স্বেচ্ছাশ্রমে রোগিদের নমুনা সংগ্রহ করছে ১০ বন্ধু

  

পিএনএস, গাইবান্ধা প্রতিনিধি : ফিরোজ খান একজন মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট। বাংলায় চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ। বাড়ি গাইবান্ধার সাদল্লাপুর উপজেলার কৃঞ্চপুর গ্রামে। তিনি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট পরিষদ গাইবান্ধা জেলা শাখার সভাপতি। দশবছর আগে মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট কোর্স সম্পন্ন করেন। অনেক চেষ্টা করে কোনো চাকরি পাননি। নিজেই একটি থেরাপি সেন্টার দেন। সেটিও করোনার কারণে বন্ধ। কর্মহীন জীবন। বসে থেকে লাভ কি। তিনি সিদ্ধান্ত নেন করোনা থেকে মানুষকে রক্ষায় স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করবেন। কথামত কাজ শুরু। মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট কোর্স সম্পন্ন করা আরো নয়জনকে বেছে নেন। তারা সবাই ফিরোজ খানের বন্ধু। সবমিলিয়ে ১০ জন মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট জীবনের ঝুকি নিয়ে নেমে পড়েন করোনা রোগির নমুনা সংগ্রহের কাজ।

ফিরোজ খান বললেন, গাইবান্ধার মানুষকে করোনা থেকে বাচিয়ে ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য এই উদ্যোগ নিয়েছি। অবশ্য কাজ শুরু করার আগে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে একদিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছি। তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই কাজ চালিয়ে যাব।

গত ২০ এপ্রিল থেকে এসব মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট তিনভাগে ভাগ হয়ে নমুনা সংগ্রহ করছেন। এই ১০ জন দৈনিক ৩০ থেকে ৩৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করছেন। শুরু থেকে এ পর্যন্ত ৮৫৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করেছেন তারা। প্রতিদিন জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কন্টোল রুমে যেসব করোনার সন্দেহভাজনদের ফোন আসে, সেগুলোর তালিকা নিয়ে ছুটে যান তাদের বাড়িতে -বাড়িতে । নমুনা নিয়ে এসে কন্টোল রুমে জমা দেন। সেখান থেকে প্রতিদিন সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ পিসিআর ল্যাবে পাঠানো হয়। এভাবে তারা দুইমাসের বেশি সময় ধরে তিনটি উপজেলায় কাজ করছেন। উপজেলাগুলো হচ্ছে, গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ ও গোবিন্দগঞ্জ। এজন্য তারা কোনো পারিশ্রমিক নেন না। নিজের খরচে যাতায়াত, খাওয়া-দাওয়া করছেন।

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট পরিষদ গাইবান্ধা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবির হোসেন বলেন, এপ্রিল মাসের শেষের দিকে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে একজন মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট করোনা আক্রান্ত হয়ে পড়েন। তখন হাসপাতালের প্যাথলজিষ্ট বিভাগ লকডাউন ঘোষনা করা হয় এবং কর্মচারিদের হোম কোয়ারেন্টাইনে দেওয়া হয়। এসময় আমরা ঝুকি নিয়ে সব নমুনা সংগ্রহের কাজ করেছি। সব করেছি বিনাপারিশ্রমিকে।

মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট হানিফা তুজ জাহান বলেন, করোনা রোগির নমুনা নেওয়া ঝুকিপুর্ণ কাজ। নিজের আক্রান্ত হবার আশঙ্কা থাকে। তারপরও মানুষকে বিপদ থেকে রক্ষার জন্য কাজটি করে যাচ্ছি। মানুষ উপকৃত হলে পরিশ্রম সার্থক হবে। অন্য সাতজন মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট তরিকুল ইসলাম, মিঠু চন্দ্র মোহন্ত, আলমগীর হোসেন, আল-ফারুক, আকতারুজামান সরকার, মো. হানিফ ও মাসুম মাহমুদ একই কথা বলেন।

উপকারভোগি গাইবান্ধা সদর উপজেলার গোপালপুর গ্রামের্র হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে গিয়ে নমুনা দিতে ভয় লাগে। যাতায়াতেরও সমস্যা রয়েছে। বাড়িতে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করায় মানুষ উপকৃত হচ্ছে। নি;। গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার নাকাই গ্রামের এক নারী বলেন, কয়েকদিন ধরে জ্বর কাশিতে ভুগছিলাম। কন্টোল রুমে ফোন করার পর ওরা আমার নমুনা সংগ্রহ করেছে। বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করায় আমার খুব ভালো লেগেছে।

দেশে গত ৮ মার্চ থেকে জাতীয়ভাবে করোনার নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়। গত ২ এপ্রিল নমুনা পরীক্ষা শুরু হয় রংপুর মেডিকেল কলেজের পিসিআর ল্যাবে। পরদিন ৩ এপ্রিল গাইবান্ধা থেকে করোনার নমুনা রংপুরে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিদিন গাইবান্ধার সাতটি উপজেলা থেকে নমুনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে জমা হয়। সেগুলো পরদিন সকালে রংপুরে পাঠানো হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৪০টি নমুনা পাঠানো হয়ে থাকে। শুরু থেকে ২৫জুন পর্যন্ত ২ হাজার ৫৬১ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরমধ্যে ১ হাজার ৭৭১ জনের ফলাফল পাওয়া গেছে। ফলাফলপ্রাপ্তদের মধ্যে ১ হাজার ৫৪৩ জন নেগেটিভ এবং ২২৮ জনের পজেটিভ সনাক্ত হয়। অবশিষ্ট ৭৯০টি নমুনা রংপুর মেডিকেল কলেজ পিসিআর ল্যাবে জমা আছে। নমুনাগুলো পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া ২৫জুন পর্যন্ত গাইবান্ধা জেলায় মৃত্যু হয়েছে ৮ জন, সুস্থ্য হয়েছেন ৫৪ জন এবং হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেনুৎ ৪০৭ জন।

এব্যাপারে গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডাঃ এবিএম আবু হানিফ বলেন, স্বেচ্ছাশ্রমে নমুনা সংগ্রহ করায় স্বাস্থ্য বিভাগের অনেক সহায়তা হয়েছে। যারা স্বেচ্ছাশ্রমে নমুনা সংগ্রহ করছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের তালিকা চেয়েছে। তালিকা পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন