সহমর্মিতার মেলবন্ধন নতুন-পুরাতনে

  


পিএনএস ডেস্ক: নাসিমা খাতুন। মাত্র ১০ বছর বয়সে শরণার্থী হয়েছিলেন। ১৯৯২ সালের ঘটনা। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার দমন-পীড়নের মুখে বাংলাদেশ পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন এই রোহিঙ্গা শিশু। এখন তার বয়স ৩৫।

এখন তিনি একজন মা। মা হয়ে মমত্ববোধ একটু বেশি যেন। কাঠের চুলায় বড় একটি পাতিল বসিয়ে ভাত রান্না করছেন সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা নিজ জাতিগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের জন্য।

নাসিমা খাতুনকে সহায়তা করছেন আরও পাঁচ মহিলা। আন্তর্জাতিক একটি সাহায্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে ৪০০ থেকে ৫০০ শরণার্থী রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও পুরুষের জন্য খাবার রান্না করছেন তারা। সবাই ১৯৯২ সালে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।

‘তাদের সহায়তার জন্য আমাদের হাতে তো কোনো টাকা নেই। কিন্তু সময় ও শ্রম দিতে পারি আমাদের ভাই-বোনদের জন্য’- বলেন নাসিমা খাতুন।

‘দুই দশক আগে আমরাও প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসি। ওই সময় আমাদের কোনো আশ্রয়স্থল ছিল না। ছিল না কোনো খাবার-পানির ব্যবস্থা। কী নিদারুণ কষ্ট! স্থানীয় বাঙালিদের সহায়তায় প্রাণে বেঁচে যাই। এখন আমাদের ভাই-বোনরা আসছে। আমাদের সন্তানরা আসছে। তাদের জন্য তো কিছু করতে হবে; টাকা-পয়সা নেই, সময় ও গায়ের শ্রম দিয়ে তাদের এ দুর্ভোগ কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারি।’

শুধু নাসিমা নন, এমন শত শত রোহিঙ্গা যারা দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় পেয়েছেন; তারা নতুন করে আশ্রিতদের সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। স্থানীয় বাংলাদেশিসহ জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা- ইউএনএইচসিআর’র উদ্যোগে পরিচালিত দেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে দশকের পর দশক ধরে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছেন তারা।

‘ভাষাগত সমস্যাসহ নবাগতদের বিভিন্ন প্রয়োজনে সবার আগে হাত বাড়িয়ে দেন আগের আশ্রিত রোহিঙ্গারা। তারাই আমাদের মানবিক কার্যক্রমের মূল স্তম্ভ। সেই প্রথম দিন থেকে তারা তাদের সামর্থ অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের সহায়তা ছাড়া এমন মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হতো না’- বলেন ইউএনএইচসিআর পরিচালিত কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের সহকারী সুরক্ষা কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ। নাসিমা আসার বছর অর্থাৎ ১৯৯২ সালে ক্যাম্পটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ঘটনায় (রোহিঙ্গাদের নিপীড়নের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া) তারাই প্রথম এগিয়ে আসেন এবং নিজ উদ্যোগে স্থানীয়দের ঘরে ঘরে গিয়ে চাল-ডাল সংগ্রহ করেন এবং সেগুলো রান্না করে নতুন আশ্রিতদের মাঝে বিতরণ করেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া রাখাইন সহিংসতায় গত এক মাসে অন্তত চার লাখ ২৯ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে বাবা-মা-হারা শিশুর সংখ্যা ১৪ শ’। শুধু ঘরবাড়িতে হামলা কিংবা লুটপাট নয়, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় রাখাইনরা ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন চালায় নিরীহ রোহিঙ্গাদের ওপর।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় হয়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত এলাকায়। ইউএনএইচসিআর’র তথ্য মতে, আশ্রয় নেয়া তিন লাখ ৮৭ হাজার রোহিঙ্গার আশ্রয় হয়েছে অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতে, যেগুলো মূলত বাঁশ ও পলিথিন দিয়ে তৈরি। অনেকের স্থান হয়েছে আগে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শিবিরে। এখনও অনেকে খোলা আকাশের নিচে রাস্তার পাশে অবস্থান করছেন। যদিও গতকাল শনিবার থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় উখিয়ায় দুই হাজার একর জমির ওপর ১৪ হাজার শেড তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। এসব শেডে ৮৪ হাজার পরিবারের স্থান হবে।

‘জরুরি ভিত্তিতে যাদের সাহায্য প্রয়োজন বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েরা যারা তাদের স্বামী হারিয়েছেন, বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ, শিশুরা যারা বাবা-মা, পরিজন থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে; তাদের সাহায্যার্থে আমরা প্রথম হাত বাড়িয়ে দেই’- বলেন মোহাম্মদ হাসান। ১৯৯২ সালে শিশু অবস্থায় বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি।

হাসান বলেন, সবকিছু হারিয়ে দেশান্তরী হওয়ার যে কষ্ট সেটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করি। কারণ একদিন আমিও পরিবার-পরিজন হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছিলাম। একদিন না খেয়ে থাকার যে কষ্ট সেটা ভুক্তভোগী ছাড়া কারও পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। যে কারণে রোহিঙ্গা ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি, সাধ্য অনুযায়ী তাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করি।

টেকনাফের লেদা ও নয়াপাড়া এবং উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালির রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে স্বেচ্ছাসেবী এমন শত শত পুরাতন রোহিঙ্গার সন্ধান পাওয়া যায়, যারা প্রথম দিন থেকে (২৫ আগস্ট) নতুন করে দেশান্তরী রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বাড়িয়ে দিয়েছেন সাহায্যের হাত।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন নতুন নয়। ১৭৮৪ সালে বার্মিজরা আরাকান দখল করে এবং রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার শুরু করে। ১৭৯৯ সাল নাগাদ প্রায় ৩৫-৪০ হাজার মানুষ আরাকান থেকে নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ১৯৭৮ সালে বড় দাগে প্রায় দুই-তিন লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

১৯৯১-১৯৯২ সালে মিয়ানমারের আধাসামরিক বাহিনী নাসাকা ও অন্যান্য বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সম্মিলিত আক্রমণের মুখে আরও প্রায় তিন-চার লাখ রোহিঙ্গা বংলাদেশে প্রবেশ করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ শাসনামালে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য কোনো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ না ঘটলেও নতুন করে রোহিঙ্গা আগমন শুরু হয় ২৫ আগস্ট থেকে।

মিয়ানমার সরকার বলছে, চরমপন্থীরা রাখাইন প্রদেশের কয়েকটি তল্লাশি চৌকিতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হতাহত করে। এর প্রতিক্রিয়ায় মিয়ানমারের সামরিক ও পুলিশ বাহিনী সম্মিলিতভাবে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের নামে শুরু করে রোহিঙ্গা নিধন।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২৫ আগস্টের পর মৃতের সংখা হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বেসরকারি হিসাবে যা আরও অনেক বেশি। বেসরকারি তথ্য মতে, বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় লাখ। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে নির্যাতন করে মিয়ানমার পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পুশইন করছে, যার সংখ্যা বর্তমানে ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। সূত্র : ইউএনএইচসিআর

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech