৩৬ শতাংশেই আটকে থাকলো ভোট

  08-06-2024 12:21AM

পিএনএস ডেস্ক: চার ধাপে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটের হার ৩৬ শতাংশেই আটকে গেলো। নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে ভোটারের হার বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নিলেও সেটা খুব একটা কাজে আসেনি। ভোটার বৃদ্ধিসহ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থী মনোনয়ন থেকে বিরত থাকলেও ভোটার বৃদ্ধিতে তা কার্যকর ভূমিকা রাখেনি।

বিগত চারটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটের হার কম পড়েছে। অবশ্য এবারের নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহিংসতার ঘটনা কম ঘটেছে। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে দাবি করেছে ক্ষমতাসীন দলও।

গত ৫ মে চতুর্থ ধাপের ভোট অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কার্যত ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। এই চার ধাপে ৪৪২টি উপজেলায় ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। অবশ্য ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণে স্থগিত হওয়া ২০টি উপজেলায় ৯ জুন ভোট গ্রহণ হবে। এসব উপজেলায় গত ২৯ মে ভোট অনুষ্ঠানের কথা ছিল।

প্রথম ধাপে ভোটের হার কম হওয়ার কারণ হিসেবে ঝড়-বৃষ্টি ও ধান কাটার মৌসুমের কথা উল্লেখ করলেও পরবর্তী ধাপগুলোতেই ভোটের হার প্রায় একই জায়গায় আটকে যায়। প্রথম ধাপের পর ভোটার বাড়াতে মাইকিংসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষমেশ তা কাজে আসেনি। দ্বিতীয় ধাপের ভোটের হার ১ শতাংশ বাড়লেও, তৃতীয় ধাপে তা আবারও কমে যায়। শেষ ধাপে ভোটের হার হয়েছে সব থেকে কম।

ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চার ধাপে গড়ে ভোট পড়েছে ৩৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। ভোটের হার ব্যালটের চেয়ে ইভিএমে আরও কম পড়েছে। এর আগে ২০১৯ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ৪৪৫টি উপজেলা নির্বাচনে গড়ে ভোট পড়ার হার ছিল ৪০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ওই হিসাবে এবার ভোটার উপস্থিতি কমেছে ৪ শতাংশের বেশি। ২০১৯ সালের তুলনায় আগের দুটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটের হার আরও বেশি ছিল।

২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ উপজেলা ভোটে ৬০ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ২০০৯ সালের তৃতীয় উপজেলা ভোটে ৬৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে। এই হিসাবে গত দেড় দশকের মধ্যে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে ভোটের হার এবারই সবচেয়ে কম।

২০০৯ ও ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হয়েছিল নির্দলীয়ভাবে। অন্যান্য স্থানীয় সরকার পরিষদের মতো ২০১৫ সালে উপজেলা পরিষদ আইন সংশোধন করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীক ও মনোনয়নে ভোটের বিধান চালু করে। এর আলোকে ২০১৯ সালে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হয়েছিল দলীয় প্রতীকে। অবশ্য ওই বছর কেবল চেয়ারম্যান পদটিতে মনোনয়ন দিলেও ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন থেকে বিরত ছিল আওয়ামী লীগ।

দলটি এবার তিনটি পদেই মনোনয়ন দেওয়া থেকে বিরত ছিল। অর্থাৎ উপজেলা নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠানের বিধান আওয়ামী লীগ চালু করলেও এক টার্ম নির্বাচনের ব্যবধানে দলটি নিজেরাই প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলো। অবশ্য দলটি আগেই বলেছে, প্রতিদ্বিন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে তারা এবার কাউকে মনোনয়ন দেয়নি।

জানা যায়, চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ভোট পড়ে ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ। এর চার মাস পর অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট পড়লো ৩৬ দশমিক ১৩ শতাংশ।

ফলাফল বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, গত ৮ মে অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের ১৩৯টি উপজেলায় ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পড়েছে। ইভিএমে ভোটের হার ৩১ দশমিক ৩১ শতাংশ, ব্যালটে ৩৭ দশমিক ২২ শতাংশ। সবচেয়ে কম ভোট পড়েছিল সোনাতলা, মীরসরাই ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলায়। সেখানে ভোট পড়েছে ১৭ শতাংশ। সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায়। সেখানে ভোট পড়েছে ৭৩ দশমিক ১ শতাংশ।

২১ মে দ্বিতীয় ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৩৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ব্যালটে অনুষ্ঠিত ১২৯টি উপজেলায় গড় ভোট পড়েছে ৩৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অপরদিকে ইভিএমে অনুষ্ঠিত ২৩টি উপজেলায় গড় ভোট পড়েছে ৩২ দশমিক ১৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায়, ৭৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে রাজশাহীর বাঘমারা উপজেলায়, ১৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

২৯ মে ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদের তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে ৮৭ উপজেলায় ভোট পড়েছে ৩৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে ঠাকুরগাঁয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে লক্ষ্মীপুর সদরে ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

সর্বশেষ ৫ জুন চতুর্থ ধাপে ৬০ উপজেলায় ভোট হয়। এ ধাপে ভোটের হার ৩৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এ ধাপে ইভিএমে ভোটের হার ছিল ২৯ দশমিক ৭০ শতাংশ; আর ব্যালট পেপারে ভোটের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। এ ধাপে সবচেয়ে বেশি ৬০ দশমিক ৬৮ ভোট পড়ে ভোলার মনপুরায়। সবচেয়ে কম ২০ দশমিক ৮৭ শতাংশ ভোট পড়ে নওগাঁ সদর উপজেলায়।

ভোটের হার কমলেও উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থীসংখ্যা গড়ে ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। পাশাপাশি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সংখ্যা কমেছে।

চার ধাপের উপজেলা নির্বাচনে ১৭ জন চেয়ারম্যান, ২৫ জন ভাইস চেয়ারম্যান ও ২৫ জন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মিলিয়ে ৬৭ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৯ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শুধু চেয়ারম্যানই নির্বাচিত হয়েছিলেন ১০৭ জন। এ ছাড়া এবারের নির্বাচনে সহিংসতাও তুলনামূলক কম হয়েছে।

ফলাফল বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, এবারের নির্বাচনে এক হাজার ৮৩৫ জন চেয়ারম্যান প্রার্থীসহ ৫ হাজার ৩৭৬ জন প্রার্থী ছিলেন। এই হিসাবে প্রতিটি উপজেলায় তিনটি পদে গড়ে প্রায় ১২ জন করে লড়েছেন। অপরদিকে ২০১৯ সালের মার্চে চার ধাপে ৪৪৮টি উপজেলায় ভোট হয়। তখন তিন পদে প্রার্থী ছিলেন ৫ হাজার ২৪৮ জন, যা গড়ে ১০ শতাংশেরও কম। এ হিসাবে গত নির্বাচনের চেয়ে ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীসংখ্যা প্রতি উপজেলায় গড়ে দুজন বেশি ছিল।

ভোটার উপস্থিতি কম হলেও সহিংসতা ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় কম হওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে আয়োজক সংস্থা নির্বাচন কমিশন।

চতুর্থ ধাপের ভোট শেষে এক প্রতিক্রিয়ায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, আমরা খুবই সন্তুষ্ট যে নির্বাচনটা শান্তিপূর্ণ হয়েছে। নির্বাচনে ইনসিডেন্ট, বিশেষ করে সহিংসতা হয়নি, সেটা একদিক থেকে স্যাটিসফাইং একটা ইস্যু। কিন্তু এগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ বা পলিটিক্যাল বিশ্লেষণটা আমরা এখন করতে পারবো না।

চতুর্থ ধাপের ভোটের আগের দিন এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা, এর কোনও কিছুই উপজেলা নির্বাচনে দেখা যায়নি। আমার মতে, এ নির্বাচনটি হলো ভোটার নেই, বিরোধী দল নেই এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাও নেই। অতীতের নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতার ফলে বর্তমানে মানুষ নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। আমরা ভোটপাগল জাতি। এখন ভোটখরায় ভুগছি। নির্বাচন নির্বাসনে চলে গেছে।

এবার উপজেলা নির্বাচনে সহিংসতা কম হওয়া ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়াকে সাফল্য মনে করছে ক্ষমতাসীন দল। চতুর্থ ধাপের ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর গত বুধবার (৫ জুন) দলীয় মূল্যায়ন করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, উপজেলা নির্বাচন সংঘাতপূর্ণ হবে, এমন আশঙ্কা করলেও, বাস্তবে তেমনটা হয়নি। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে।

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটের হার প্রশ্নে সাবেক নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, ভোটের হারের যে তথ্য নির্বাচন কমিশন থেকে বলা হয়েছে, আমার মনে হয় প্রকৃত হার তার চেয়েও কম। ইভিএমে এবং ব্যালটের ভোটের হারের ব্যবধান সেটার একটা উদাহরণ বলতে পারেন।

অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সব সময় উৎসব মুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবারের ভোটের হার সেই উৎসবমুখর ও জনগণের অংশগ্রহণের চিত্র প্রকাশ করেনি। আমরা দেখতে পাচ্ছি দেশের মানুষ দিন দিন নির্বাচন বিমুখ হয়ে পড়ছে। এটা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য একটা উদ্বেগের বিষয়।

তিনি আরও বলেন, ক্ষমতাসীন দল হয় তো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আশায় দলীয় মনোনয়ন দেয়নি। এতে আইনের কোনও ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে তারা দলীয় প্রতীকে মনোনয়নের বিধান যুক্ত করে তারাই বিরত থেকেছে, এটাতে দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে।

পিআর

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন