মোদির নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি

  


পিএনএস ডেস্ক: ভারতে লোকসভা নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ‘নতুন সরকারের কর্মসূচি’ নির্ধারণ করতে গতকাল শুক্রবার তিনি বিদায়ী মন্ত্রিসভার সদস্য এবং দল ও জোট নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। মূলত ঝিমিয়ে পড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বেকারত্ব হ্রাস, দেশের ৭০ শতাংশ পরিবারের নির্ভরশীলতার জায়গা কৃষি খাতের উন্নয়ন লক্ষ্যে নতুন করে কর্মসূচি নিতে চায় মোদির দ্বিতীয় মেয়াদের সরকার। এ তিনটি সমস্যা নিয়ে শেষের দিকে এসে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল সরকার। নতুন যাত্রায় অর্থ মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে পরিবর্তনের আভাসও মিলেছে।

অন্যদিকে নতুন সরকার গঠনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নরেন্দ্র মোদি বিদায়ী মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্টের দপ্তরে গিয়ে পদত্যাগ করেন এবং ১৬তম লোকসভা ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানান। প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দ পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন এবং নতুন সরকার গঠন না করা পর্যন্ত মোদিকে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান। এ সময় লোকসভা ভেঙে দেওয়া সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার সুপারিশ প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দেন মোদি। এর আগে সন্ধ্যার মন্ত্রিসভার বৈঠকে লোকসভা ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ তৈরি করা হয়। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন সরকারের দায়িত্ব নিতে আগামী ৩০ মে মোদি ও তাঁর নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিতে পারে। তবে সরকারিভাবে এর তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। এবারের শপথগ্রহণের আয়োজন ২০১৪ সালের শপথ অনুষ্ঠানের চেয়েও বড় হবে বলে জানা গেছে। গতবার পাকিস্তানের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফসহ সার্ক নেতাদের দাওয়াত দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন। এবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁসহ অনেক বিশ্বনেতা উপস্থিত থাকতে পারেন বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে এ প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে। দল ও জোট নেতা এবং মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগে গতকাল ব্যস্ত দিন কাটান প্রধানমন্ত্রী মোদি। তিনি ও তাঁর দলের সভাপতি অমিত শাহ বিজেপির প্রবীণ নেতা এল কে আদভানি ও মুরলি মনোহর যোশির সঙ্গে দেখা করেন এবং তাঁদের আশীর্বাদ গ্রহণ করেন।

চূড়ান্ত ফল : নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে, সরকার গঠনে ২৮২ আসন প্রয়োজন হলেও নির্বাচনে লোকসভার ৫৪২টি আসনের মধ্যে নরেন্দ্র মোদির বিজেপি একাই ৩০৩টি আসনে জয়লাভ করেছে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স মোট আসন পেয়েছে ৩৫০টি। বুথফেরত জরিপেও এমন আভাস দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এককভাবে পেয়েছে ৫২টি আসন এবং তাদের নেতৃত্বাধীন জোট ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স পেয়েছে সর্বমোট ৯২টি আসন। গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এককভাবে পেয়েছিণ ২৮২ এবং কংগ্রেস এককভাবে পেয়েছিল ৪৪টি আসন। এ ছাড়া ডিএমকে ২৩টি, তৃণমূল ২২টি, রিথু কংগ্রেস ২২টি, জনতা দল (ইউনাইডেট) ১৬টি, বিজু জনতা দল ১২টি, বহুজন সমাজবাদী পার্টি ১০টি, তেলেঙ্গনা রাষ্ট্র সমিতি ৯টি, সমাজবাদী পার্টি ও লোক জনশক্তি ছয়টি করে আসন পায়।

এ ছাড়া অন্য দলগুলোর মধ্যে আম আদমি পার্টি একটি, এজেএসইউ পার্টি একটি, এডিএমকে একটি, অল ইন্ডিয়া মজলিস ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন দুটি, অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট একটি, কমিউনিস্ট পার্টি ইন্ডিয়া (সিপিআই) দুটি, কমিউনিস্ট পার্টি ইন্ডিয়া (সিপিএম) তিনটি, ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ তিনটি, জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স তিনটি, জনতা দল (সেক্যুলার) একটি, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মার্চ একটি, কেরালা কংগ্রেস (এম) একটি, মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট একটি, নাগা পিপলস পার্টি একটি, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি একটি, ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি পাঁচটি, ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি একটি, রেভল্যুশনারি সোস্যালিস্ট পার্টি একটি, সমাজবাদী পার্টি পাঁচটি, শিরোমণি আকালি দল দুটি, সিকিম ক্রান্তিকারী মোর্চ একটি, তেলেগু দেশাম তিনটি এবং অন্যান্য আটটি।

প্রসঙ্গত, গত ১১ এপ্রিল ভারতে লোকসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়। সাত দফায় ভোটগ্রহণ শেষ হয় ১৯ মে। কিছু পোস্টার, ব্যালট ছাড়া সব কেন্দ্রের ভোটই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে গ্রহণ করা হয়। এর চার দিন পর গত বৃহস্পতিবার ভারতের নির্বাচন কমিশন ভোট গণনা ও ফল ঘোষণা করে। শেষ দফায় ভোটগ্রহণ শেষে ইভিএমের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় পড়ে বিরোধী দলগুলো। নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ছিল ৯০ কোটি। এর মধ্যে প্রাথমিক হিসাবে ৬৭ শতাংশ ভোট পড়ে বলে জানা গেছে।

মোদির চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক উন্নতি ও বিভাজন কমানো : বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশাল বিজয়ের পর মোদিকে এখন ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বেকারত্ব সামাল দিতে হবে। এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ছাতাম হাউসের গবেষক চাম্পা প্যাটেল বলেন, ‘মূল প্রশ্ন হলো মোদি কি তাঁর অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিপুলসংখ্যক চাকরির চাহিদা তিনি কিভাবে মেটাবেন?’ তিনি বলেন, ভারতের ক্রমবর্ধমান সম্পদবৈষম্যকেও গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। মোদি দিনমজুরি ভিত্তিতে খেটে খাওয়া কোটি কোটি মানুষের স্তরবন্দি জীবনের দুর্দশাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে পারবেন?

বিশ্লেষকরা মনে করেন, এর মধ্যেই ভারতের কৃষি এখন বড় সংকটে। খরা, ফসলের ন্যায্যমূল্যের অভাব ও কৃষিঋণে ধুঁকছে কৃষক। এই অবস্থায় দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরো তীব্র হয়েছে। বিজেপির জয়ে আতঙ্কিত মুসলিম সম্প্রদায়ও। এই অবস্থায় মোদি ও তাঁর হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপিকে অবশ্যই বিভাজন কমিয়ে আনার পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে তাঁর নতুন সরকারের কর্মসূচি মুখথুবড়ে পড়বে। সূত্র : রয়টার্স, এএফপি, পিটিআই, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech