সাইকেল চালিয়ে শিক্ষকতার ৪৪ বছর - মফস্বল - Premier News Syndicate Limited (PNS)

সাইকেল চালিয়ে শিক্ষকতার ৪৪ বছর

  

পিএনএস, গাইবান্ধা প্রতিনিধি : তিনি ছিলেন অন্ধকার পথে আলোর দিশারি। ইচ্ছা করলেই শিক্ষকতা না করে অন্য লোভনীয় কোনও চাকরিকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি করেননি। মানুষকে আলোর পথ দেখাতে বেছে নেন শিক্ষকতা। বলা হচ্ছিল, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার দাড়িদহ দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালের প্রয়াত সাবেক প্রধান শিক্ষক রইছ উদ্দিন সরকারের কথা।

যার জন্ম গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ভাগকাজী পাঠানপাড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে, ১৯৩৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর । ছয় ভাই-বোনের মধ্যে রইছ উদ্দিন ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। ছোট বেলা থেকেই তিনি নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন।

রইছ উদ্দিন ১৯৫৩ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। এরপর ১৯৫৬ সালে এইচএসসি এবং ১৯৬২ সালে বিএ পাশ করেন। গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার পাঁচ বছর আগেই নিজেকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত করেন রইছ উদ্দিন। বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি চাকরি করেন। এর মধ্যে মহিমাগঞ্জ, কোচাশহর, চাঁদপাড়া, গুজিয়া, বরিয়াহাট উচ্চ বিদ্যালয় ছিল অন্যতম।

এরপর ১৯৬২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তিনি যোগদান করেন দাঁড়িদহ দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। ৩৯ বছর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাটিয়ে সেখান থেকেই অবসরে যান ২০০১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। যদিও রইছ উদ্দিনের অবসরে যাওয়ার কথা ছিল ১৯৯৬ সালে। কিন্তু ইংরেজির শিক্ষক হওয়ায় সরকারের কাছ থেকে পুনঃনিয়োগ পান। সেই সময় গোটা বাংলাদেশে ১১৪ জনকে পুনঃনিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে তিনিও ছিলেন।

এখনকার প্রজন্মের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও রইছ উদ্দিন তাঁর শিক্ষকতা জীবনের পুরোটাই পাড়ি দিয়েছেন বাই-সাইকেল চালিয়ে। তাঁর একটাই ব্রত ছিল শিক্ষার আলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।

রইছ উদ্দিনের সহধর্মিনী রাজিয়া সুলতানা স্মৃতিচারণ করে বলছিলেন,‘ তাঁর সবচেয়ে বড় গুন ছিল সততা। জীবনে কিভাবে সৎ থাকতে হয় তাঁকে দেখে শিখেছে ছাত্ররা। নিয়ম করে প্রতিদিন সাইকেলে করে বাড়ি থেকে ১৮ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেত। ঝড়-বৃষ্টিও তাঁর পথে কখনই বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।’
মেজ ছেলে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা হুমায়ন রেজা বলেন,‘ আব্বার জন্মই হয়েছিল শিক্ষায় আলো ছড়ানোর জন্য। তাঁর সময়ে গোটা ইউনিয়নে একজন গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা লোকের অভাব ছিল। তিনি ইচ্ছা ইচ্ছা করলে আরও বড় চাকরি করতে পারতেন। কিন্তু মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনবেন বলেই শিক্ষকতা পেশা বেছে নিয়েছিলেন।’

ময়দানহাটা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খন্দকার মোঃ রমজান আলীর কথায়,‘ স্যারের মতো মানুষ হয় না। এখনকার শিক্ষকদের দেখি, নিজেদের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করছেন না। এই জায়গায় তিনি ছিলেন অনন্য। উনাকে দেখে শিক্ষকরাও ভয় পেতেন। বলা চলে, এই এলাকায় তিনিই শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন।’

দাঁড়িদহ দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলামের ভাষায়,‘ আমি এই বিদ্যালয়ে এসেছি তাঁর কারণেই। এখানে আমার কোনও পরিচয় নেই, স্যারের পরিচয়েই আমার পরিচয়। একটানা একটি বিদ্যালয়ে ৩৯ বছর কাটিয়ে দেওয়া, সত্যিই বিস্ময়কর!

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech