দৈনিক ১০ গাড়িকে জরিমানার মৌখিক নির্দেশ!

  

গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের কাছাকাছি হঠাৎ একটি প্রাইভেট কারকে থামার সংকেত দেন দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট। মালিক নিজেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন। সার্জেন্ট কাছে এসে অভিযোগ করলেন, গাড়ির সামনে থাকা বাম্পারের কারণে দূর থেকে পুরো নম্বর প্লেটটি দেখা যাচ্ছে না। মালিক তা মানতে রাজি নন। পাল্টা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে উভয়েই কিছুটা দূরে গিয়ে বিষয়টি পরীক্ষা করেন। দেখা যায়, ঠিকই পড়া যাচ্ছে নম্বর প্লেটটি। তারপরও কিছু একটা ভুলের অজুহাতে গাড়িটির বিরুদ্ধে ২শ’ টাকার একটি মামলা ঠুকে দেন।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ধানমণ্ডি সাতমসজিদ রোডে গত শুক্রবারের। খালি রাস্তা। একটি ভবনের পাশের রাস্তার ওপর গাড়ি রেখে বিস্কুট কিনতে নেমেছেন এক দম্পতি। সেখানে পার্কিংয়ের কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ৫ মিনিট পর তারা ফিরে এলে চালক জানায়, তাদের গাড়ির কাগজ নিয়ে চলে গেছেন সার্জেন্ট। পরে থানায় গিয়ে ভুল জায়গায় পার্কিংয়ের অভিযোগে ৩শ’ টাকা জরিমানা দিয়ে কাগজ নিয়ে আসতে হয় তাদের।

অপর ঘটনাটি সম্প্রতি ঘটে রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায়। সেখানে সংকেত দিয়ে পৃথক একটি প্রাইভেট কার থামান দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট। গাড়ির কাগজ পরীক্ষার নামে কিছুক্ষণ চালকের সঙ্গে কথা-বার্তা বলেন তিনি। কাগজপত্র ঠিক তবে ট্যাক্সের নথির হিসাবে একদিনের গড়মিল। এরপর মালার ভয় দেখিয়ে পরক্ষণেই আবার ‘সমঝোতা’র প্রস্তাব। কিন্তু চালকও কঠোর। কোনও ধরনের সমঝোতায় আসতে চাইলেন না তিনি। ক্ষুব্ধ সার্জেন্ট হুমকি দিলেন গাড়ি আটক করার। এরপর অপর এলাকার পরিচিত এক ট্রাফিক সার্জেন্টের সঙ্গে কথা বলেন গাড়িচালক। সেই সার্জেন্টের মুঠোফোনে করা অনুরোধের ভিত্তিতে গাড়িটি ছেড়ে দেওয়া হয়।

রাজধানীতে এমন ছোটখাটো বিভিন্ন ইস্যুতে ট্রাফিক সার্জেন্টের হাতে নাস্তানাবুদ হচ্ছেন গাড়িচালকরা। তুচ্ছ অথবা ছোট অপরাধের কিংবা অপরাধ না করেই ভিত্তিতে জরিমানার মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। আর তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে ট্রাফিক সার্জেন্টরা জানাচ্ছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাহিদার মুখে পড়ে না চাইলেও দিনে অন্তত ১০টি মামলা দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। নইলে উল্টো জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের। আর এ কারণেই তুচ্ছ অপরাধেও শাস্তি দিতে হচ্ছে প্রাইভেট কার চালক বা মালিকদের। আর এ কারণে ব্যাহত হচ্ছে তাদের মূল কাজও।

দৈনিক ১০ গাড়িকে জরিমানা


কয়েকজন ট্রাফিক সার্জেন্টের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার কারণে জরিমানা করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে স্বীকার করেন। তারা জানান, দিনে অন্তত ১০টি মামলা না করলে জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হয় তাদের। সেই জবাবদিহিতা এড়ানোর জন্য হন্যে হয়ে তাদের থামাতে হয় গাড়ি। কিন্তু একটি গাড়ি যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে ভুয়া কাগজের অনেক গাড়িই পার পেয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। এছাড়া নানা ছুতো বের করতে গিয়ে হাতাহাতির মতো ঘটনাও প্রতিদিনই ঘটে চলেছে। এর ফলে তাদের আসল কাজও ব্যাহত হচ্ছে।

গাড়ির কাগজ ঠিক আছে এমন মালিকরা বলছেন, কোনও কারণে তারা গাড়িতে না থাকলে ড্রাইভারের কাছ থেকে কাগজ নিয়ে মামলা করে দেন সার্জেন্টরা। আর সেই জরিমানার টাকা জমা দিয়ে কাগজ ফেরত পেতে ঘুরতে হয় একাধিক দিন।

এ বিষয়ে শ্যামলীর এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি সংস্থার চাকরিজীবী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার চালক তিনদিন গিয়ে কাগজ ফিরে না পেয়ে ৫শ’ টাকা ঘুষ দিয়ে কাগজ নিয়ে এসেছে। তবে মালিক গাড়িতে থাকলে সার্জেন্টরা এভাবে মামলা করেন না বলে জানান মালিকরা।’

মালিক থাকলে এক আচরণ আর ড্রাইভার থাকলে ভিন্ন আচরণ কেন করা হয়- এমন প্রশ্নের জবাবে বৃহস্পতিবার মতিঝিল এলাকায় দায়িত্বে থাকাবস্থায় এক ট্রাফিক সার্জেন্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘মালিকের সামনে এসব নিয়ে ঝামেলা করতে লজ্জা লাগে। বাম্পারের নিচে নম্বর দেখা যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমাকে তো মামলা দিতে হবে।’

ওই সার্জেন্ট জানান, ট্রাফিক পুলিশের যে কর্মকর্তা যত বেশি মামলা দায়ের করবেন, তার ‘সুনাম’ তত বাড়বে এবং পরবর্তী চাকরি ও পোস্টিংয়ের ওপরও তার প্রভাব পড়বে। গত চার মাস ধরে এমন চর্চা শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ সার্জেন্টদের। তারা বলছেন, ‘সুনাম’ বাড়লে আরও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব পড়বে।

নগরীর কয়েকজন ট্রাফিক সার্জেন্ট অভিযোগ করেন, নিজেদের কর্মদক্ষতা যাচাইয়ে রুটিনমাফিক যানজট নিয়ন্ত্রণের চেয়ে এখন মামলার সংখ্যা বাড়ানোই তাদের প্রধান টার্গেট। সে কারণে দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে যানজট। লক্ষ্য পূরণে ট্রাফিক ইনস্পেক্টর (টিআই) থেকে শুরু করে একই বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী চাপ প্রয়োগ করে থাকেন। কিন্তু তা কেউ স্বীকার করবেন না। আবার তারা মামলা বাড়ানোর নির্দেশ দেয়ার পর এমনও বলে থাকেন, এটা নিয়ে বাড়তি চাপ নেওয়ার কিছু নেই। কিন্তু বাস্তবে মামলার টার্গেট পূরণ না করলে ‘সুনাম’ বাড়বে না।

ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অপরাধে রাজধানীতে যানবাহনের বিরুদ্ধে ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৬৭টি মামলা করা হয়। এতে জরিমানার অঙ্ক ছিল ১৮ কোটি ২৮ লাখ ৯৫ হাজার ৯৫০ টাকা। কিন্তু এ বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ গত ৯ মাসেই মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৩১ হাজার ৪৫টি। তাতে জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ কোটি ৯৮ লাখ ৫৪ হাজার ৬১৩ টাকা।

কার লাভ কার ক্ষতি


যত বেশি মামলা হচ্ছে, তত বেশি কাজ হচ্ছে মনে করা হলেও মাঠে যারা কাজ করেন তারা এতে বিশ্বাসী নন। গাড়ি ম্যানেজ করে রাস্তাকে নির্ঝঞ্ঝাট রাখার কাজ তারা ৩০ শতাংশ করতে পারছেন বলে মনে করেন। মামলার যোগ্যতায় প্রতি মাসে মহানগর ট্রাফিক পুলিশের একজন উপ-কমিশনার (ডিসি) সেরা নির্বাচিত হন। একইভাবে ডিসি কার্যালয়ের অধীন একজন সহকারী কমিশনার (এসি) থেকে শুরু করে সার্জেন্ট পর্যন্ত সেরা নির্বাচিত হন। এতে মহানগর ট্রাফিক বিভাগে মামলা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলছে। আর ক্ষতি হচ্ছে রাজধানীবাসীর। অযথা হয়রানি আর সার্জেন্টদের সঙ্গে ঝগড়া প্রতিনিয়ত লেগেই আছে। তারা মনে করেন, সার্জেন্ট গাড়ি ধরেন নিজেদের টাকার লোভে। কিন্তু এই ধারণা এখন একেবারেই ঠিক না।

জয়েন্ট পুলিশ কমিশনার ট্রাফিক (উত্তর) সবগুলো অভিযোগই অস্বীকার করে বাংলা বলেন, কাউকে এ ধরনের টার্গেট বেঁধে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কেউ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলে সে ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা আছে। তাহলে সার্জেন্টরা এসব বিষয় নিয়ে হতাশায় ভুগছেন কেন, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আমি বলতে পারব না। তবে এ ধরনের অফিসিয়াল ইনস্ট্রাকশন দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’ সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

পিএনএস/আনোয়ার


 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech