ইংরেজী বিষয় প্রথম শ্রেণি পাওয়া সঞ্জয় হোটেল বয়

  

পিএনএস, পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি : স্যার কি খাবেন? দই মিষ্টি সিঙ্গড়া-বলতে বলতে একটা কাপড়ের টুকরা দিয়ে টেবিল পরিস্কার। হাস্যউজ্জ্বল সদালাপী এক তরুণ হোটেল বয়। চোখে মুখে বিষœতার ছাপ। দেখে মনে হলো না লেখ পড়া না জানা এ হোটেল বয়। তার সাথে কথা বলতে জানাগেল এক আচার্য ঘটনা। খুলনার পাইকগাছা পৌরসদরে থানাসংলগ্ন কালী মাতা মিষ্টান্ন ভান্ডার। আমি ও আমার এক সহকর্মী এবং পাইকগাছা নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি আব্দুল মজিদ গাজী তিন জন মিষ্টি খেতে হোটেলে যাওয়া। হোটেলের চেয়ারে বসতেই টেবিল মুছতে ছুটে আসে বয় সঞ্জয়। তার কাজে ফাঁকে ফাঁকে কথা বলে জানাগেল উপজেলার গড়ইখালী ইউনিয়নের হাতিয়ার ডাঙ্গা গ্রামের মৃত সুধির মন্ডলের ছোট ছেলে সঞ্জয়। দুই ভাই এক বোন। বড় ভাই এবং বোনের আলাদা সংসার। বর্তমানে সংসারে বৃদ্ধা মা আর সে। সঞ্জয়ের বয়স ৩২ বছর। বসত বাড়ি ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই তাদের।

পড়ালেখার মাঝ পথে ২০০৮ সালে দিনমজুর পিতার মৃত্যু হয়। সঞ্জয় ২০০২ সালে এ গ্রেডে এসএসসি, ২০০৪ সালে গ্রেট পয়েন্ট ৪ পেয়ে এইচএসসি, ২০০৮ ও ২০১১ সালে অনার্স এবং মাষ্টার্স দু’টাতে ইংরেজী বিষয় প্রথম শ্রেণিতে উত্তির্ণ হয়। পড়ালেখা জীবনে অধিকাংশ সময় তাকে দিনমজুর ও টিউশনি করে খরচ যোগাতে হয়েছে। সঞ্জয় এর সাথে কথা বলার ফাঁকে অন্য দু’সহকর্মী বিকাশ দত্ত ও হানিফ শেখ পাশে এসে দাঁড়ান। স্যার সঞ্জয় খুব ভাল ছেলে। ওর জন্য আমাদের খুব খারাপ লাগে। এত লেখাপড়া জানা ছেলে চাকরি না পেয়ে ও আমাদের মত লেখা পড়া না জানা মানুষের সাথে হোটেল বয়ের কাজ করছে। এর মাঝে যে কথাটি না বললেই নয়, সকালের ঘুম ভাঙতেই অ্যাডভোকেট প্রশান্ত কুমার মন্ডল এর ফোন। মুঠোফোন রিসিভ করতেই তিনি জানান-পাইকগাছায় কালীমাতা মিষ্টান্ন ভান্ডারে গরু। হিন্দু হোটেলে গরু সঙ্গত কারনে একটু ভিন্নতা। পরেই জানতে পারি ইংরেজী বিষয় অনার্স মাষ্টার্সে প্রথম শ্রেণি পাওয়া যুবক হোটেল বয়।

ইংরেজী বিষয়ের উপর ৯, ১০, ১৩তম স্কুল ও কলেজ শিক্ষক নিবন্ধন সম্পন্ন করেছে সে। বি সি এস সহ বহুবার বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় বসেছে। দারিদ্র আর কোটা কাল হয়ে চাকুরি নামক সোনার হরিণ ধরা দেয়নি তার হাতের মুঠোয়। অবশেষে নিজ এলকায় ২০১৪ সালে ননএমপিও পাতড়াবুনিয়া আলিম মাদ্রাসায় ইংরেজী প্রভাষক চাকুরি পান। বেতন হবে। নিজের একটা সুন্দর সংসার হবে। এমন আশায় বিবাহ করেন সঞ্জয়। কিন্তু বিধিবাম অর্থহীন সংসার কিছু দিন যেতে না যেতে প্রেয়সী স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলেগেছে। মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ক্ষুধার জগতে সবই অর্থহীন। দৈনিক বেতনে বিকল্প কাজ হিসাবে গত ১০দিন আগে বেছে নেন হোটেল বয়ের কাজ। এখন তার চাওয়া কি এমন প্রশ্নে চোখের দুকোনে জলে এনে জানান-আমি ভাল শিক্ষক হতে চাই। সরকার নিবন্ধনকারীদের দ্রুত নিয়োগ দেন তা হলে ভাল হয়। আমার তো অর্থ সম্পদ কিছুই নেই। তা ছাড়া সরকারি অন্য কোনো চাকুরির ও সুযোগ নেই।

কালী মাতা মিষ্টান্ন ভান্ডারে মালিক কুমারেশ মন্ডল বার্তাসংস্থা পিএনএসকে জানান-সঞ্জয় খুব ভাল ছেলে। কাজের ভিতর থাকলে সে ভাল থাকবে এই ভেবে তাকে কাজ দেওয়া হয়েছে। কাজে বাড়তি কোনো চাপ দেওয়া হয় না। সহকর্মীরাও তার সাথে ভাল ব্যবহার করে।

পাতড়া বুনিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এম এ গফুর বার্তাসংস্থা পিএনএসকে জানান-ইংরেজী প্রভাষক হিসেবে ২০১৪ সাল থেকে শিক্ষকতা করছে। এমপিও ভূক্ত না হওয়ায় আমরা তাকে কোনো বেতন দিতে পারিনি। মাদ্রাসাটি এমপিও হয়েছে। দ্রুত একটি পয়সা ছাড়া তাকে নিয়োগ দেওয়া হবে। সে সুবোধ ছেলে।

স্থানীয় গড়ইখালী ইউপি চেয়ারম্যান রহুল আমিন বার্তাসংস্থা পিএনএসকে জানান-বিষয়টা দুঃখজনক। দারিদ্রতা আর যোগাযোগের অভাবে হয় তো তার একটা ভাল চাকুরি হয়নি। তবে বিষয়টি আমার জানা ছিল না। দেখি তার জন্য কিছু করা যায় কিনা।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech