ফেসবুকে মিয়ানমার সেনাদের বীভৎসতার ছবি

  

পিএনএস ডেস্ক: চার রোহিঙ্গা যুবতীকে বিবস্ত্র অবস্থায় হাত ও পা বেঁধে বসিয়ে রাখা হয়েছে। পেছনে মিয়ানমারের সেনা সদস্যরা অস্ত্র তাক করে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরেই গলায় ছুরি বসিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করা হয় ওই চার যুবতীর। সে দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করা হয়। আরেক দৃশ্যে দেখা যায়, জীবন্ত এক রোহিঙ্গার দেহে ছুরি দিয়ে চামড়া কাটা হচ্ছে। সবশেষে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে উপর্যুপরি কুপিয়ে মাথা কাটা হচ্ছে। অপর এক দৃশ্যে রয়েছে- লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন বয়সী কয়েক রোহিঙ্গা। পেছনে মিয়ানমারের সেনা সদস্য। একজন করে রোহিঙ্গা সামনে রাখা একটি ইটের ওপর ডান হাত রাখছে। আর এক সেনা সদস্য তিন দফায় তার ডান হাতের কব্জি পর্যন্ত কাটছে। একে একে বেশ কয়েকজনের হাত এভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়। কেউ হাত দিতে না চাইলে তাকে পেছন থেকে বেয়নেট দিয়ে খোঁচানো হচ্ছে। এরকম শত শত দৃশ্য এখন ফেসবুকে ভাইরাল। এসব দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত ফেসবুক ব্যবহারকারীরা।

৪৫ বছরের রীনা বেগমের দীর্ঘদিনের অভ্যাস ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফেসবুকে চোখ বুলানো। গত ১৫ দিন ধরে তিনি সে অভ্যাস ত্যাগ করেছেন। কারণ হিসেবে জানান, এত বীভৎসতা আসলে সহ্য করা যায় না। এসব দৃশ্য দেখে অনেক রাত ঘুমাতে পারি নাই। ঘুম হলেও স্বপ্নের মধ্যেও ওইসব বীভৎসতায় আতকে ওঠি। একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন সরকারি কর্মকর্তা মাহাবুব হোসেন। তিনি বলেন, মাঝে মাঝে ফেসবুকে কিছু বীভৎসতা দেখেছি। কিন্তু মিয়ানমারের ঘটনায় ধারাবাহিকভাবে যেসব বীভৎসতা ও নির্মমতার চিত্র দেখছি তা আগে কখনও দেখিনি। আপাতত ফেসবুক দেখা বন্ধ রেখেছেন বলে জানান তিনি।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক নারী কর্মকর্তা জানান, আমার স্কুলপড়ুয়া মেয়ে আমার ফেসবুক আইডি দেখতো। কয়েকটি বীভৎসতার ভিডিও দেখে টানা তিনদিন সে জ্বরে ভুগেছে। রাতে ঘুমাতে গেলে চিৎকার করে ওঠে। লাইট ছাড়া ঘুমানোর অভ্যাস থাকলেও এখন সে লাইট জ্বালিয়ে রাখে। মিরপুরের গৃহিণী দিলু রহমান বলেন, যতটুকু সহ্য করতে পারি ততটুকু দেখি। এরপর আতঙ্কে দেখা থেকে বিরত থাকি। সংশ্লিষ্টরা জানান, এরকম উদাহরণ রয়েছে অসংখ্য। অনেককে মানসিক চিকিৎসকেরও পরামর্শ নিতে হয়েছে। কয়েকজন মানসিক চিকিৎসক জানান, বেশ কিছু রোগী তারা পেয়েছেন যারা ফেসবুকে বীভৎসতার ছবি দেখে আতঙ্কিত। তাদেরকে বলা হয়েছে, এসব ছবি দেখা থেকে নিজেদের বিরত রাখতে হবে। অনেকে ভয় পান তারপরও ভিডিওগুলি দেখেন। এসব রোগী দীর্ঘমেয়াদে মানসিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ প্রসঙ্গে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাবিবুর রহমান জানান, বীভৎস ভিডিও ও ছবি দেখে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। তাদের মধ্যে মৃত্যুভয় ভর করছে। ভাইরাল হওয়া এসব দেখে অনেকের মধ্যে ভায়োলেন্সের ইচ্ছা জাগতে পারে। সবমিলিয়ে এটা মানুষের জীবনে দীর্ঘমেয়াদে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর সচিব ও মুখপাত্র সারোয়ার আলম জানান, গত কয়েক দিন আমরা ফেসবুক পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, এ ধরনের বীভৎসতার শতাধিক ছবি রীতিমত ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী ওইসব ভিডিও ও ছবি শেয়ার করেছেন। অনেকে নানা মন্তব্যও করেছেন।

সবমিলিয়ে বীভৎসতার বিষয়গুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, ফেসবুকের ওপর সরাসরি আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এসব নিয়ে কাজ করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এনটিএমসি, সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড কাউন্টার টেররিজম। তারা যদি আমাদের কনটেন্ট বন্ধ করার অনুরোধ করে তাহলে উদ্যোগ নিতে পারি। এদিকে বিটিআরসিতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভাইরাল হওয়া বীভৎস ছবি ও ভিডিও সরাতে এখন পর্যন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা তথ্য মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে কোনো অনুরোধ পাওয়া যায়নি। বিটিআরসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য কিছুটা স্পর্শকাতরও।

মিয়ানমারের ঘটে যাওয়া এসব ছবি ও ভিডিওর কনটেন্ট বা ইউআরএল বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হলে অনেকে আবার সমালোচনা করবে। তারা হয়তো অভিযোগ করে বলবে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নির্যাতন আমরা লুকাতে চাচ্ছি। আবার কিছু ভিডিও’র সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর তথ্য সম্পর্কে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে প্রায় ২ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছেন। দেশে যত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহৃত হচ্ছে এর মধ্যে ৯৯ শতাংশই ফেসবুক। বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে ১ কোটি ৭০ লাখ পুরুষ আর ৬৩ লাখ নারী। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ৯৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে মোবাইল ডিভাইস থেকে ২ কোটি ২৬ লাখ মানুষ ফেসবুকে ঢুকছেন।


পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech