মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কা

  

পিএনএস ডেস্ক: ইতিহাসের দিকে তাকালে বরাবরই দেখা যায় মিয়ানমারের রাজনীতি যেন ‘রোলার কোস্টার’ । দীর্ঘ সামরিক শাসনের ইতি ঘটিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সরকার গঠন করলেও প্রকৃতপক্ষে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সেনাবাহিনী। সম্প্রতি নতুন করে সৃষ্ট রোহিঙ্গা ইস্যু তারই প্রমাণ। রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে আবারও দেশটিতে সামরিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের একটি পক্ষ বলছেন, সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতীয় নেতৃত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন দেশটির জেনারেলরা। এমনকি এনএলডির কয়েকজন নেতাও এ বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে রাখাইনে অস্থিতিশিলতাকে পুঁজি করে দেশটির সেনা সমর্থিত বিরোধী দল সামরিক অভ্যুত্থানের চাপ সৃষ্টি করছে সেনাবাহিনীর ওপর।

কেউ কেউ বলছেন বর্তমানে ১৯৫৮ সালের মতোই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ওই সময় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইউ নু জেনারেল নে উইনকে ক্ষমতা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এবারও কি সেরকম কিছুই ঘটছে?

ওই সময় ক্ষমতাসীন এন্টি ফ্যাসিস্ট পিপলস ফ্রিডম লিগের মধ্যে তীব্র মতবিরোধের কারণে দেশটির সেনাবাহিনীরে সঙ্গে সমঝোতায় বাধ্য হয়েছিলেন ইউ নু। এরপর দেশটির সেনাপ্রধান ক্ষমতা দখল করেন। কথা ছিল শিগগিরই তিনি স্বচ্ছ নির্বাচন দেবেন। ১৯৬০ সালে নির্বাচনও হয়েছিল। জয়লাভ করে ইউ নু সরকার গঠন করেছিলেন। কিন্তু দু বছর পর আবারও সামরিক অভ্যুত্থান। ইউ নু ও তার মন্ত্রীসভাকে কারাবন্দি করা হয়।

বিশ্লেষকদের আরেকটি পক্ষ বলছেন, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জরুরি অবস্থা জারি করে দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে সেনাবাহিনী। তবে সেটা সময়সাপেক্ষ। শুধু মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট থিন কিয়াও জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন। থিন কিয়াও অং সান সু চির ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।

দেশটির বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী দেশটির সংসদের ২৫ শতাংশ আসন সেনাবাহিনীর দখলে। এছাড়া প্রতিরক্ষা বাহিনী, সীমান্ত ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সেনাবাহিনীরি নিয়ন্ত্রণে।

দেশটির সংবিধান মতে সরকারের ডি ফ্যাক্টো নেতা অং সান সু চির চেয়েও বেশি ক্ষমতা দেশটির সেনাপ্রধানের। নিজ ক্ষমতাবলেই যে কোনো সময় সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের যাক দিতে পারেন সেনাপ্রধান। চাইলেও সেনাবাহিনীর ক্ষমতার লাগাম টানার ক্ষমতা সু চির নেই। তাই রাখাইনে গত ২৫ আগস্ট নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের’ কথিত হামলার পরপরই ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন্স’-এর অনুমতি দেয়া হয় সেনাবাহিনীকে।

সমালোচকরা বলছেন, সুচিকে আরও দুর্বল ও রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ শুরু করতে সেটি ছিল সামরিক বাহিনীর নীলনকশার একটি অংশ। এরপর সেখানে সেনাবাহিনী পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করে চলেছে। খোদ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র বুধবার স্বীকার করেছেন যে, রাখাইনের ৪৭১টি রোহিঙ্গা গ্রামের ১৭৬টি তথা ৪০ ভাগ গ্রাম এখন জনশূন্য। গ্রামগুলোতে রোহিঙ্গাদের বাস ছিল।

টাইম ম্যাগাজিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশটির ক্যাথলিক ধর্মগুরু কার্ডিনাল চার্লস মং বো। টাইম ম্যাগাজিনকে বো বলেন, সুচির অবস্থান নড়বড়ে। মিয়ানমারে গণতন্ত্র এখনও ভঙ্গুর। তিনি বলেন, সুচি ২০১৫ সালের নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেলেও এখন ‘দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছেন’। সেনাশাসন ফেরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ‘অন্ধকার বাহিনী (ডার্ক ফোর্স)’।

সম্প্রতি রোহিঙ্গা নির্যাতন শুরু পর থেকে শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। প্রশ্ন তিনি কি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দাবি মেনে রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের উদ্যোগ নেবেন? সেটা কি সম্ভব? নাকি দেশের বিরোধী দলগুলোর দাবি মেনে নেবেন?

এক্ষেত্রে তিনি যদি আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দিতে ১৯৮২ সালের নাগরিক আইনে পরিবর্তন এনে রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেন তবে তাতে দেশের ভেতরে তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়তে পারে এবং ফলস্বরূপ দেশটিতে আবারও সামরিক শাসন ফিরে আসতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে সেনা অভিযানের নিন্দা জানানোর জন্য সুচির ওপর যে চাপ আন্তর্জাতিক দিচ্ছে তাতে তিনি কর্ণপাত করছেন না। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাকে ফের ক্ষমতাচ্যুত করা হতে পারে। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন মূলত সু চিকে বিপদে ফেলারও একটি ফাঁদ।



পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech