সংকোচিত হয়ে আসছে নদীর চিহ্ন

  



পিএনএস ডেস্ক: নিরবেই চলে গেল “বিশ্ব নদী দিবস”। নদীমাতৃক দেশ আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ। নদীই আমাদের এই শ্যামল দেশের প্রাণ, অর্থনীতির ভিত্তি। আমাদের বাঙালী জীবন ধারা,আমাদের সংস্কৃতির আঁতুর ঘড় নদী নির্ভর গ্রাম,নদী বিচ্যুত এই আঁতুর ঘড় কল্পনাও করা যায় না।

রবিঠাকুরের উপন্যাস, গল্প, ছোটগল্প, কবিতা থেকে নদী বাদ দিলে রবীন্দ্রনাথই অসম্পূর্ণ হয়ে যান। রবিঠাকুরের ছোট গল্পের বড় একটি অংশ দখল করে আছে পদ্মা। আমাদের ভাটিয়ালি,পল্লীগীতিসহ কোথায় নদী নেই। কৃষি,ফসলের সাথে নিবির আত্মীয়তা আমাদের নদীর। পলি-জলের যে শক্তি তারও উৎস ঐ নদী।

সেই নদীকে আমরা প্রতিদিন খুন করে চলেছি। দখল করছি নদীর বুক, বিষজলে মরে যাচ্ছে মাছ, শিল্পবর্জ্যের এই বিষ আমরাই ঢালছি। উজানের বাঁধে হারিয়ে যাচ্ছে নদীর চিহ্ন।

নদীর এই মরণ, বিনাশের দায় এদেশের সাধারণ মানুষের বিন্দুমাত্র নেই। নদীর দূষণ, দখল, নদীকে বিষময় করার সমস্ত দায় ক্ষমতাবানেদের, বিত্তবানদের, রজনীতিকদের। জীবন-জীবিকা, কৃষি, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন অনুষঙ্গে নদী মানুষের জীবনে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দখল-দূষণে প্রায় বিপন্ন বাংলাদেশের নদ-নদী। আবার কখনো এই নদীর কারনে মানুষের জীবন, সংসার, বসত বাড়ি, ফসলী জমি হারিয়ে নি:স্ব হয়ে পরে নিমিষেই।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে নানা আয়োজনে পালিত হবে দিবসটি। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রোববার বিশ্ব নদী দিবস হিসেবে পালিত হয়। সেই হিসাবে এবার ২৪ সেপ্টেম্বর (রবিবার) বিশ্ব নদী দিবস। ১৯৮০ সাল থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রোববার বিশ্ব নদী দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া (বিসি) ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। যার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল বিসি রিভারস ডে পালন দিয়ে। ১৯৮০ সালে কানাডার খ্যাতনামা নদীবিষয়ক আইনজীবী মার্ক অ্যাঞ্জেলো দিনটি ‘নদী দিবস’ হিসেবে পালনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিসি রিভারস ডে পালনের সাফল্যের হাত ধরেই তা আন্তর্জাতিক রূপ পায়। ২০০৫ সালে জাতিসংঘ নদী রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরি করতে ‘জীবনের জন্য জল দশক’ ঘোষণা করে। সে সময়ই জাতিসংঘ দিবসটি অনুসমর্থন করে। এরপর থেকেই জাতিসংঘের বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা দিবসটি পালন করছে, যা দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। বিশ্বের প্রায় ৬০টির বেশি দেশে পালিত হয় বিশ্ব নদী দিবস। বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে থেকে রিভারাইন পিপল নামের একটি সংস্থা এ দিবস পালন করে আসছে।

নদীমাতৃক আমাদের দেশের মানিকগঞ্জে রয়েছে নদ-নদীর আধিপত্য। দেশের বৃহৎ পদ্মা ও যমুনার মতো বড় দু’টি নদী ছাড়াও মানিকগঞ্জের বুক চিড়ে প্রবহমান ছিল ইছামতী, কালীগঙ্গা, কান্তাবতী, মনলোকহানী, গাজীখালী, ক্ষীরাই, মন্দা, ভুবনেশ্বর ও ধলেশ্বরীর মতো ৯টি শাখা নদী। জেলার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত এসব নদীগুলো শুকিয়ে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। উজানে ভারতের পানি প্রত্যাহার, ড্রেজিং না করা ও দখলের কারণে প্রায় ৬ টি নদী, ৪২ টি খাল-বিল ও প্রায় দুই শতাধিক ছোট জলাশয়ের অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। একসময় যেখানে বছর জুড়ে পানি থাকত, শুকনো মওসুমে সেখানে এখন এক ফোঁটা পানিও মেলে না নৌকার পরিবর্তে চলাচল করে ঘোড়ার গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহন। এ যেন পানির দেশে-পানির জন্য হাহাকার।

নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সভ্যতা। কিন্তু নদী কেন্দ্রিক সেই ঐতিহ্য, জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, সভ্যতা, কৃষি, অর্থনীতি ক্রমশই হয়ে আসছে সংকোচিত। এ ধারা অব্যাহত থাকলে নদ নদীর অস্থিত্ব বিপন্ন হবে সেই সাথে পাল্টে যাবে নদীকেন্দ্রীক জীবন জীবিকা,সভ্যতা সংস্কৃতি।

মানিকগঞ্জ সীমানায় এর মধ্যে বেশ কয়েকটি নদীর অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে মানচিত্র থেকে। রাজধানীর সন্নিকটে মানিকগঞ্জ জেলা ধলেশ্বরী-কালীগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। করুণ ও রুগ্ন এ দুটি নদী আজ মৃতপ্রায়। ফলশ্রুতিতে নতুন প্রজন্মের কাছে ধলেশ্বরী আর কালীগঙ্গা নদী আজ কেবলমাত্র কাগজে কলমে রয়েছে; বাস্তবে এই নদীর চিত্র এতটাই করুন অবস্থা যে, বুঝার উপায় নেই যে, নদীর বুকে চর না কি চরের বুকে নদী? এমন প্রশ্নের উত্তর মেলা সত্যিই দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নদীকে দখল, দূষণমুক্ত এবং রক্ষা করার প্রত্যয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন মানিকগঞ্জ ধলেশ্বরী নদী বাঁচাও আন্দোলন ও বেসরকারী উন্নয়ন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকসহ সচেতন ও সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ।

নদী রক্ষায় ঢাকঢোল পেটানো হলেও নদী হন্তারকরা দূষণ-দখলে থেমে নেই। কোনোটা হচ্ছে শুকিয়ে খাল; আবার কোনোটা ফসলি জমি। যৎসামান্য পানি যেগুলোতে আছে, তাও বিষাক্ত বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে। মানুষ প্রতিদিন এসব নদীর টলমলে পানি দূষিত করে দিচ্ছে। ভারত তাদের সীমানায় বাঁধ দিয়ে আমাদের নদীগুলোর টুঁটি চেপে ধরছে। কিছু নদী হন্তারকের দ্বারা নদীগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে; দিন দিন সঙ্কুচিত হচ্ছে অনেক নদীর সীমানা। দেখা গেছে, প্রতি ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এর সঙ্গে জড়িত, ফলে সাধারণ মানুষও নদী-ক্ষতির শিকার হচ্ছে। সুত্র: নয়াদিগন্ত

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech