এই বাজেটকে কিভাবে দেখছেন ড. সালেহউদ্দিন ও ড. জাহিদ হোসেন

  

পিএনএস ডেস্ক: আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে অতীতের ধারাবাহিকতা রেখে কালো টাকাকে আবারো সাদা করার প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলেন, রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা অর্জন করতে হলে রাজস্ব আদায়কে জোরদার করতে হবে। তিন কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ২০৩০ সালের মধ্যে। কিন্তু এটা কোন খাতে, কিভাবে সৃষ্টি হবে তা পরিষ্কার নয়।

ড. সালেহউদ্দিন আহমদ
নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেটে নতুন কিছুই নেই বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী অতীতের বাজেটের ধারাবাহিকতা রেখেছেন। কিছু কিছু পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেছেন। যেমন, তিন কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ২০৩০ সালের মধ্যে। কিন্তু এটা কোন খাতে, কিভাবে সৃষ্টি হবে তা পরিষ্কার করেননি।

তার মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে বিশাল আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার সিংহভাগই ধরা হয়েছে এনবিআর থেকে। সরকার ভ্যাট আদায় জোরদার করবে। চলতি অর্থবছরই তো রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রায় বেশ ঘাটতি রয়েছে। তার উপর এবার আরো বড় আকারের আদায়ের পরিকল্পনা। এটা রাতারাতি করা সম্ভব না। বর্তমানে যে ব্যবস্থাপনা রয়েছে তাতে ঘাটতি বাড়বে।
সালেহউদ্দিন আহমদ বলেন, ঘাটতি মোকাবেলায় সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে বিশাল অংকের ঋণ নিয়ে তা পূরণ করবে। এটা করা হলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। দেশের ব্যাংকিং খাতের উপর চাপ বাড়বে।

তিনি বলেন, সুদ পরিশোধে বিরাট অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখাটা অন্যান্য দেশের তুলনায় তেমন বড় কিছু না। সরকারের উচিত আয়করসহ অন্যান্য কর আদায়ের প্রতি নজর দেয়া। কর আদায়ের ব্যবস্থাপনাকে আরো আধুনিক ও উন্নত করতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। আয় বাড়ানো গেলে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকিং খাতের উপর নির্ভরশীলতা কমে আসবে।

সাবেক গভর্নর বলেন, আগামী অর্থবছর ৮.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে সরকারকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে ৩২ থেকে ৩৪ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। আর বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে অবশ্যই তার জন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলেই বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।

কালো টাকা সাদা করার পুনরায় সুযোগ দেয়াকে তিনি বলেন, এই কালো টাকা আমাদের অর্থনীতিতে অনেক বেশি শক্তিশালী। যার কারণে প্রতি বছরই সরকার সাদা করার সুযোগ দিয়ে আসছে। কতোটা ফলপ্রসূ হচ্ছে তা বলা কঠিন। তবে সরকারের উচিত এটা বড় আকারের বিশেষ করে ৩০ শতাংশ কর দিয়ে একবারই করার সুযোগ দেয়া। এই সুযোগ দিয়ে বলা উচিত এরপর আর কোনো সুযোগ দেয়া হবে না। সরকার তখন কঠোরভাবে দেখবে।

ড. জাহিদ হোসেন
প্রস্তাবিত বাজেটটি বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট বলে মনে করছেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন স্থিতিশীলতা, বৈষম্য নিরসন, প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হয়, তাহলে বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করতে হবে। বাজেট বক্তৃতায় টার্গেট ও বরাদ্দ আছে। তবে কিছু প্রশ্নও রয়েছে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ১৯ শতাংশের বেশি ধরা হয়েছে। আর ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১৮ শতাংশ ধরা হয়েছে। আগের বাজেটের তুলনায় এবার বেশি অর্জনযোগ্য। কারণ বিশ্বাসযোগ্যতার দিক থেকে লক্ষ্যমাত্রা উচ্চাভিলাসী নয়। ৫ শতাংশ ঘাটতি আমরা কখনোই অর্জন করতে পারিনি। ৪ থেকে ৪.৯ শতাংশের মধ্যে অর্জন করতে পেরেছি। এবার সাড়ে ৪ শতাংশ অর্জন ছাড়ালে অবাক হবো। তিনি বলেন, আমরা সঞ্চয়পত্রে নির্ভরশীলতা কমাতে চাই। এটার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপ দুবছর আগে নিলে স্বাগতম জানাতাম। কিন্তু এমন সময় নেয়া হয়েছে যখন ব্যাংকিং খাতে তারল্য সঙ্কট। কারণ খেলাপী ঋণ বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনছে। ফলে এমন সময় ঘাটতি মোকাবেলায় সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে। এতে আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়বে। তবে খেলাপী ঋণ আদায় বৃদ্ধি করতে পারলে সেটা সমস্যা হতো না। প্রয়োজন ব্যাংকিং খাতের সংস্কার।

কালো টাকাকে ১০ শতাংশ কর দিয়ে সাদা করার সুযোগ দিয়ে এটাকে প্রশ্রয় দেয়া হলো বলে তিনি মনে করছেন। তিনি বলেন, আগে ১০ শতাংশ করের সাথেও পেনাল্টির প্রথা ছিল। কিন্তু এবার সেটিও রাখা হয়নি। এখানে সাদা টাকার মানুষ দেখবে কালো টাকার মালিকরা কম কর দিয়ে তা হালাল করে নিচ্ছে, তারাও সেই পথ ধরবে। রাজস্ব আদায়ে আমাদেরকে করদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা।

তার মতে, ব্যয়ের বরাদ্দ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। আমাদের শিক্ষা খাতে যে ব্যয় বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কম। আমাদের প্রধান প্রশ্ন হলো প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অনেক সময় লেগে যাচ্ছে। ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের ক্রয় প্রক্রিয়া, প্রকল্প ডিজাইন, মনিটরিংয়ে সংস্কার আনা প্রয়োজন।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech