সরাইলে চেত্রা, নদীটিতে কোনো পানি নেই

  



ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে মোঃ রাকিবুর রহমান রকিব : ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাসরাইল উপজেলা চেত্রা, নদীটিতে কোনো পানি নেই। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় পানির অভাবে ফসলি জমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা এককালের খরস্রোতা নদী চেত্রা। ভেসে চলতো পানসি নৌকা। তবে এই নদীটিকে এখন দিগন্ত বিস্তৃত খোলা মাঠ বলেই মনে হওয়া স্বাভাবিক। শুধু শুকনো তলদেশের ওপর ফসলের মতো পড়ে থাকা জরাজীর্ণ নৌকাগুলো জানান দিচ্ছে একসময়ের বহমান একটি নদীর কথা।

চলতি ইরি মৌসুমে ব্রাহ্মণবাড়িযার সরাইল উপজেলার অরুয়াইল ইউনিয়নের ‘চেত্রা’ নামে নদীটিতে কোনো পানি নেই। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় পানির অভাবে ফসলি জমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা।

এ কারণে সেখানকার হাজারো একর জমিতে সেচ সঙ্কট দেখা দিয়েছে। অরুয়াইল এলাকার সত্তরোর্ধ্ব হাজী ছিদ্দিকুর রহমান স্মৃতিচারণা করে বলেন, একসময় এই চেত্রা নদী দিয়ে যাত্রী ও পণ্য নিয়ে বড় বড় পানসি নৌকা আসত। এই নদীতে নৌকা বাইচের আয়োজন হতো রাণীদিয়া গ্রামের। কিন্তু খননের অভাবে নদী এখন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। নদীর কথা বলতে বলতে এই কৃষক প্রতিবেদকের কাছে কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, মাঠে সেচের কোনো ব্যবস্থা নেই। এভাবে চলতে থাকলে খাব কি ?

সরেজমিন দেখা গেছে, সরাইল উপজেলার অরুয়াইল ও পাকশিমুল এই দুই ইউনিয়নের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা একসময়ের খরস্রোতা চেত্রা নদীর গতিপথের দিকে তাকালে এখানে বয়ে যাওয়া নদীর অস্তিত্ব নিয়ে কল্পনা করা দুঃসাধ্য। দীর্ঘ দিন যাবত খননের অভাবে নদী শুকিয়ে যাওয়ায় সাথে সাথে নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। এ কারণে কৃষি জমিতে পানি সেচ নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন সরাইলের অরুয়াইল ও পাকশিমুল ইউনিয়নের কৃষকেরা।

অথচ বছরের ছয় মাস পানির নিচে তলিয়ে থাকায় একমাত্র ইরি ধান আবাদ করেই সারা বছরের জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন এখানকার দুই ইউনিয়নের কৃষকেরা। দারিদ্রসীমার নিচে বাস করা হাওর এলাকার কৃষকরা ব্যাংক কিংবা মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ও ধারদেনা করে বছরের একমাত্র ফসলের আবাদ করে থাকেন। এখন সেচের পানির অভাবে সম্ভাব্য ফসলহানির আশঙ্কা মাথায় রেখে পরিবারের ভরণ-পোষণ ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে চরম উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় দিন কাটছে কৃষকদের।

কৃষকেরা জানান, কিছুদিন আগে এখানকার জমিতে রোপন করা ধানের চারাগুলো বেড়ে উঠছে। এই সময়টাতে সেচের পানির খুব প্রয়োজন হলেও তা মিলছে না। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে এর তীরবর্তী বিএডিসি কিংবা ব্যক্তি মালিকানাধীন সেচ পাম্পগুলো।

পাম্পচালক আবদুল হামিদ বলেন, এ নদীতে পানি না থাকায় জমিতে সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। দু’এক দিন পর পর পাশেই মেঘনা নদীতে জোয়ার আসলে, তখন এই নদী দিয়ে নালারমত কিছু পরিমাণ পানি বয়ে যায়। তখন সামান্য সেচ দেয়া সম্ভব হলেও আবার নদীতে জোয়ারের অপেক্ষায় থাকতে হয়। ফলে এখানে কৃষি জমিতে সেচে হাহাকার পড়ে গেছে। এ অবস্থায় প্রকৃতিও যেন কৃষকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

একদিকে নদীতে পানি নেই, প্রকৃতিতে তখন চলছে অনাবৃষ্টিজনিত টানা খরা, সেই সাথে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নেমে গেছে। এখানকার গভীর নলকূপের সাহায্যেও সহজে পানি উঠছে না।

অরুয়াইল রাণিদীয়া গ্রামের কৃষক মোঃ শুক্কুর আলী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, পানির অভাবে এলাকার চাহিদা মাফিক ধান পাওয়া যাবে না।

পিএনএস/আনোয়ার



এ ব্যাপারে অরুয়াইল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ মোশারফ হোসেন ভূইঁয়া এই প্রতিবেদককে বলেন, দীর্ঘ বছর যাবত খননের অভাবে এই জনগুরুত্বপূর্ণ চেত্রা নদী এখন শুকিয়ে কাঠ হয়ে পড়েছে।

এতে এখানে কৃষি জমিতে সেচ সঙ্কটে শুধু এলাকার কৃষকেরা নয়, এখানকার অন্তত পাঁচ’শ জেলে পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় তাদের বাপ-দাদার পেশা নদী থেকে মৎস্য আহরন কাজ বন্ধ হয়ে পড়েছে। এই ইউপি চেয়ারম্যান আরো বলেন, এই চেত্রা নদী খননের জন্য সরকারের ‘হিলিপ প্রকল্পের’ এখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরামর্শে আমি ব্যক্তিগত পকেট থেকে দুই লক্ষ টাকা তাদের ফান্ডে জমা দিয়েছি। অথচ সেই টাকার কোনো রশিদ তারা আমাকে দেয়নি। এখানে নদী খননের কোনো উদ্যোগও দেখছি না।

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech