ইসরায়েলি কারাগারের ভয়াবহ নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন ফ্লোটিলা কর্মী

  09-06-2026 12:51PM


পিএনএস ডেস্ক: তারা মাত্রই এলেনিকে আমার পাশে ঠেলে এনে বসিয়েছিল। তাকে জোর করে হাঁটু গেড়ে বসানো হয়েছিল, আর তার মুখ ঠান্ডা ধাতব কনটেইনারের গায়ে চেপে ধরা ছিল। সে আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি কেমন আছো?’

আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘সত্যি বলতে, এর চেয়ে ভালো অবস্থায় ছিলাম।’ এটাই ছিল আমার মাথায় আসা একমাত্র চিন্তা, যেন হাস্যরসের একটি দুর্বল চেষ্টা আমার ওপর ঝুঁকে থাকা প্রহরীদের অদৃশ্য করে দিতে পারে। কিন্তু আমি কিছু বলিনি। আমি শুধু মাথা নাড়লাম। এরপর আমাকে প্রায় ৯০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে এমন একজনের সামনে দাঁড় করানো হলো, যে কম্পিউটারে টাইপ করছিল। আমার সামনে বসা ব্যক্তি একটি মুখোশ পরেছিল, যেমন ছিল অন্যরাও। সে ছিল ডেস্কে বসা এক কমান্ডো; যে আমার নাম, জন্মতারিখ এবং পাসপোর্ট নম্বর জানতে চাইল।

কিন্তু আমার কাছে পাসপোর্ট ছিল না। সেটি অন্যদের সঙ্গে আমাদের পালতোলা নৌকাতেই রয়ে গিয়েছিল। আমাদের অস্ত্রের মুখে আটকে রাখা হয়েছিল, আর কমান্ডোরা খুব স্পষ্ট ভাষায় বলেছিল : কোনো ব্যক্তিগত জিনিস নয়, জুতা নয়, পাসপোর্টও নয়। আমরা ছিলাম গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার অংশ ৫০টিরও বেশি পালতোলা নৌকার একটি বহর, যা গাজার মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং প্রতীকী মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল।

আমরা ইসরায়েলের অবৈধ নৌ অবরোধকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ১৪ মে তুরস্কের মারমারিস থেকে গাজার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম। কিন্তু ১৮ মে বিকেলে সাইপ্রাসের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আমাদের জাহাজ লা সিরেনাকে ইসরায়েলি নৌবাহিনী আটকে দেয়। পরবর্তী দুই দিনে তারা আমাদের সব নৌকায় ওঠে এবং ৪৫টিরও বেশি দেশের ৪২৮ কর্মীকে আটক করে। লা সিরেনায় থাকা আমাদের সাতজনকে বন্দুকের মুখে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নাহশোন নামের একটি ইসরায়েলি সামরিক অবতরণযানে স্থানান্তর করা হয়, যেটিকে এই অভিযানের জন্য ভাসমান কারাগারে রূপান্তর করা হয়েছিল।

‘নাহশোন’ নামটি কখনো কখনো হিব্রু ভাষায় ‘সর্প’ শব্দের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। আবার এটি এক্সোডাস গ্রন্থের একটি চরিত্রের নামও যিনি মিদ্রাশ অনুসারে লোহিত সাগর পেরিয়ে হিব্রু জনগণকে মুক্তির পথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাই আমরা এমন এক মানুষের নামে নামকরণ করা জাহাজে বন্দি হয়ে পড়েছিলাম, যিনি নিজের জনগণের মুক্তির জন্য সাগরে নেমেছিলেন, আর এখন সেই মুক্তির উত্তরাধিকারকে অবরোধের হাতিয়ার বানিয়ে আমাদের বন্দি রাখা হচ্ছিল।

আমার সামনে বসা ডেস্ক-কমান্ডো এসব প্রতীকী বিষয় নিয়ে মোটেও মাথা ঘামাচ্ছিল না। সে শুধু আমার পাসপোর্ট নম্বর জানতে চাইছিল। কিন্তু আমি তা মনে করতে পারিনি, তাই শেষ পর্যন্ত আমার নাম ও জাতীয়তা দিয়েই কাজ চালাতে হয়।

সেই মুহূর্তে পুরো প্রক্রিয়াটিতে এক ধরনের প্রশাসনিক, নিয়মতান্ত্রিক ভাব ছিল। কিন্তু আমি তখন জানতাম না যে, ৫০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার মধ্যে এটাই হবে শেষ মুহূর্ত, যা পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল না।

সাদা দরজা

এর কিছুক্ষণ পর আমাকে একটি ধাতব শিপিং কনটেইনারে ছুড়ে ফেলা হলো, যেটিকে সৈন্যরা যেন একটি ‘প্রসেসিং চেম্বার’-এ পরিণত করেছিল। প্রথমে তাই মনে হয়েছিল। কিন্তু তারপর আমাকে মাটিতে ফেলে দিল। আমি হাঁটু গেড়ে পড়ে যেতেই আমার বাম কানে একটি শক্ত আঘাত লাগে, আর আমি কেবল এক ধরনের গুঞ্জন শুনতে পাই।

আমাকে মারধর করা হচ্ছিল। কয়েক সেকেন্ড পর আমি ডানদিকে থাকা একটি সাদা দরজার দিকে ছিটকে যাচ্ছিলাম, হাঁটু গেড়ে একটি মানব পিনবলের মতো। আমি দরজা ভেদ করে উড়ে গিয়ে একটি চত্বরসদৃশ জায়গায় গিয়ে পড়লাম। প্রথমে নিশ্চয়ই আমার চোখেও সেই আতঙ্কের ছাপ ছিল, যা আমি অন্যদের মুখে দেখেছিলাম, যখন তারা আমার পরে বেরিয়ে আসছিল। আমরা সবাই নিশ্চিত ছিলাম যে, আমরা যেন এই ভয়াবহ জায়গার আরও গভীর কোনো স্তরে প্রবেশ করেছি।

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আমি পেলাম সান্ত্বনামূলক আলিঙ্গন, এক চুমুক পানি, আর সেইসব মানুষের উষ্ণ দৃষ্টি, যারা আমার আগে ওই কনটেইনারের ভেতর দিয়ে এসেছিল। আমরা সবাই মিলে মিনিটের পর মিনিট, তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে কাটিয়েছি। আর সাদা দরজার ওপাশ থেকে আসা শব্দের একঘেয়ে কিন্তু ভয়াবহ কোলাহল শুনেছি।

লাথির শব্দ আর চিৎকারের পর শোনা যেত টেজার বন্দুকের ঝাঁকুনি, তারপর আরও চিৎকার, ধাতব কনটেইনারে আঘাতের শব্দ এবং আবারও চিৎকার। প্রতিটি চক্রের শেষে সাদা দরজাটি হঠাৎ খুলে যেত। তখন দেখা যেত একজন সহযোদ্ধা গড়িয়ে বা খুঁড়িয়ে বেরিয়ে আসছে— কেউ বুক চেপে ধরেছে, কেউ মাথা, কেউ বা নিজের প্যান্ট টেনে ঠিক করছে। আর সবার চোখে একই আতঙ্কের ছাপ।

তাদের মুখ যেন বলছিল : ‘আমি ঠিক কোন নরকের স্তরে এসে পড়লাম?’

আমরা যে চত্বরে এসে পড়েছিলাম, সেটি ছিল পুরোপুরি খোলা। চারপাশে ছয়টি কনটেইনার আয়তাকার বিন্যাসে সাজানো ছিল। দীর্ঘ দুই পাশে দুটি করে মোট চারটি কনটেইনার আমাদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ছিল, আর বাকি দুটি ছোট দুই প্রান্ত গঠন করেছিল এবং সেগুলো বন্ধ ছিল।

একটি কনটেইনার আহতদের জন্য নির্ধারিত ছিল, আরেকটি ইতোমধ্যেই কানায় কানায় পূর্ণ ছিল এবং আরেকটি সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল— সেটি ছিল নির্যাতনের কনটেইনার।

ঠান্ডা থেকে বাঁচতে আমরা চতুর্থ কনটেইনারটির দিকে এগিয়ে গেলাম, যেটি সেই সাদা দরজার ঠিক বিপরীতে ছিল, যেখান থেকে আমাদের সবাইকে যেন ছুড়ে ফেলা হয়েছিল। ধীরে ধীরে আমরা প্রবেশমুখের ঠিক ভেতরে মেঝেতে লাগানো কালো টেপের রেখা অতিক্রম করলাম।

আমাদের আগে যারা সেখানে এসেছিল, তারা সতর্ক করেছিল যে বন্দিকারীরা চায় না আমরা সেই রেখা পার হই। তারা চেয়েছিল আমরা বাইরে থাকি এবং যতটা সম্ভব সাদা দরজা থেকে দূরে গাদাগাদি করে বসে থাকি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা কনটেইনারের ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হলাম।

সেখান থেকে আমি কনটেইনারের দরজায় লাগানো একটি স্টিকার দেখতে পেলাম। “F* Hamas**” — তাতে এমনটাই লেখা ছিল, সঙ্গে ছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার ছবি। উপরে ডেকের চার কোণায় একজন করে প্রহরী দাঁড়িয়ে ছিল। তারা সব সময় তাদের অস্ত্র আমাদের দিকে তাক করে রাখত। পুরো বন্দিজীবনের সময় এই প্রহরীরা কখনো একটি কথাও বলেনি।

নির্যাতনের কনটেইনারের বিপরীতে থাকা প্রহরীর পাশে একটি ধাতব নল বেরিয়ে ছিল। সেটি ওপরে উঠে ইংরেজি L অক্ষরের মতো বাঁক নিয়ে আমাদের দিকে ঝুঁকে ছিল, সরাসরি চত্বরের দিকে নির্দেশ করে।

সারারাত আমাদের কনটেইনারের বিপরীতে থাকা প্রহরীরা স্ট্রোব লাইট জ্বালিয়ে রাখত এবং যেসব সহযোদ্ধা কনটেইনারের মুখের কাছে গাদাগাদি করে বসতে বাধ্য হয়েছিল, তাদের ওপর অস্ত্রের লেজার রশ্মি ফেলত। সাদা দরজার ওপাশ থেকে আসা ধাক্কার শব্দ আর চিৎকার ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলতেই থাকল। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ কনটেইনারের ভেতরে আশ্রয় নিল, আবার কেউ চত্বরে থেকে গেল।

প্রথম দিনের শেষের দিকে কিছু খবর এলো। আমাদের কয়েকজন সহযোদ্ধা কিছু পাখি দেখেছিল, সম্ভবত কবুতর। সেই তথ্যের ভিত্তিতে আমরা যুক্তি দাঁড় করালাম যে, কবুতর স্থলভাগের পাখি এবং সাধারণত তীর থেকে খুব দূরে যায় না। তাই এর মানে নিশ্চয়ই আমরা ভূমির কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।

আরও কিছুক্ষণ পরে ফ্রান্সের এক নারী সহযোদ্ধা আমাদের কনটেইনারে ঢুকলেন। তার মুখে ছিল বিজয়ের আনন্দ আর সতর্কতার মিশ্র অভিব্যক্তি; তিনি হাসি চাপতে পারছিলেন না। শুধু কবুতর নয়; কেউ নাকি আরও দেখেছে, কয়েকজন প্রহরী লাইফ জ্যাকেট পরছে। এখন আর কোনো সন্দেহ ছিল না আমরা স্থলভাগের দিকে এগোচ্ছিলাম।

তিনি পরামর্শ দিলেন, বন্দিকারীদের টের না দিয়ে আমরা যেন নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিই এবং নীরবে প্রস্তুত হতে শুরু করি। যদিও আমাদের অধিকাংশের কাছেই খুব বেশি কিছু ছিল না।

তার বার্তাটি ছিল সহজ: ‘অতিরিক্ত উচ্ছ্বসিত হয়ো না। কিন্তু অন্তত স্বস্তির একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলতে পারো, আর মুখে একটুখানি হাসি ফুটতে দাও।’

আমাদের আতঙ্কিত করার জন্য বন্দিকারীরা বারবার সেই চত্বরে হানা দিত। প্রতিবারই একটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে তাদের আগমন ঘোষণা হতো। দরজা হঠাৎ খুলে যেত, আর স্টান গ্রেনেড এলোমেলোভাবে আমাদের দিকে ছুড়ে মারা হতো; কখনও কোনো ফাঁকা জায়গায়, কখনো কারও শরীরের ওপর। কোথায় পড়ল, তাতে যেন তাদের কোনোই আগ্রহ ছিল না।

ইসরায়েলি নৌ-কমান্ডোরা ঢাল হাতে একটি প্রাচীর তৈরি করত, ঢালের ফাঁক দিয়ে বন্দুকের নল আমাদের দিকে তাক করা থাকত। তারপর আরেকটি স্টান গ্রেনেড, তারপর আরও একটি। আমরা সবাই সাদা দরজা থেকে সবচেয়ে দূরের কোণে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে পড়তাম, নিজেদের নিরাপদ রাখার এবং বন্দিকারীদের থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করতাম।

কিন্তু ফরাসি সহযোদ্ধা যখন বিজয়ের হাসি নিয়ে আমাদের সম্ভাব্য মুক্তির খবর দিয়েছিলেন, তার কিছুক্ষণ পরই দরজাটি আবার খুলে গেল। দুটি স্টান গ্রেনেড বিস্ফোরিত হলো, আর বন্দিকারীরা তাদের স্বাভাবিক ঢালের দেয়াল তৈরি করল। আমরা আবারও আমাদের ছোট্ট কোণে গাদাগাদি করে বসেছিলাম। কিন্তু এবার কিছু একটা ভিন্ন ছিল। বন্দিকারীরা এবার থেকে গেল। প্রথমবারের মতো তারা আমাদের সবাইকে একটি কনটেইনারের ভেতরে ঢুকে যেতে আদেশ দিল।

আমি ভেতরে ভেতরে হাসি থামাতে পারছিলাম না। আমার মনে হচ্ছিল, কিছু একটা বদলে গেছে। কবুতর, লাইফ জ্যাকেট, আমাদের গাদাগাদি করে ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া— সবকিছু একসঙ্গে মিলিয়ে আমি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম— আমরা নিশ্চয়ই বাড়ি ফিরছি।

বন্দিকারীরা আমাদের মধ্যে একজন বা দুজন স্বেচ্ছাসেবক খুঁজছিল আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য। আমাদের চলে যাওয়ার আগে তারা চেয়েছিল জায়গাটি ঝকঝকে করে রাখা হোক। দুজন হাত তুললেন। যদি সুযোগ দেওয়া হতো, আমরা বাকিরাও আনন্দের সঙ্গেই সাহায্য করতাম। কেনই বা করতাম না? আমরা তো অবশেষে বাড়ি ফিরতে যাচ্ছিলাম।

দুজন স্বেচ্ছাসেবক সব আবর্জনা সংগ্রহ করে এক কোণে স্তূপ করে রাখলেন। আর আমরা? আমাদের কনটেইনারের ভেতরে এমনভাবে গাদাগাদি করে রাখা হলো যে শ্বাস নেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ল। আমরা একটি বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থা বের করলাম, পালাক্রমে কনটেইনারের মুখের সামনে গিয়ে দাঁড়ানো, যাতে সবাই কিছুটা তাজা বাতাস পেতে পারে।

কোনো এক সময়, আমরা যখন বৃত্তাকারে হাঁটছিলাম, তখন খেয়ালই করিনি যে বন্দিকারীরা তাদের সেই পরিচিত সাদা দরজা দিয়ে সরে গেছে। তারা যাওয়ার সময় আমাদের জন্য পানি ও খাবার রেখে গিয়েছিল, তবে সেটি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কখনো ১২ লিটার, কখনো ২৪ লিটার পানি— যেখানে আমরা ছিলাম ১৭০ জনেরও বেশি। আর খাবার হিসেবে ছিল সাদা পাউরুটি। কিছু রুটি তখনো জমাটবাঁধা ছিল, আর সেগুলো কখনো কখনো ভেজা ডেকের ওপর ছুড়ে ফেলা হতো।

আমাদের মধ্যে কয়েকজন অনশন করছিল, যা খাবার দেওয়া হচ্ছিল, তা বিবেচনা করলে সেটি খুব একটা খারাপ সিদ্ধান্ত বলেও মনে হতো না। কিন্তু এখন আমাদের অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ল। কারণ এই নতুন রসদ আসার অর্থ ছিল— আমাদের অন্তত আরও একদিন এখানে থাকতে হবে। কাঁধ ঝুলে পড়ল। আর কোনো স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ছিল না। আমাদের মুখের ক্ষীণ হাসিগুলোও মিলিয়ে গেল। তবুও আমি আশাবাদী থাকার চেষ্টা করলাম।

আমি নিজেকে বোঝালাম যে, বন্দিকারীরা হয়তো ইচ্ছা করেই এই সামান্য খাবার ও পানি দিয়েছে, যাতে আমরা ভাবি যে আটকাবস্থা আরও চলবে। তারা চাইছিল আমরা বিশ্বাস করি যে, আমরা এখানেই আটকে আছি। আমি ভেবেছিলাম, এটি তাদের এক ধরনের মানসিক খেলা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল। বন্দিকারীরা সরে গেল। কিন্তু আমি এখনো বিশ্বাস করছিলাম যে সবই অভিনয়। নিশ্চয়ই এ কেবল শেষ কয়েক মুহূর্তের নির্যাতন। নিশ্চয়ই তারা ফিরে আসবে এবং জানাবে যে অন্য কোনো দেশের নৌবাহিনী আমাদের নিতে এসেছে। কিন্তু আরও ঘণ্টা পেরিয়ে গেল। আলো ম্লান হয়ে এলো। অবশেষে স্পষ্ট হয়ে উঠল— আমাদের আরও একটি রাত এখানেই কাটাতে হবে।

এখন আমরা শব্দগুলো চিনতে শিখে গিয়েছিলাম। রাবারের জোডিয়াক নৌকাগুলোকে যখন ক্রেন দিয়ে আবার ডেকে তোলা হতো, সেই গুঞ্জনধ্বনি ছিল নতুন বন্দিদের আগমনের পূর্বাভাস। আর তার পরেই যা আসত, তা ছিল চেনা : চিৎকার। লাথি। ধাতব কনটেইনারে আঘাতের শব্দ। আর নির্যাতনের কনটেইনারের ভেতর থেকে টেজারের গুঞ্জন।

সময় যত গড়াচ্ছিল, মানুষকে নির্যাতনের জন্য ভেতরে তত বেশি সময় ধরে রাখা হচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিল। আর আমাদের কাছে মনে হচ্ছিল, কিছু বিশেষ জাতীয়তার মানুষ; যাদের চেহারা তুর্কি বা আরবদের মতো— তাদের আরও দীর্ঘ সময় সেখানে আটকে রাখা হচ্ছিল। এই পুরো সময় আমরা চেষ্টা করছিলাম বুঝতে যে নাহশোন কোন দিকে যাচ্ছে। আমাদের পালতোলা নৌকার অধিনায়করা আবার সক্রিয় হয়ে উঠলেন।

তারা ব্যাখ্যা করলেন যে, উত্তর গোলার্ধে সূর্য দক্ষিণমুখী উপবৃত্তাকার পথ অনুসরণ করে, তাই দুপুরবেলায় সবচেয়ে ছোট ছায়াটি উত্তর দিক নির্দেশ করে। আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। যে কোনো আশা, যে কোনো দিগন্তবিন্দু আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করলাম। একই সঙ্গে ভয়ও করছিল— হয়তো খুব শিগগিরই আমরা ইসরায়েলের উপকূল দেখতে পাব। বন্দিকারীরা তাদের আগমন অব্যাহত রাখল। প্রতিবারই একটি প্রচণ্ড শব্দের মাধ্যমে।

আমি ইতোমধ্যে স্টান গ্রেনেডের বিস্ফোরণ এবং কোণে গিয়ে গাদাগাদি করে বসে থাকার এই রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু একবার তারা এসে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু করল। তারা আমাদের দিকে রাবার বুলেট ছুড়তে শুরু করল। সেই মুহূর্তে আমাদের যে সামান্য আত্মতুষ্টি বা মানিয়ে নেওয়ার অনুভূতি জন্মেছিল, তা মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। তার জায়গায় ফিরে এলো এক নতুন আশঙ্কা— পরিস্থিতি হয়তো আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই এই দুঃস্বপ্নের কোনো না কোনো শেষ ছিল।

আমাদের মধ্যে ডজন ডজন মানুষের পাঁজর ভেঙে গিয়েছিল, কারও হাড়ে ফাটল ধরেছিল, কারও শরীরে ছিল ক্ষত ও ঘর্ষণের চিহ্ন, আবার কারও শরীরে ছিল টেজারের পোড়া দাগ। কোনো না কোনো সংকেত তো আসার কথা, যা জানিয়ে দেবে যে শিগগিরই আমরা জমে থাকা পাউরুটিকে টয়লেট পেপার হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে পারব। স্যানিটারি প্যাডের জন্য আর চিৎকার করতে হবে না। পানির বোতলের ঢাকনার রিং ও লেবেল দিয়ে তাৎক্ষণিক স্লিং (হাত ঝুলিয়ে রাখার ফিতা) বানাতে হবে না। রক্তপাত বন্ধ করার জন্য অতিরিক্ত কাপড় ছিঁড়ে ব্যান্ডেজ তৈরি করতে হবে না।

এই পর্যায়ে এসে এমনকি বহু ভয়ের ইসরায়েলি উপকূলও আমাদের কাছে এই পরিস্থিতির চেয়ে ভালো বিকল্প বলে মনে হচ্ছিল। অবশেষে বন্দিকারীরা তাদের স্বাভাবিক বিস্ফোরণের শব্দের মধ্য দিয়ে আবার প্রবেশ করল এবং একজন দোভাষী স্বেচ্ছাসেবক চাইল। তারা চিৎকার করে আমাদের বলল, নিজেদের নম্বর অনুযায়ী দশজনের সারিতে দাঁড়াতে। আমরা দ্রুত ও স্নায়ুচাপে ভুগতে ভুগতে তা করলাম। যে কোনো খবর, কোনো খবর না থাকার চেয়ে ভালো। এটাই ছিল আমাদের আশা।

কিন্তু তারপর উত্তর আমেরিকান উচ্চারণে কথা বলা এক কমান্ডো আমাদের সবাইকে হাঁটু গেড়ে মাথা নিচু করে বসতে আদেশ দিল। কেউ মাথা তুললে তাকে গুলি করা হবে—এমন হুমকিও দিল। আমি মনে মনে হিসাব করতে শুরু করলাম; নির্যাতনের কনটেইনারে কয়েক সেকেন্ড কাটানোর বিনিময়ে আমি কত মিনিট হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে রাজি। মনে হচ্ছিল আমরা যেন অনন্তকাল ধরে হাঁটু গেড়ে আছি।

মাথার ওপর একটি ড্রোন ঘুরছিল। লাউডস্পিকারে এক ধরনের জাতীয়তাবাদী সুরের গান বারবার বাজছিল, একই চক্রে, পাগল করে দেওয়ার মতো। নিজের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ এবং সময়ের ধারণা ধরে রাখতে আমি আরেকটি ছোট কৌশল বের করলাম। আমি গানটির সময় মাপতে শুরু করলাম। বারবার। এক মিনিট দশ সেকেন্ড।

অবশেষে যখন আমরা একটি বন্দরের কাছে পৌঁছাতে শুরু করলাম, তখন আমি নিজেকে প্রশ্ন করলাম— কোন শক্তি আমাদের এত কিছু সহ্য করার ক্ষমতা দিয়েছে? আমরা সবাই একই প্রশ্ন ভাবছিলাম। আমাদের শক্তির উৎস ছিল আমাদের পারস্পরিক সংহতি। একটি সহানুভূতিপূর্ণ দৃষ্টি। একটি উষ্ণ অঙ্গভঙ্গি। অন্যের ক্ষত বাঁধার জন্য নিজের কাপড় ছিঁড়ে দেওয়া। হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে কষ্ট হওয়া সহযোদ্ধাদের গোপনে শরীরের ভর দিয়ে সহায়তা করা। ঠান্ডা রাতে অপরিচিত মানুষকে জড়িয়ে ধরে উষ্ণতা ভাগ করে নেওয়া।

কিন্তু এর সঙ্গে আরও একটি উপলব্ধি জড়িত ছিল। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, আমরা আসলে ফিলিস্তিনি বন্দিদের অভিজ্ঞতার খুব সামান্য একটি অংশই ভোগ করেছি। সমুদ্রে বন্দি হিসেবে কাটানো আমাদের প্রায় ৫০ ঘণ্টা, আর তার সঙ্গে স্থলভাগে আরও একটি পূর্ণ দিন— তা কোনোভাবেই ফিলিস্তিনিদের প্রায় ৮০ বছরের দুর্ভোগের সঙ্গে তুলনীয় নয়। আমরা যে অবিচারের প্রতিবাদ করতে যাত্রা করেছিলাম, সেটিই ছিল সেই দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ। তাদের কাছ থেকেই আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। আর সেই প্রক্রিয়ায় আমরা নিজেরাও খুঁজে পেয়েছিলাম আমাদের সুমুদ—অর্থাৎ অবিচলতা ও দৃঢ়তার শক্তি।

অবশেষে গানটি থেমে গেল। আমাদের সারি এগোতে শুরু করল। আমরা জানতাম, আবারও আমাদের নির্যাতনের কনটেইনারের মধ্য দিয়ে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হবে এবং তারপর ইসরায়েলের আশদোদ বন্দরে বের করে দেওয়া হবে। প্রথমদিকে ইসরায়েলে নিয়ে যাওয়ার চিন্তায় আমরা আতঙ্কিত ছিলাম। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর সময় আমাদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা ছিল—যেভাবেই হোক সেই জাহাজ থেকে নেমে আসা। তবুও আমরা সবাই জানতাম, সামনে যা অপেক্ষা করছে তা হয়তো এর চেয়েও ভালো হবে না।

পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় আমাদের আবারও বারবার মারধর করা হলো। কষ্টদায়ক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে বাধ্য করা হলো। বন্দরের অস্থায়ী প্রসেসিং সেন্টারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হলো। আমাদের মধ্যে কাউকে হাঁটু গেড়ে চলতে, কাউকে হামাগুড়ি দিতে বাধ্য করা হলো।

যখন আমাদের আঙুলের ছাপ নেওয়া হচ্ছিল, ছবি তোলা হচ্ছিল এবং একটি বড় তাঁবুর ভেতরে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছিল, তখন দুজন প্রহরী আমাকে একটি ছোট পর্দাঘেরা অংশে টেনে নিয়ে গেল। তাদের একজন আমার দিকে একটি ভাজ করা ছুরি তাক করল। ফলাটি আমার পেটের দিকে ছিল। আমি দ্রুত সরে যাই, ফলে ছুরিটি আমার পেটে না লেগে হাতে আঘাত করে। প্রায় চার সেন্টিমিটার লম্বা একটি ক্ষত তৈরি হয় এবং রক্ত বের হতে শুরু করে।

দৃশ্যমান আঘাত থাকা সত্ত্বেও আমাকে কোনো চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে এথেন্সে চিকিৎসাকর্মীরা এই আঘাত নথিভুক্ত করেছেন এবং এটি চলমান আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হবে। এই হামলার কোনো উসকানি ছিল না। এরপরও সেই প্রহরী আমাকে হয়রানি করতে থাকে এবং জোর করে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হতে বাধ্য করে। মুক্তির পর অন্য বন্দিরা আমাকে জানিয়েছেন যে, ওই পর্দাঘেরা অংশে যাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাদের সবাইকে কাপড় খুলতে বাধ্য করা হয়েছিল। কয়েকজন বলেছেন, প্রহরীরা তাদেরও ছুরি দিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল।

দক্ষিণ ইসরায়েলের কেতজিওত কারাগারে নির্যাতন অব্যাহত ছিল। আমাদের আহত সহযোদ্ধাদের কাউকেই চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। আমাদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটি ছোট কক্ষে ৩০ জনকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল। অক্সিজেনের অভাবে সেখানে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। খাবার দেওয়া হয়নি। পানযোগ্য পানিও দেওয়া হয়নি। তবুও, পুরো আটকাবস্থার মধ্যে জাহাজে থাকা কারাগারের অভিজ্ঞতাই ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। আমাদের এমন এক অন্ধকার বাক্সে আটকে রাখা হয়েছিল, যেখানে আমাদের কোনো অধিকার ছিল না।

লেখকের মতে, এটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালিত জলদস্যুতার এক রূপ, যা সমুদ্রের নতুন নিয়ম তৈরি করতে বদ্ধপরিকর বলে মনে হয়। যেমন, পশ্চিম তীরে ক্রমবর্ধমান বসতি স্থাপন এবং গাজার ওপর ক্রমাগত আগ্রাসনের মাধ্যমে তারা নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে, তেমনি সমুদ্রেও নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দিতে চাইছে।

আমরা বেঁচে ফিরে এসেছি, তাই ইসরায়েলি কারাগার-জাহাজের গল্প বলতে পারছি। আর অন্যদের সতর্ক করতে পারছি— যদি আমরা পদক্ষেপ না নিই, তবে আমরা এর শেষ যাত্রী হব না। সমুদ্রে ও স্থলভাগে ৭২ ঘণ্টা ধরে আমরা যা সহ্য করেছি, ইসরায়েল দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের আটক ও উচ্ছেদের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থাকেই আরও পরিশীলিত করেছে।

ফিলিস্তিনি ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়ানো এখন শুধু সংহতির প্রকাশ নয়— বরং এমন এক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, যা ক্রমাগত তার প্রভাব বিস্তার করছে। যে ভূখণ্ড তার ছিল না, সেখানে; আন্তর্জাতিক জলসীমায়; এবং সেইসব মানুষের শরীরের ওপর, যারা সত্যের সাক্ষী হতে এসেছিল।

এই নিবন্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে মন্তব্য জানতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে নিবন্ধটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে আলজাজিরা জানায়।

সূত্র : আলজাজিরা।


পিএনএস/এমএইউ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন