হামলা করা খুনির কী শাস্তি হবে?

  

পিএনএস ডেস্ক : শুক্রবার(১৫ মার্চ) নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় অর্ধশতাধিক মুসল্লি মারা যান। হামলাকারী ২৮ বছর বয়সী ব্রেনটন টেরেন্ট একজন কট্টর শেতাঙ্গ বর্ণবাদী। সে মুসলমান ও অভিবাসী বিদ্বেষী। ২০১৭ সালে সুইডেনের স্টকহোমে সন্ত্রাসী হামলায় ১১ বছর বয়সী শিশু এব্বা অকারলান্ডের নিহত হওয়ার ঘটনার শোধ নিতে এ হামলাটি চালানো হয়েছে বলে সে জানিয়েছে।

অর্ধশত মানুষ হত্যার ঘটনায় হামলাকারীর কী শাস্তি হতে পারে সে বিষয়ে আইনজীবী ও কৌসুলীদের মধ্যে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশাল সংখ্যক মানুষকে হত্যার কারণে তার সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যৃদণ্ড) হওয়া উচিৎ বলে মনে করেন অনেক আইনজ্ঞ। কিন্তু নিউজিল্যান্ডে মৃত্যুদণ্ডের বিধান না থাকায় ব্রেনটনের সাজা সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

নিউজিল্যান্ডে মৃত্যুদণ্ডের বিধান তুলে দেয়া হয় ১৯৮৯ সালে। দেশটিতে সবশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় যাকে তার নাম ওয়াল্টার বোল্টন। স্ত্রীকে বিষপানে হত্যার দায়ে ১৯৫৭ সালে তাকে এই দণ্ড দেয়া হয়। এর আগ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডে ৮৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এখানে যত বড় হত্যাকাণ্ডই হোক তার শাস্তি সাধারণত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। সেই কারাদণ্ডের মেয়াদ কত হবে – ‘সেনটেনসিং অ্যাক্টে’র মাধ্যমে তা ঠিক করেন বিচারক।

হত্যার জন্য দুই ধরনের সাজা হয়ে থাকে। দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ড ও স্বল্পমেয়াদে কারাদন্ড। দীর্ঘ মেয়াদে ৩০ বছর সাজা হয়েছে উইলিয়াম ডোয়েন বেল নামে একজনের, তিনজনকে হত্যার দায়ে। এরপর অনেকের সাজা হয়েছে ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। আর স্বল্পমেয়াদে সাজা হলে প্যারেল সিস্টেমে সে সাজা ভোগ করতে হয়। যে সব অপরাধারীর অতীত ক্রিমিনাল রেকর্ড নাই, তাদের নির্দিষ্ট একটি সময় কারাগারে রাখার পর ছেড়েও দেয়া হয়। অবশ্য তাদের হাতে ইলেকট্রনিক ডিভাইস লাগানো থাকে।

বাংলাদেশ সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যরিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, আমাদের আইনে হামলাকারীর ফাঁসি ছাড়া অন্যকোনো সাজা হতে পারে না। তবে নিউজিল্যান্ডে মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে কি না তা আমার জানা নেই। এই হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাজা হওয়া উচিৎ বলেই আমি মনে করি।

যে কারণে হামলা করেন ব্রেনটন টেরেন্ট হামলাকারীর মতে, মুসলমানরা ইউরোপের দেশগুলো দখল করে নিচ্ছে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করতে এবং ইউরোপে ইসলামপন্থীদের সন্ত্রাসী হামলার প্রতিশোধ নিতে সে এ হামলা চালিয়েছে।

শুক্রবার হামলার আগে নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে ৭৩ পৃষ্ঠার কথিত মেনিফেস্টো (ঘটনার কারণ) প্রকাশ করে ব্রেনটন। এতে সে মুসলমানদের দাস, সন্ত্রাসী ও দখলদার হিসেবে উল্লেখ করে।
২০১৭ সালে সুইডেনের স্টকহোমে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় ১১ বছর বয়সী শিশু এব্বা অকারলান্ডের নিহত হয়। উজবেকিস্তানের এক অভিবাসী ওই হামলা চালিয়েছিল।

তার ভাষ্য, ‘স্টকহোমের ওই ঘটনাটিই আমাকে প্রথম এ ধরনের হামলার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, বিশেষ করে ওই ১১ বছর বয়সী মেয়েটির মৃত্যু। এব্বার মৃত্যু হয়েছে ‘দখলদার’দের হাতে... আমি এ ধরনের হামলা এড়িয়ে যেতে পারি না।’

অভিবাসী ও মুসলমানদের প্রতি চরম ঘৃণা প্রকাশ করে সে বলে, ইউরোপ থেকে অভিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করে ‘মাতৃভূমি’ পুনরুদ্ধার করা তার লক্ষ্য। অন্য ধর্ম থেকে মুসলমানে পরিণত হওয়াকে সে রক্তের সঙ্গে বেইমানি বলে উল্লেখ করে।

ব্রেনটন লিখেছে, আমাদের ভূখণ্ড কখনোই অনুপ্রবেশকারীদের ভূখণ্ড হবে না। আমাদের মাতৃভূমি আমাদের এবং যতদিন পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গরা জীবিত থাকবে, ততদিন তারা আমাদের ভূখণ্ড দখল করতে পারবে না। তারা কখনোই আমাদের লোকদের জায়গা দখল করতে পারবে না।

মেনিফেস্টোতে ব্রেনটন টেরেন্ট আরও বলে, ২০১১ সালে নরওয়ের অসলোতে ৭৭ জনকে হত্যাকারী আন্ডারস ব্রেইভিকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সে এ সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে।

এছাড়া সে নিজেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক বলেও দাবি করে। এ হামলার ঘটনায় সে ট্রাম্পের উগ্র সমর্থক ক্যানডিস ওউনসের কাছ থেকেও অনুপ্রাণিত হয়েছে।

ব্রেনটন তার টুইটার অ্যাকাউন্টের হেডার ফটো হিসেবে যে ছবি দিয়েছে, সেখানে ২০১৬ সালে ফ্রান্সের নিসে শহরে বাস্তিল ডে উদযাপন অনুষ্ঠানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত একজনের ছবি দেখা যায়। সেদিন জনতার ওপর ট্রাক চালিয়ে দেয়ার ঘটনায় ৮৪ জনের প্রাণহানি হয়েছিল।

ক্রাইস্টচার্চের আল নুর মসজিদে প্রাণঘাতী হামলা চালাতে যখন গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী ব্রেনটন তখন লোক গান ও সামরিক সঙ্গীত শুনছিল। এরপর একটি সরু গলিতে গাড়িটি পার্ক করে রেখে অস্ত্র নিয়ে মসজিদের দিকে এগিয়ে যায় সে।

তার গাড়ি থেকে অন্তত ৬টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। যে অস্ত্র-সরঞ্জাম নিয়ে ব্রেনটন টেরেন্ট ও তার সহযোগীরা হামলা চালিয়েছে সেখানে মুসলিমদের ওপর বিগত সাম্প্রদায়িক হামলার তথ্য তুলে ধরে এ ধরনের হামলা চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহমূলক বিভিন্ন শব্দ-বাক্য দেখা যায়। হামলায় জড়িত সন্দেহে এক নারীসহ চারজনকে আটক করলেও ব্রেনটনকে আটক করতে পারেনি পুলিশ।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল




 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech