পরিত্যক্ত চুলেই সাবলম্বী হাজারো পরিবার

  

পিএনএস, তানোর (রাজশাহী) সংবাদদাতা : ‘চুল তার কবে কার অন্ধকার বিদিশার নিশা' কবি জীবনানন্দ দাশের এমন পঙিতমালা কিংবা ‘তোমার চুল বাঁধা দেখতে দেখতে ভাঙ্গলো মনের আয়না'মতো বিখ্যাত গানে আলোচিত নারীর চুল। প্রেম, ভালোবাসা, বিরহ কিংবা শিল্পীর রং তুলিতে নারী চুলের শিল্পকর্ম অমূল্য।

তবে বাস্তবে নারীর চুলও উচ্ছিষ্ট নয়, দামি। আর এই নারীদের উচ্ছিষ্ট চুল নিয়ে বসেছে জমজমাট চুলের হাট। বাংলাদেশে একমাত্র বেচাকেনার হাট বসছে রাজশাহী তানোর উপজেলার চৌবাড়িয়ায়। শুধু মঙ্গলবার বাদে সপ্তাহে ছয় দিন এখানে চলে চুলের বেচাকেনা। চুলের হাটকে নিয়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ১৫টি প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র। পুরুষদের পাশাপাশি সেখানে কাজ করছেন নারীরাও। যেখানে হাজারো পরিবারের সদস্যরা চুলের কাজ করে সাবলম্বী হচ্ছেন। সব মিলিয়ে এখানে বেচাকেনা হচ্ছে প্রায় এক কোটি টাকার চুল।

নওগাঁর নিয়ামতপুর ও মান্দা উপজেলায় প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র থেকে চুল আসে হাটে। চুল কিনতে দেশের উত্তর অঞ্চল রংপুর ও দিনাজপুর এলাকা থেকেও পাইকাররা আসেন। হাটে প্রতিদিন অন্তত ২০ কেজি করে করে চুল বিক্রি হয়। মাসে এখানে এক কোটি টাকার কারবার হয় চুল নিয়ে। এদিকে চৌবাড়িয়া বাজারে ৪৬জন চুল ব্যবসায়ীকে নিয়ে গড়ে উঠেছে চুল ব্যবসায়ী সমিতি।

চুল ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, নারীদের উচ্ছিষ্ট চুল (দু'টাকার দোকানদার) ফেরিওয়ালারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে সংগ্রহ করেন। এরপর বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা চুলগুলো হাটে বিক্রি করেন। সেখান থেকে চুল ব্যবসায়ীরা চুল কিনে নিয়ে আসেন নিজ কেন্দ্রে। তারপর কয়েকটি ধাপে চুল প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয়।

চুলের কাজে নিয়োজিত মাদারীপুর গ্রামের কাজলী বেগম, চকরহমত গ্রামের নিলুফা ইয়াসমিন, রুমা খাতুন, জাহানারা বেগম জানান, তারা জটবাঁধা ও নোংরা চুল আলাদা করেন। এতে নাকে-মুখে ধূলাবালি ঢুকে শরীরে অসুখ হয়। পরিশ্রমের তুলনায় টাকা কম পান। পেটের দায়েই তারা কাজ করছেন।

তানোর উপজেলার চন্দনকোঠা গ্রামের চুল ব্যবসায়ী মজিদুল ইসলাম ও মাদারীপুর গ্রামের চুল ব্যবসায়ী সেলিম হোসেন জানান, তারা চুল কেনেন চার হাজার তিন শত টাকা কেজি দরে। প্রক্রিয়াজাতের পর এক কেজি চুলের ওজন কমে ৬০০ গ্রাম হয়। সেই চুল প্রতি কেজি সাড়ে দশ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। তবে ১২ ইঞ্চির বেশি লম্বা হলে ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতি কেজি বিক্রি হয়।

চৌবাড়িয়া বাজার চুল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন জানান, চুল ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এলাকার সুবিধাবঞ্চিত নারী, পুরুষ ও শিক্ষার্থীরা এই পেশার সাথে জড়িত। কিন্তু শ্রমের তুলনায় তারা পারিশ্রমিক খুব কম পান। যদি সরকারি-বেসরকারি ভাবে প্রশিক্ষণ ও ঋণের ব্যবস্থা করা যেত তাহলে এ ব্যবসায় আরো সুফল বয়ে আনতো।

বাংলাদেশ থেকে চুল রফতানি হয় ভারত, শ্রীলংকা, মায়ানমার, ভিয়েতনাম, চিন, জাপান ও কোরিয়ায়। বটিচুল, পরচুলা ও অন্যান্য সৌখিন জিনিস তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এ চুল। ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক বাজার বাংলাদেশের চুলের চাহিদা বাড়ছে।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বা ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি বাবদ আয় হয়েছে ১ কোটি ৭৫ লাখ ডলার বা ১৪০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে (২০১৬-১৭) রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ৯০ লাখ ডলার বা ১৫২ কোটি টাকা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহা: শওকাত আলী বলেন, তানোরের চুল ব্যবসা একটি সম্ভাবনাময় খাত। এতে যুক্ত হয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এখনও চুল ব্যবসা আলাদা শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ খাত অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech