হারিয়ে যাওয়া ধান রক্ষায় অনন্য উদ্যোগ ‘ইউসুফ মোল্লার’

  

পিএনএস, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি : বরেন্দ্র অঞ্চল জুড়ে এক সময় ছিল বিভিন্ন দেশীয় জাতের ধান চাষ। এখন এই সব ধান হারিয়ে গেছে প্রায়। তবে হারিয়ে যাওয়া এসব দেশীয় ধান রক্ষা করে চলেছেন রাজশাহীর তানোর উপজেলার প্রান্তিক কৃষক ইউসুফ মোল্লা। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে বিলুপ্ত দেশীয় ধান রক্ষা করে চলেছেন তিনি। তার ৪৮ শতাংশ জমিতে এবার ৪৮ প্রজাতির হারিয়ে যাওয়া ধানের চাষ করেছেন। এছাড়া তার রয়েছে নিজস্ব তৈজসপত্রের সংগ্রশালা ও বরেন্দ্র বীজ ব্যাংক। যেখানে রয়েছে পুরাতন দিনের নিদর্শন আর হারিয়ে যাওয়া বিলুপ্ত প্রায় ৩১২ প্রজাতির ধান।

‘পঙ্খীরাজ,গোবিন্দভোগ,জামাইভোগ,মোগাইবালাম, রূপ কথা, রাঁধুনি পাগল, পাঙ্গাস,ঝিঙ্গাশাইল, কালজিরা, সুবাশ, উকনিমধু, পাইজাম, চিনি শঙ্কর, বাদশাভোগ, ভোজনঝুলন, নীলকন্ঠ, বাঁশমতি, সোনাকাঠি, দুধসাগর, দলকচু, মধুমালা, ধলেস্বর, নাজিরশাইল, কলামুছা, কলকলতা, কাজললতা এক ধানে দুই চাল, বিন্নি- এসব ধানের নাম এখন আর অনেকের মনে নেই। নতুন প্রজন্ম তো দূরের কথা প্রবীণদের অনেকের মনের পাতা থেকে হারিয়ে গেছে নামগুলো। তবে এসব ধান অনেক সযত্নে আগলে রেখেছেন কৃষক ইউসুফ মোল্লা।

চলতি মৌসুমে তিনি বীজের পরিধি বাড়াতে ৪৮ জাতের ধান চাষ করছেন। ইউসুফ মোল্লা রাজশাহীর তানোর উপজেলার দুবইল গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান। বাবার হাত ধরে তার কৃষি কাজে হাতেখড়ি। শুধু শখের বসে নয়, ভালবেসে তিনি রক্ষা করে চলেছেন হারিয়ে যাওয়া এই সব ধানের জাত। ছোট ছোট প¬টে চাষ করে তিনিই বাঁচিয়ে রেখেছেন প্রায় ৫০ প্রজাতির ধান। এসব ধান বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে প্রায় বিলুপ্ত। নতুন দিনের মানুষ সেসব ধানের কথা ভুলে গেলেও বরেন্দ্রভূমির কৃষক ইউসুফ মোল্লা বাঁচিয়ে রেখেছেন সেসব ধানের ঐতিহ্য। এই ধানের গুলোর বেশির ভাগই খরা ও বালাইসহিষ্ণু। চাষ করতে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহার করতে হয় না বললেই চলে। তাই নিজের মতো করেই নিজ গ্রামে এসব ধান চাষ করছেন তিনি।

এ নিয়ে কৃষক ইউসুফ মোল্লা জানান, পুরানো দিনের হারিয়ে যাওয়া ধানগুলো সংরক্ষণ ও চাষবাদ করে নতুন প্রজন্মরা যেমন জানতে পারবে পাশাপাশি এই হারিয়ে যাওয়া ধানগুলো তার অবর্তমানে কৃষকদের মনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। ২০১২ সাল থেকে রাজশাহী, বগুড়া, দিনাজপুরসহ সারাদেশে প্রায় ৩০০ কৃষককে তিনি এসব বীজ শর্তসাপেক্ষে সরবরাহ করেছেন। তা হলো বীজের বদলে বীজ। একজন কৃষক তার কাছে ৫ কেজি বীজ নিলে ধান উৎপাদনের পরে সে আবার ৫ কেজি বীজ ফেরত দিবে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামের কৃষক মুকিত দুলাল বলেন, ‘আমি গোদাগাড়ী থেকে এসেছি ইউসুফ মোল্লার কাছ থেকে পুরাতন দিনের ঝিঙ্গাশাইল ধানবীজ নিতে। তার কাছ থেকে ধান নিলে আবার ফেরত দিতে হয়। কারণ তিনি ওই ধানবীজ আরেক কৃষককে দেন। আমি তার ধান সংরক্ষণশালাটি দেখে মুগ্ধ।’

কৃষক ইউসুফ মোল্লা আরও জানান, তার সংগ্রহে থাকা ১০০ প্রজাতির বেশি বীজ গাজীপুর ধান গবেষণা কেন্দ্র ও রাজশাহী ধান গবেষণা কেন্দ্রে ৬৫ রকম বীজ দেয়া হয়েছে। তারা সেগুলোর বিস্তার করা নিয়ে গবেষণা করছেন। তার এমন উদ্যোগে উৎসাহ জোগাচ্ছেন স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বারসিক।

তিনি বিভিন্ন দেশি-বিদেশী সংস্থা থেকে কৃষি ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য ৫০টির বেশি কৃষি সনদপত্র পেয়েছেন। এছাড়াও প্রায় ২০টি দেশের ধাতব মুদ্রা সংরক্ষণে রয়েছে তার।

তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, কৃষক ইউসুফ মোল্লা উদ্যোগে বিলুপ্ত হওয়া ধান সম্পর্কে নতুন প্রজন্মরা জানতে পারবে। এক সময় দেশে ১০ হাজার প্রজাতির ধান ছিল। এখন আছে এক হাজার। তাই ইউসুফ মোল্লা যেভাবে বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে বিলুপ্ত ধানের বীজ সংরক্ষণ করে চলেছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক দেব দুলাল ঢালী জানান, বিলুপ্ত ধানের সংগ্রহ ইউসুফ মোল্লার অনন্য অবদান। নানা কারণে দেশীয় এসব ধানের জাত বিলুপ্ত হলেও স্বল্প পরিসরে যেভাবে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন ইউসুফ মোল্লা তা নিঃসন্দেহে বিরল।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech