আর্জেন্টিনায় পড়তে যাবেন যে ৭ কারণে

  07-06-2026 11:58PM

পিএনএস ডেস্ক: প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৫০ হাজারেরও বেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য আর্জেন্টিনায় যান। কেউ যান নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজে, কেউ আবার তুলনামূলক কম খরচে মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের সুযোগ নিতে। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, কম টিউশন ফি, সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা এবং দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা খাত- সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা এখন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে ক্রমশ জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠছে।

শিক্ষাবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, মাসে এক হাজার ডলারেরও কম খরচে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করা সম্ভব হওয়ায় দেশটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। তবে আর্জেন্টিনার প্রতি আকর্ষণের কারণ শুধু খরচ নয়; দেশটির সংস্কৃতি, প্রকৃতি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগও শিক্ষার্থীদের মুগ্ধ করে।

যারা বিদেশে পড়াশোনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য আর্জেন্টিনা কেন আকর্ষণীয় হতে পারে, তার সাতটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরা হলো।

১. বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ
আর্জেন্টিনায় রয়েছে ৩৯টির বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৪২টি বেসরকারি কলেজ দেশটির সবচেয়ে খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব বুয়েনস আইরেস। প্রতিষ্ঠানটি চারজন নোবেল বিজয়ী তৈরি করেছে।

২০১৮ সালের কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংস- এ বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান ছিল ৭৫তম। লাতিন আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়ে এটি নবম স্থান অর্জন করে।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ১৩টি একাডেমিক বিভাগ, ১০টি জাদুঘর ও ছয়টি হাসপাতাল রয়েছে। নৃবিজ্ঞান, শিল্প ও নকশা, সমাজবিজ্ঞান, আইন, অ্যানাটমি ও ফিজিওলজির মতো বিষয়ে এটি বিশ্বের সেরা ১০০ প্রতিষ্ঠানের একটি।

এছাড়া ইউনিভার্সিটি অব বেলগ্রানো, ইউনিভার্সিটি অব পালার্মো ও অস্ট্রাল ইউনিভার্সিটিও আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে স্থান পেয়েছে।

২. তুলনামূলক কম খরচে উচ্চশিক্ষা
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আর্জেন্টিনা অন্যতম সাশ্রয়ী গন্তব্য। দেশটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন বৃত্তি ও অনুদানের সুযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপরও কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।

সাধারণত প্রতি শিক্ষাবর্ষে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের টিউশন ফি এক হাজার থেকে তিন হাজার ডলারের মধ্যে থাকে। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় এটি অনেক কম।

অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্প্যানিশ ভাষা ও সংস্কৃতির বিনামূল্যের কোর্সও পরিচালনা করে। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ভিসায় খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ পাওয়া যায়।

৩. বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও খাবার
আর্জেন্টিনার সংস্কৃতিতে স্প্যানিশ, ইতালীয়, ইউরোপীয় ও আদিবাসী ঐতিহ্যের প্রভাব রয়েছে। বুয়েনস আইরেসকে অনেক সময় ‘লিটল ইউরোপ’ বলা হয়। এখানে যেমন ইউরোপীয় ধাঁচের স্থাপত্য রয়েছে, তেমনি আছে আধুনিক আকাশচুম্বী ভবন।

রাজধানীর বাইরে রয়েছে বিশাল হিমবাহ, জলপ্রপাত, পাহাড়ি অঞ্চল ও আগ্নেয়গিরি। দেশটিতে একাধিক জাতীয় উদ্যান রয়েছে, যেখানে নানা ধরনের বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ দেখা যায়।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নাতিশীতোষ্ণ রেইনফরেস্ট ভ্যালডিভিয়ানও আর্জেন্টিনায় অবস্থিত।

খাবারের ক্ষেত্রেও দেশটির সুনাম রয়েছে। আর্জেন্টিনা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ লাল মাংস উৎপাদক ও ভোক্তা দেশ। তাদের বিখ্যাত স্টেকের সঙ্গে পরিবেশন করা হয় ‘চিমিচুরি’ নামের বিশেষ সস। এছাড়া ‘চোরিপান’ নামের জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুডও দেশটির পরিচিত খাবার।

৪. তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সম্ভাবনার কেন্দ্র
দক্ষিণ আমেরিকায় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। ২০০১ সালে যেখানে বিনিয়োগ ছিল ১৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে ৪৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

বুয়েনস আইরেসভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান কাসজেক ভেনচার্স-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা নিকোলাস সেজেকাসি বলেন, লাতিন আমেরিকার স্টার্টআপ খাত প্রতি বছর আরও এগিয়ে যাচ্ছে এবং উদ্যোক্তাদের মানও উন্নত হচ্ছে।

আর্জেন্টিনা সরকার উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ‘লে দে এমপ্রেনদেদোরেস’ বা উদ্যোক্তা আইন চালু করেছে। এর মাধ্যমে কর-সুবিধা, সহ-অর্থায়ন ও দ্রুত ব্যবসা নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই একটি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান চালু করা সম্ভব।

৫. দ্রুত বাড়ছে প্রযুক্তি খাত

আর্জেন্টিনার উদ্যোক্তাবান্ধব নীতি দেশটির প্রযুক্তি খাতকে দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। ‘ব্লেন্ডেড’ নামের একটি শিক্ষা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্কুল ও অভিভাবকদের মধ্যে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এটি ইতোমধ্যে আর্জেন্টিনার ২০০টির বেশি স্কুলে ব্যবহৃত হচ্ছে।

‘ইমি ল্যাবস’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভার্চুয়াল সহকারী তৈরি করেছে। এসব প্রযুক্তি সিভি যাচাই ও সাক্ষাৎকার নির্ধারণের মতো প্রশাসনিক কাজ সহজ করে। ‘উয়ালা’ ও ‘ইনক্রিস’ নামে ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার তৈরি করেছে। ‘সিরেনা’ ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সংযুক্ত করার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।

অন্যদিকে ‘ওয়ার্কানা’ বর্তমানে দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে এবং এশিয়ার বাজারেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। ফলে প্রযুক্তি খাতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য দেশটিতে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়ছে।

৬. কৃষি ও প্রযুক্তির নতুন যুগের নেতৃত্ব
আর্জেন্টিনার অন্যতম বড় শিল্প হলো কৃষি। দেশটি বিশ্বের ১৭০টি দেশে সয়াবিন, শস্য, আটা এবং প্রাণিসম্পদ রপ্তানি করে। এ খাত থেকে বছরে ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়।

প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার ফলে কৃষি ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে নতুন ‘এগ্রোটেক’ শিল্প গড়ে উঠেছে।

গ্লোক্যাল- এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, এ খাতে ৫০টির বেশি নতুন স্টার্টআপ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এগ্রি-বায়োটেক ও উন্নত কৃষি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার এখন সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল উপখাতগুলোর মধ্যে রয়েছে।

সরকার এ শিল্পকে সহায়তা দিতে ৬০ কোটি ডলারের একটি স্যাটেলাইট ব্যবস্থা তৈরি করেছে। এটি মাটির গুণমান, আবহাওয়া, বন্যা, খরা ও ফসল উৎপাদনের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম।

১. জানা-শোনা গন্ডি ছাড়িয়ে নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ
আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেস দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম প্রাণবন্ত শহর। শহরটি বড়, ব্যস্ত, রঙিন এবং নতুনদের জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জিংও।

যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থী হান্না লেবুহন উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে বুয়েনস আইরেসে গ্লোবাল হেলথ ও স্প্যানিশ স্টাডিজ পড়তে যান। তার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ আমেরিকার সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা এবং স্প্যানিশ ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা।

প্রথম দিকে ভাষা ও পরিবেশের কারণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হলেও তিনি মনে করেন, বিদেশে পড়াশোনা তাঁকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন মেরি বেরিংহাউসও। আর্জেন্টিনায় পড়াশোনা ও ইংরেজি শিক্ষকতা করার সময় তিনি স্থানীয় সংস্কৃতি, শিক্ষার প্রতি মানুষের গুরুত্ব ও তাদের উদারতার সঙ্গে পরিচিত হন।

সবশেষে বলা যায়, যারা পড়াশোনার পাশাপাশি নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চান ও ভবিষ্যতের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে চান, তাদের জন্য আর্জেন্টিনা হতে পারে একটি আদর্শ পছন্দ। সূত্র: এডুকেশনস ডট কম


পিএনএস/রাআ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন