গোড়ায় গন্ডগোল বিজেপি-বিএমজেপির

  

পিএনএস ডেস্ক : নবগঠিত বাংলাদেশ জনতা পার্টি (বিজেপি) ও বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। হঠাৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কিছু সংগঠনের এভাবে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পেছনে কারা জড়িত, তা নিয়েও আলোচনা আছে। তবে দল দুটি নিজেদের সম্পর্কে যেসব তথ্য দিয়েছে, তার অনেক কিছুই সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন সংখ্যালঘুদের অন্য সংগঠনের নেতারা।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা বলছেন, এই দুটি দলের বিষয়ে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পীযূষ কান্তি চক্রবর্তী বলেছেন, ‘দল গঠনের কথা শুনেছি। এরা কারা, তাদের চিনি না। আর এখন দেশে নানা সমস্যা।

এদের নিয়ে ভাবার সময় নেই।’ আর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করার অধিকার যেকোনো মানুষের আছে। তবে আমি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নই।’ তিনি বলেন, ‘যারা দল দুটি করেছেন, এঁদের চিনি না।’

তবে কেউ কেউ বলছেন, এই দুই দল গঠনের পেছনে জাতীয় পার্টির এক নেতার ভূমিকা আছে। অবশ্য জাতীয় পার্টির ওই নেতা সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সুনীল শুভ রায় বলেছেন, ‘দুই দলের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক আছে, তবে দল গঠনের পেছনে জাতীয় পার্টির ভূমিকা নেই। এরা দল গঠনের আগে আমার সঙ্গে কথা বলেছে।’

অবশ্য দল গঠনের পর থেকেই দুই দলের নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার শুরু করেছেন। বিজেপি নিজেরাই দাবি করেছে, তাদের ওপর ভারতের জনতা পার্টির আশীর্বাদ আছে। বিএমজেপি সম্পর্কে বিজেপির নেতাদের অভিযোগ সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় এই দল হয়েছে। অন্যদিকে বিএমজেপির অভিযোগ, বিজেপি একটি ভুঁইফোড় সংগঠন।

বাংলাদেশে পরিচিত বিভিন্ন সংখ্যালঘু সংগঠনের নেতারা বলছেন, এই দুটি দল যাঁরা করেছেন, তাঁদের সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা তাঁদের নেই। দেশের সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকারী বড় সংগঠন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ। এর সাধারণ সম্পাদক রাণা দাশগুপ্ত বলেন, ‘যারা দুটি দল করেছে তারা কেউই পরিচিত মুখ না। এদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না।’

এসব অচেনা–অজানা মুখের দল গঠনকে ‘শুভ উদ্যোগ’ বলে মনে করেন না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির পানি বেশ ঘোলা। তাঁর মতে, সামনে নির্বাচন, এখন নানা উপাদান আসবে। এসব তারই উপসর্গ।

রাজনৈতিক দল, সংখ্যালঘু সংগঠনের নেতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের অস্তিত্ব জাহির এবং একটি চাহিদা তৈরিই এসব দল গঠনের কারণ।

একাধিক সূত্র বলছে, সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিজেদের একটি বলয় তৈরি করে নির্বাচনী মাঠে সুফল আদায় করে নেওয়ার জন্য দল দুটি গঠন করেছে জাতীয় পার্টি।

২০ সেপ্টেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বাংলাদেশ জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং দুদিন পর শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) আত্মপ্রকাশ করে।

দুদিনের ব্যবধানে সংখ্যালঘু নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ বেশ খানিকটা কৌতূহল সৃষ্টি করে অনেকের মধ্যে। দল দুটির নামকরণ নিয়েও ছিল কিছুটা বিস্ময়। ভারতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির নামে প্রথমে আত্মপ্রকাশ করা দলটির নামকরণ নিয়ে প্রথম কৌতূহলের জন্ম। শুধু তা–ই না, এ দলটির প্রতীকও ভারতীয় বিজেপির প্রতীক পদ্ম। তবে বাংলাদেশের বিজেপির প্রতীক পদ্মটি এক জোড়া হাত ধরে আছে। ভারতের পদ্মে কারও হাত নেই। বিএমজেপির প্রতীক রাজহাঁস।

দল দুটি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে বিজেপি ও বিএমজেপির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

রাজধানীর নয়াপল্টনে সাবেক এক আইটি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে বিএমজেপির কার্যালয়। ফ্ল্যাটটি পরিপাটি করে সাজানো। ঘরগুলোতে দামি আসবাব। এ মাসেই এ ফ্ল্যাট ভাড়া করা হয়েছে বলে জানান বিএমজেপির মুখপাত্র হিসেবে পরিচয়দানকারী সুকৃতি কুমার মণ্ডল।

তিনি একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদকও। সাংবাদিকতা তাঁর পেশা বলে জানান। তিনি আরও জানান, লেখাপড়া দিল্লিতে করেছেন। এ দল গঠনের প্রক্রিয়া গত মে মাস থেকে শুরু করেছেন। তিনি জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও জানান। সেখান থেকে আদর্শিক কারণে চলে আসেন। এসব জানানোর পাশাপাশি বললেন, ৫২টি জেলায় তাঁদের সংগঠন আছে।

জাতীয় পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সুনীল শুভ রায়ের (জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য) সঙ্গে পরিচয় আছে। এর বেশি কিছু না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দল গঠনের কথা জানতে পেরে অগ্রযাত্রাকে বাধা সৃষ্টি করতে হঠাৎ করে এ দল করা হয়েছে। এখানে ৫০টি সংগঠন আছে বলা হলেও এরা ৪৯টি সংগঠনের সন্ধান দিতে পারবে না।’ দলটির ৫৪টি জেলায় সংগঠন আছে বলে দাবি তাঁর। আর আগামী নির্বাচনে প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি আসনে প্রার্থী দেওয়ার আশা করছে দলটি।

জাতীয় হিন্দু মহাজোট থেকে বেরিয়ে আসার দাবি করলেও জোটের সভাপতি গোবিন্দ প্রামাণিক দাবি করেন, সুকৃতি মণ্ডল এ জোটের সঙ্গে ছিলেন না।

রাজধানীর ফকিরাপুলে একটি ভবনের ছোট একটি ঘরে বিজেপির কার্যালয়। এ ভবনে ট্রাভেল এজেন্সি, প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান আছে। এ দলের সভাপতি মিঠুন চৌধুরী হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান আদিবাসী পার্টির সভাপতি। এ দলটি বছর কয়েক আগে করা বলে দাবি করেন তিনি। বিএমজেপির অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার দাবি অগ্রাহ্য করে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি জেলায় ও উপজেলায় তাদের সংগঠন আছে। সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে দুটির দুজন ব্যক্তির নাম ও নম্বর দিতে পারলেন তিনি। বাকিগুলো পরে দেবেন বলে জানান।

মিঠুন চৌধুরী বলেন, ‘ভারতের বিজেপি এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) আশীর্বাদ আছে আমাদের প্রতি। গত ১ এপ্রিল কলকাতায় ভিএইচপির বাংলাদেশের উপহাইকমিশন ঘেরাওয়ের কর্মসূচিতে আমি অংশ নিই।’

এ নেতা দাবি করেন, সরকারি দলের একাধিক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং নেতা তাঁর দলে যোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। অন্য দলগুলোর নেতারাও যোগাযোগ করছেন। বললেন, ‘রাজনৈতিক কূটকৌশলের জন্য এখন তাঁদের নাম বলছি না।’ আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেবেন বলে জানান মিঠুন চৌধুরী। জাতীয় পার্টির সঙ্গে ভালো যোগাযোগ থাকলেও দল গঠনে তাদের কোনো ভূমিকা নেই বলে জানান তিনি।

ভারতের বিজেপি ও ভিএইচপির সঙ্গে সম্পর্ক ও আশীর্বাদের যে দাবি মিঠুন করলেন তাকে মহামিথ্যা বলে দাবি করেন নিজেকে ভিএইচপির গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য বলে দাবি করা জাতীয় হিন্দু মহাজোট নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক। তিনি বলেন, ‘দুটি দল হয়েছে স্রেফ নির্বাচনকে সামনে রেখে কিছু চাহিদা সৃষ্টির জন্য। এরা শুরুতেই ভাগ হয়েছে ভাগাভাগিতে বনিবনা না হওয়ার জন্য।’-প্রথম আলো

পিএনএস/জে এ /মোহন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech