বিনা ও নামমাত্র শুল্কে ভারত বাংলাদেশ থেকে সব ধরণের ট্রানজিট ও বন্দর সুবিধা পাচ্ছে

  

পিএনএস, এবিসিদ্দিক: ভারত বিনা শুল্ক বা নামমাত্র শুল্কে বাংলাদেশের কাছ থেকে ট্রানজিট ও যোগাযোগ সুবিধা আদায় করে নিলেও বাংলাদেশের দাবি ও ন্যায্য হিস্যা অনুযায়ী গঙ্গা ও তিস্তার পায়নি। গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি হলেও শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশ পানিও ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত। আর তিস্তার পানিতো নেই। আর তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি আদৌ হবে ? এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এছাড়া অভিন্ন সব ক’টি নদীর পানি ভারত বাঁধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েই চলছে। আছে সীমান্ত হত্যা।

ভারতের বাজারে বাংলাদেশী পণ্য ঢুকতে নানা বাধাতো আছেই যদিও বাংলাদেশ ভারতীয় পণ্যের অন্যতম বাজার। ভারত বাংলাদেশের নদী পথ ও নদী বন্দর, সড়ক পথ, রেলপথ, আকাশ পথ, সমুদ্র বন্দর সবই পাচ্ছে। নৌপথে পন্য পরিবহন ও নদী বন্দর সুবিধা আগেই পেয়েছে। এবার দাবি হচ্ছে চট্রগ্রাম, মংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দর প্রাপ্তির। দাবি বাংলাদেশের আকাশ পথ মুক্ত করে দেয়ার। বাংলাদেশের আকাশসীমা ও বিমানবন্দর ব্যবহার করতে ওপেন স্কাই সুবিধা চায় ভারত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরে এ বিষয়ে আলোচনা করতেও কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে ভারত।

ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে আলোচনাও করেছেন। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা গত ২১ নভেম্বর সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের সঙ্গে দেখা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে এভিয়েশনের সেক্টরে কোনো প্রকল্প, প্রস্তাবনা, এজেন্ডা তুলে ধরা হবে কিনা এ বিষয়েও খোঁজ নেন হাইকমিশনার। ভারতীয় হাই কমিশনার ওপেন স্কাই সুবিধা দিতে প্রস্তাব তুলে ধরেন।

অপরদিকে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনে চীন আগ্রহ প্রকাশ করার পর এবার ভারতও একই কথা জানিয়েছে। এমনকি উভয় দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা এ নিয়ে বাংলাদেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করছেন। এ লক্ষে শীর্ষ পর্যায়ের এক প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে বলে জানালেন ভারতের কেন্দ্রীয় সড়ক ও জাহাজ পরিবহন মন্ত্রী নীতিন গড়করি। তিনি দিলি¬তে ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন ‘বাংলাদেশের মাটিতে একটা গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের জন্য আমরা সুযোগের অপেক্ষায় আছি এবং আমরা চাই এই প্রতিবেশি রাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও বৃদ্ধি পাক।

এই লক্ষ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটিকে সেদেশে পাঠানো হবে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তীতে বন্দর তৈরির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে পাশাপাশি বিনিয়োগের প্রস্তাবটিও চূড়ান্ত করা হবে’। গড়করি আরও জানান ‘গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনের বিষয়ে ইতিমধ্যেই দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রালয়ের কর্মকর্তারা প্রাথমিক কথাবার্তা সেরেছেন।

বাংলাদেশের পটুয়াখালিতে ভারতীয় উদ্যোগে প্রস্তাবিত এই পায়রা বন্দর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা মাইলস্টোন হবে বলেও মন্তব্য করেন গড়করি। ২০১৫ সালের মে মাসে ঢাকা সফরে আসেন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ দূত চাই জিঙ। তখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে বৈঠক করে তিনি সাংবাদিকদের কাছে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে পুনরায় আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশের সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের সাথে ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনের (আইওসিএল) স্বাক্ষরিত এ চুক্তির অধীনে ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পেট্রল, ডিজেল ও গ্যাস ভারতের এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে নিয়ে যেতে পারবে। এই সিন্ধান্ত হয়েছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম থেকে ওই সব পণ্য তারা নেবেন ত্রিপুরায়।

প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৮০টি ট্যাংক-লরি যাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি লরিতে থাকবে সাত টন করে জ্বালানি। বলা হয়েছে, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ভূমিধসের কারণে আসাম থেকে ত্রিপুরাগামী সড়ক ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় ত্রিপুরার সাথে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ত্রিপুরা রাজ্যে জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ কারণে মানবিক দিক বিবেচনা করে ভারতকে সাময়িক ট্রানজিট সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে এই পরিবহন কাজ শুরু হয়েছে।

আর এই পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশ প্রতি টনে মাশুল নেবে মাত্র এক টাকা দুই পয়সা। চুক্তি অনুযায়ী ভারতের জ্বালানিবাহী লরিগুলো ডাউকি-তামাবিল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। তারপর বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ১৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছবে ত্রিপুরায়। এই ব্যবস্থা আপাতত সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে চলবে। ত্রিপুরার রাজ্য সরকার জানিয়েছে, ঢাকা সরকার মানবিক কারণে দিল্লি সরকারের এই অনুরোধে সাড়া দিয়েছে। ত্রিপুরা রাজ্য সরকার বলেছে, তারা এই সড়ক এর মধ্যে পর্যবেক্ষণও করেছেন।

ট্যাংক-লরির চালক ও হেলপারদের ভিসাও দেবে বাংলাদেশ। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বলেছেন, ভারী বৃষ্টিতে ত্রিপুরার রাস্তাঘাট খারাপ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পণ্য পরিবহনের এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বৃষ্টিতে বাংলাদেশের রাস্তাঘাটের অবস্থাও করুণ। এর সচিত্র প্রতিবেদন প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রে ছাপা হচ্ছে। ভারতীয় এই বিপুলসংখ্যক ট্যাংক-লরি চলাচলে বাংলাদেশের এসব রাস্তা যানবাহনের জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে।

ভারত দেবে টনপ্রতি এক টাকা দুই পয়সা। আর আমাদের খরচ হবে লাখ লাখ টাকা। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে শুধু আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের নৌ-ট্রানজিট চুক্তি রয়েছে।

বাংলাদেশের ওপর নিয়ে ভারত ও নেপালের মধ্যে সরাসরি রেল ট্রানজিট চালুতে উদ্যোগী হয়েছে ভারত ও নেপাল। কাকড়ভিটা-বাংলাবান্ধা সীমান্তের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের মধ্যে দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল বাণিজ্যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকে ওয়েবসাইটে এই তথ্য জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে একটি রেল লাইন বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেপালকে সংযুক্ত করবে। এই পথে মূলত পণ্যবাহী রেল চলাচল করবে। এই পণ্য পরিবহনের নতুন পথ খোলার ফলে তিন দেশেরই বাণিজ্যিক ক্ষেত্র বেশ কিছুটা প্রসার লাভ করবে।

একদিকে যেমন কাকড়ভিটা-বাংলাবান্ধা সীমান্তের মধ্যে দিয়ে পণ্য পাঠাতে পারবে ভারত অন্য দিকে নেপালের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশ নেপাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে। ভারত সফররত নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সঙ্গে সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এই বিনিময় পত্র সই হয়েছে। উল্লেখ্য ভারতে ৬ দিনের সফরে এসেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী। এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে নেপালের সংবিধানে অভ্যন্তরীণ কিছু গলদের জন্য হওয়া রাজনৈতিক বিক্ষোভের ফলে নেপালের সঙ্গে কিছুদিন আগে ভারতের পেট্রোলিয়াম জাত পণ্য পাঠানো নিয়ে সমস্যা হয়েছিল।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি জানিয়েছেন বর্তমানে সেই সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি সমাপ্ত হয়েছে। এই পণ্য পরিবহনের পথের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বিশাখাপত্তনম বন্দর পৌঁছানো অনেকটাই সহজ হবে। নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফরের সময় দুই দেশের জমি ব্যবহার করে তৃতীয় দেশের বাণিজ্যের বিষ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিশাল এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ভারত সরকারের নানা বাধার কারণে বাংলাদেশি পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশ করতে পারে না। ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অশুল্ক বাধাগুলো দূর করার আহ্বান জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশি পণ্য ও যানবাহনের মান নিয়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট (বিএসটিআই) ও বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) দেয়া মান সনদের স্বীকৃতি দিতে ভারতের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে এনবিআর। ভারতের বাজারে বাংলাদেশি অধিকাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেলেও বেশ কয়েকটি অশুল্ক বাধার কারণে সেখানে রপ্তানি বাড়ানো যাচ্ছে না।

এসব বাধার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ভারত কর্তৃক বিএসটিআই ও বিআরটিএ'র মান সনদ গ্রহণ না করা। এছাড়াও নানা অজুহাত আছেই। মূল কথা হলো ভারতে তাদের স্বার্থে বাংলাদেশের কাছ থেকে যা যা পাওয়ার সবই পেয়ে যাচ্ছে।

অপরদিকে বাংলাদেশের আইনগত প্রাপ্তিগুলোর বিষয়ে ভারত নিরব। যেমন অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া আইনগত অধিকার। সেই অধিকার থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত। আর ভারতকে আকাশ, নৌ, সড়ক, রেলপথ সহ সবই খুলে দেয়া হচ্ছে। এতে ভবিষৎ বাংলাদেশের জন্য হুমকীর কারণ হতে পারে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।

পিএনএস/মো: শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech