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে আসার বর্ণনা দিয়েছে। জানিয়েছে নৃশংসতার এমন সব ঘটনা, যা অবিশ্বাস্য, ভাষায় প্রকাশের অযোগ্য। গত সপ্তাহে তারা বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে কুতুপালং আশ্রয়শিবিরে এসে পৌঁছায় এবং দুই দিন ধরে তাদের সাক্ষাৎকারে এ ধরনের আরো অনেক রোমহর্ষক কাহিনি বেরিয়ে আসে। ফোরটিফাই রাইটস নামের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, মং নু এবং এর আশপাশের তিনটি গ্রামে আনুমানিক ১৫০ জন লোক মারা গেছে।

নৌকাবোঝাই লাশ নদীতে
প্রাণ নিয়ে বেঁচে আসা রোহিঙ্গারা বলেছে, যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিয়ে সৈন্যরা গ্রামে ঢুকেছিল সকাল ৮টা বাজার পরপরই।

গ্রামবাসীর দাবি, সৈন্যরা তাদের দিকে বন্দুক তাক করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। দৌড়ে পালাতে গিয়ে অনেকেই গুলি খেয়ে ঘটনাস্থলে মারা যায়, কেউ কেউ আহত হয়ে সবুজ ধানক্ষেতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। আগের দিন রাতে স্থানীয় পুলিশচৌকিতে রোহিঙ্গা জঙ্গিরা হামলা চালিয়েছিল। এরই প্রতিশোধ নিতে মিয়ানমার সৈন্যরা পৈশাচিক কায়দায় দিনটি শুরু করে।

গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ রশিদ স্ত্রী-পুত্র নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছেন বাংলাদেশে। কিন্তু লাঠিতে ভর দিয়ে চলা তাঁর ৮০ বছরের বৃদ্ধ বাবা দৌড়াতে পারছিলেন না। ইউসুফ আলী নামের ওই বৃদ্ধ লোকটির গলা একজন সৈন্য এত জোরে চেপে ধরে যে তাঁর গলা দেহ থেকে প্রায় আলাদা হয়ে যাচ্ছিল। ‘আমি চেয়েছিলাম ফিরে গিয়ে বাবাকে বাঁচাই। কিন্তু কয়েকজন আত্মীয় আমাকে আটকায়, কারণ সৈন্যরা সংখ্যায় ছিল অনেক। ’ ওয়াশিংটন পোস্টকে বলছিলেন ৫৫ বছর বসয়ী রশিদ। তিনি আরো বলেন, ‘এটা আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, আমি আমার বাবার জন্য কিছুই করতে পারলাম না। ’

সোই উইন নামের দশম শ্রেণির এক শিক্ষক বলেন, ‘আমি গুনতে পারিনি কতজন মরেছে। তবে আমরা সবাই দেখেছি সৈন্যরা কী করেছে। তারা একজন একজন করে গ্রামবাসীকে জবাই করছিল। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল গ্রামের রাস্তাঘাট। ’

গাড়ি সারাইয়ের কাজ করা ২৩ বছর বয়সী মোহাম্মদ শফি বলেন, ‘যেদিন সৈন্যরা আমাদের ওপর চড়াও হলো ওই দিন কেবল আমরা ফজরের নামাজ পড়ে সকালের খাবারের জন্য ভাত রান্নার প্রস্তুতি নিয়েছি। এমন সময় তিনজন সৈন্য মেশিনগান নিয়ে আমাদের উঠোনে এসে দাঁড়ায় এবং দ্রুত বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে বলে। ’ শফি বলেন, “সৈন্যরা বলছিল, ‘তোরা বাঙ্গালি, ঘর থেকে বের হ। যেখানে খুশি যা, কিন্তু এখানে থাকতে পারবি না। ’”

শফি বলেন, ‘আমি এবং আমার পরিবার খুব ভয় পেয়ে যাই। এ কারণে আমি আমার প্রতিবেশী ১৭ বছর বয়সী মোহাম্মদ রফিককে কোনো সহযোগিতা করতে পারিনি। তার পশ্চাদ্দেশের ডান দিকের অংশ গুলি লেগে পুরো আলাদা হয়ে যায়। তারা দস্যুর মতো আমাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয় এবং সৈন্যদের কাঁধে থাকা রকেট লাঞ্চার দিয়ে গোলা ছুড়ে আরো ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। ’ এর পরও অনেকে ঘন গাছপালা আর বৃষ্টিতে ভেজা ওই স্যাঁৎসঁতে জঙ্গলে যেতে অস্বীকার করে। সেখানে কয়েকজন নারী বসে বসে মুখ বুজে কান্না করছিল। অন্যরা একে অন্যের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল। তারা এখন কী করবে? তারা সিদ্ধ পানি দিয়ে রফিকের ক্ষত ধুয়ে একটি ময়লা ন্যাকড়া দিয়ে বাঁধার চেষ্টা করছিল। এভাবেই প্রথম রাতটি নেমে এলো। এক অস্বাভাবিক অন্ধকার ছেয়ে ফেলল গ্রামটিকে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল, আকাশ কিছুক্ষণ পরপর আগুনে জ্বলজ্বল করে ওঠে আবার কিছুক্ষণ পর মিইয়ে যায়। তারা তখনো জানে না এমন আরো পাঁচটি রাত অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।

দ্বিতীয় দিন। ঘরে লুকিয়ে থাকা এক এক ব্যবসায়ী লম্বা হাড্ডিসার এক আর্মি সার্জেন্টের ডাক পেলেন। ওই সার্জেন্টকে সবাই চিনত এবং ‘বাজো’ বলে ডাকত, যে কিনা প্রায়ই ওই ব্যবসায়ীর বাসায় দাওয়াত খেতে আসত। বাজো বলে, সৈন্যরা ব্যবসায়ীর একটি খেয়া নৌকা তাদের কাজে অধিগ্রহণ করতে যাচ্ছে। মোহাম্মদ জুবায়ের নামের ৪০ বছর বয়সী ওই ব্যবসায়ী বুঝে যান, নৌকা না দিলে তাঁকে মেরে ফেলা হবে। তিনি ওই আর্মি অফিসারকে দিয়ে নৌকাটি সেনা শিবিরের কাছের জেটিতে পাঠিয়ে দেন। সেনা কর্মকর্তা নৌকার চাবি নেন এবং কী কারণে ওই সার্জেনন্টকে হুমকি দেন এই বলে যে ‘তোকেও খুন করা হবে। ’ তবে শেষমেশ নৌকাচালক অন্যদের নিয়ে নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

জুবায়ের ওয়াশিংটন পোস্টকে জানান, তিনি নিজে গিয়েছিলেন নৌকার কী হচ্ছে দেখতে। সে ছিল এক ভয়ংকর দৃশ্য! সৈন্যরা একটার পর একটা লাশ নৌকায় তুলতে শুরু করল, ঠিক যেভাবে পাঁজা করে চেরাই করা কাঠ তোলা হয়। ওই লাশগুলোর মধ্যে ১৩ বছরের দুটি কিশোরের লাশও ছিল। অল্প বয়সী এই ছেলেগুলো জুবায়েরের পরিচিত ছিল। ‘এটা দেখে আমার জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা হয়’—বলেন জুবায়ের। তারপর তিনি চলে এসেছিলেন ওই স্থান ছেড়ে। তাঁর বিশ্বাস, ওই লাশগুলো মাঝনদীতে নিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় দিন রফিকের মা খালেদা বেগম তাঁর ছেলেকে খুঁজতে খুঁজতে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন তাঁর অন্য চার ছেলে-মেয়ে নিয়ে। বছরখানেক আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি তাঁর ভরণ-পোষণের ভাতা তুলে ছেলে-মেয়েদের মানুষ করছিলেন। তাঁরা একপর্যায়ে জঙ্গলে এসে দেখেন রফিক টানটান হয়ে শুয়ে আছে গাছের নিচে। কিছুক্ষণ সবাই মিলে হাউমাউ কান্না করে পালানোর চিন্তায় মন দেন।

বিপদ বাড়ছে দেখে ষষ্ঠ দিনে মং নু পল্লীর বাসিন্দারা দলবেঁধে দক্ষিণে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে হেঁটে রওনা দেন। ঘটি-বাটি যা পেরেছেন এবং সঙ্গে কিছু খাবার নিয়ে তাঁরা হাঁটা শুরু করেন। পথে খাবার ফুরিয়ে যায় এবং কলাগাছের কচি পাতা ও ঝরনার পানি খেয়ে আট দিন ধরে তাঁরা হাঁটেন। এ সময় সঙ্গের বাচ্চাগুলো মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। রফিককে কাঁধে নিয়ে হাঁটছিলেন শফী। রফিক কিছুক্ষণ পরপর এক পাশে ঝুলে পড়ছিল এবং অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল। তার পাও ফুলে উঠেছিল। অবশেষে তাঁরা একটি উঁচু পাহাড় পেরিয়ে একটি পিলার দেখতে পান। তাঁরা বুকে বল ফিরে পান, যখন মনে হলো সামনেই বাংলাদেশ! তখন বিকেল সাড়ে ৪টা বাজে। বৃষ্টি হচ্ছিল। এভাবেই তাঁরা শরণার্থীদের এক নতুন শহরে এসে পৌঁছায়, যেখানে রয়েছে বাঁশের খুঁটি পুঁতে কালো প্লাস্টিক শিটে ছাওয়া হাজার হাজার অস্থায়ী তাঁবু। এত সব বিভীষিকা পেরিয়ে যখন তাঁরা সীমান্ত পিলারের কাছে চলে এলেন, তখন তাঁরা জড়িয়ে ধরলেন একে অন্যকে। খালেদা বেগম ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক অ্যানি গোয়েনকে বলেন, ‘আমি তখন খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল পাগল হয়ে গেছি। আমার কেবলই মনে হতে লাগল আর আমাদের কেউ মারতে পারবে না। ’

পরের দিনগুলোতে খালেদার যখনই ওই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে তখনই তাঁর চোখ জলে ভরে ওঠে। এবারই প্রথম তিনি বিশ্বাস করতে চাইলেন যে গ্রামের অন্যরা যারা তাঁর ছেলে রফিককে গ্রাম থেকে বের করে আনতে সাহায্য করেছেন তাঁরা সত্যিই চেয়েছিলেন যে তাঁর ছেলে যেন বেঁচে থাকে। এই রোহিঙ্গারা বলেছে, তারা জানত সামনে আরো কঠিন সময় আসছে। এ ছাড়া শরীরও সায় দিচ্ছিল না। তাই তারা পাহাড়-পর্বত পাড়ি দেওয়ার ফাঁকে, এমনকি কাদামাটির মধ্যেও কিছুক্ষণের জন্য হলেও ঘুমিয়ে বিশ্রাম নিয়েছে। তবে চোখ বন্ধ করলেই তাদের প্রতিবেশীদের প্রাণহীন নিথর দেহ মনের মধ্যে ভেসে উঠত। কানে বাজত মুহুর্মুহু গুলির শব্দ, যা আজও তাদের তাড়া করে।

জমিদারবাড়ির দুই শিশু মংডুর নাশতা খোঁজে আর কাঁদে
গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ—সত্যিকার অর্থেই ছিল পরিবারটির। মংডুতে নিজস্ব পাকা বাড়ি। এত জমি ছিল যে সবাই বলত ‘জমিদার’। পরিবারের সদস্য মুহিবুল্লাহ আকিয়াব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে মংডু শহরে শিক্ষকতা করেছেন, চাকরি করেছেন এনজিওতেও। চাকরি করেই প্রচুর টাকা আয় করতেন। এখন তাঁর ঠিকানা আট হাত প্রস্থ, ১০ হাত দৈর্ঘ্যের এক টুকরা পাহাড়ি জমি। পলিথিনের ছাউনির নিচে সন্তান-সন্ততিসহ ১১ জন মাথা গুঁজে আছেন গাদাগাদি করে। সবাই একদিকে মাথা দিয়ে শুয়ে ঘুমাতেও পারে না—এত সংকীর্ণ। কাদামাটির ওপর গড়া খুপরিঘরের নিচে পলিথিন, ওপরে পলিথিন, পাশেও পলিথিন।

‘কোনো দিন এমন কঠিন সময় আসবে, কল্পনাও করতে পারিনি’ গণমাধ্যমকে বলেন মুহিবুল্লাহ (৪৩)। মংডু শহরের বাড়িতে সকালে খাবার টেবিলে সন্তানদের নিয়ে হরেক রকমের নাশতা খেতেন। মাছ-মাংস দুপুরে ও রাতের খাবারে থাকত নিয়মিত। সেই পরিবারের সদস্যদের এখন মুখে দিতে হচ্ছে ‘অন্য রকমের’ খাবার। খাবারের স্বাদ বড় কথা নয়—কোনো রকমে ক্ষুধা নিবারণই বড় কথা। সকালে ঘুম থেকে উঠে পরিবারের সবচেয়ে ছোট শিশু দুটি মংডু শহরের ঘরে যে নাশতা খেত সেসবের কথা বলে। কিন্তু মা তাদের মুখে তুলে দেন রাতের বেলার উদ্বৃত্ত কিছু ভাত কিংবা জাউ। শিশু দুটি অভিমান করে না খেয়েই আবার ঘুমিয়ে পড়ে। তবে দশম, নবম, অষ্টমসহ অন্যান্য শ্রেণিতে পড়ুয়া বড় সন্তানরা এ অবস্থা কিছুটা হলেও মেনে নিচ্ছে।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুপুর ও রাতে রান্না করা তরকারি কোথায় পাবে! লবণ ও শসার টুকরা দিয়ে ভাত গিলে ফেলা—এই হচ্ছে তাদের আহার। মুহিবুল্লাহ নিজেকে ‘জমিদারপুত্র’ পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘বাবা মরহুম মাওলানা ফজল আহমদের ৪০ কানি (আড়াই কানিতে এক একর) জমিতে চাষ হতো। আরো ৫০ কানি জমি নিয়ে রয়েছে বাগান। বাড়ির উঠানে অনেক বড় ধানের গোলা। গোয়ালে গরু ছিল ২০-২৫টি, মোষ ছিল ১০-১২টি। নিজস্ব ভিটায় রয়েছে অনেক বড় পুকুর। পুকুর ভরা মাছ। গরু-মোষের দই ছাড়া কোনো দিন ভাতও খেতে হয়নি। গ্রামের দোতলা বাড়িটি ছিল গাছের নকশাকাটা। এই বাড়িও মিয়ানমার বাহিনীর রোষের শিকারে পুড়ে গেছে। রাখাইন সন্ত্রাসীরা লুটপাট করে নিয়েছে গরু-মোষগুলোও। ’

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) অফিস থেকে পলিথিন নিতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন ‘জমিদারপুত্র’। পরনে দামি চেক লুঙ্গি, দামি গেঞ্জি। মুহিবুল্লাহ জানান, অনেক পরিচিতজন ও প্রতিবেশী তাঁকে লাইনে দাঁড়ানো থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিল। তার পরও লাইনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন এই ভেবে যে ‘মুহূর্তেই রাজা ফকির হয়, ফকির রাজা হয়’।

রাখাইন রাজ্যের লন্ডুছড়া গ্রামে মুহিবুল্লাহদের বাড়ি। তাঁরা পাঁচ ভাই, পাঁচ বোন। দুই ভাই আহমদুল্লাহ ও হাবিবুল্লাহ ব্যবসা করেন। ক্ষেতখামার দেখাশোনা করেন আরেক ভাই সাইফুল্লাহ। ছোট ভাই হাসমতুল্লাহ লেখাপড়া করেন। মুহিবুল্লাহ হচ্ছেন ভাইদের মধ্যে সবার বড়। তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন মংডু শহরে। বাবা মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। দাদা মাওলানা আহমদুল্লাহ ছিলেন আলেম। নানা মাওলানা আবুল খায়ের ছিলেন স্থানীয় সরকারের রোয়াজিগিরি (চেয়ারম্যান)।

মংডু থেকে একদিনেই আসা যায় কক্সবাজারের টেকনাফ কিংবা উখিয়ায়। কিন্তু মুহিবুল্লাহদের লেগেছে আট দিন। মিয়ানমার বাহিনীর বর্বরতা থেকে রক্ষা পেতে এই আট দিন তাঁরা বনজঙ্গল আর পাহাড়ে লুকিয়ে হেঁটেছেন। অবশেষে গত ১০ সেপ্টেম্বর নাফ নদ দিয়ে টেকনাফ সীমান্ত পার হয় মুহিবুল্লাহর পরিবার। ৯ সন্তান, স্ত্রী, মাসহ ৪০ সদস্যের পরিবারের বিরাট বহর মুহিবুল্লাহর। মিয়ানমারে অনেক সম্পদ থাকলেও প্রাণ বাঁচাতে পালানোর সময় নগদ অর্থ তেমন আনতে পারেনি তারা। মুহিবুল্লাহ বলেন, মিয়ানমার বাহিনীর নির্যাতনের কথা কত বলা যায়। রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা, গণধর্ষণ, লুটপাট এবং সব শেষে আগুন দিয়ে ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন করা ওদের জন্য একটি ‘কমন কাজ’। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের নির্মূল করার কাজ বাস্তবায়নে মিয়ানমার বাহিনী নেমেছে মরণকামড় দিয়ে। তাই দেশ ছেড়ে পালানো ছাড়া রোহিঙ্গাদের বিকল্প কোনো পথ নেই। তিনি বলেন, ‘এবার যারা রাখাইন থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছি আমরা সবাই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেই আসছি। বাংলাদেশ যদি সীমান্ত খুলে না দিত, তাহলে মৃত্যু ছিল অনিবার্য। ’

হারিয়েছেন সম্ভ্রম, স্বামী-সন্তান
‘মনে করেছিলাম, তারা শুধু অবিবাহিত তরুণী ও কিশোরীদের ধরে নিয়ে ধর্ষণ করে, আমার মতো গৃহবধূদের কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু আমার ধারণা ভুল ছিল। তাদের লালসা থেকে রেহাই পাইনি। একসঙ্গে তিন সেনা বাড়িতে ঢুকে একের পর এক নির্যাতন করে। ’ শানুয়ারা (বয়স ২৫, আসল নাম নয়) যখন কথাগুলো বলছিলেন লজ্জায়-বেদনায় তাঁর মাথা নুয়ে আসছিল। তিনি জানান, ঘৃণ্য সে নির্যাতনের ফলে তাঁর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলেও প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। তবে মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অনেক কিশোরী ও তরুণী মারা গেছে।

তুমব্রু সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান করছেন মংডুর বলির বাজার গ্রামের নির্যাতিত এই গৃহবধূ। নিজ বাড়িতে ১৩ দিন আগে ঘটে যাওয়া সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীদের নৃশংসতার কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। শানুয়ারা বলেন, নির্যাতনের পরও টলতে টলতে তিনি শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে অন্য সন্তানদের খুঁজে ফিরছিলেন একসঙ্গে পালানোর জন্য। তারপর যা ঘটে তা-ও সভ্য সমাজের জন্য কলঙ্ক। শানুয়ারা বলেন, ‘তখন দেখি সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা আমার বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সেনারা আমার কোল থেকে ছোট ছেলেটিকে কেড়ে নিয়ে আগুনের মধ্যে ছুড়ে মারে। একইভাবে দুই মেয়ে এবং স্বামীকেও তারা ধরে এনে আগুনে ফেলে দেয়। এরপর আমি বাকি দুই সন্তানকে (এক ছেলে ও এক মেয়ে) সঙ্গে নিয়ে দৌড়াতে থাকি। ’ শানুয়ারা বলেন, এ অবস্থায়ও তিনি পেছন ফিরে দেখছিলেন স্বামী-সন্তানরা যদি আগুন থেকে বের হয়ে আসতে পারে! কিন্তু পারেনি। চারজনকেই পুড়িয়ে মারে পশুরা! তুমব্রু সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে এক হাজার ২৮০ পরিবারের সঙ্গে শানুয়ারা এখন আছেন বেঁচে যাওয়া দুই সন্তানকে নিয়ে।

শানুয়ারা জানান, বলির বাজার থেকে সীমান্তে আসতে তাঁর সময় লেগেছে তিন দিন। পথে নিজে কিছু মুখে দেননি। কয়েকজনের কাছ থেকে চেয়ে দুই সন্তানকে সামান্য খাইয়েছেন। শানুয়ারা বলেন, ‘সেদিন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও মগরা (রাখাইন সন্ত্রাসী) একসঙ্গে পুরো বলির বাজার গ্রাম ঘিরে ফেলে। তারা প্রতিটি বাড়িতে ঢুকে বর্বরতা চালায়। যুবতী বা কিশোরীদের একত্র করে ধর্ষণ করে সেনা সদস্যরা। ফলে অনেক মেয়ে মারাও যায়। ’

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech