জর্দান যাওয়া নারী শ্রমিকেরা কোথায় গেছে?

  


পিএনএস ডেস্ক: জর্দান যাওয়া নারীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মীর হদিস নেই বলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তাদের স্বজনেরা। তবে এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দেশেও ফিরে এসেছেন। তার মধ্যে ফরিদপুরের চর ভদ্রাসন থানার পশ্চিম শালেপুর গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল শেখের মেয়ে শিল্পী (১৯) তিন বছর পর দেশে ফিরেছেন। নিখোঁজের ব্যাপারে শিল্পীর বাবা মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করার কিছুদিন পর দালালের হাতে আটক থাকা শিল্পী ফিরে আসেন। তবে দালাল তাকে বিমানবন্দরে ফেলে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে পরে শিল্পী নিজ খরচে দেশে ফিরে আসেন।

শুধু শিল্পী নন, তার মতো অভাবের সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে জর্দানে পাড়ি জমানো বেশ কয়েকজন নারীকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিয়েছেন দেশে থাকা স্বজনেরা। সেই অভিযোগগুলোর তদন্ত করছেন জর্দানে বাংলাদেশ দূতাবাস ও ঢাকার জনশক্তি ব্যুরোর কর্মসংস্থান সেল। কোনো কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি এখনো হয়নি বলে জানা গেছে।

ওয়েজ অর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মহাপরিচালকের দফতরে ২০১৬ সালের ১৭ এপ্রিল লিখিত অভিযোগে শিল্পীর পিতা জয়নাল শেখ উল্লেখ করেছিলেন, ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে রিক্রুটিং এজেন্সি হাসান ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরোর বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েই তার মেয়ে শিল্পী জর্দানে যায়। এর পর থেকেই তার সাথে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নাই। অভিযোগে শিল্পীকে দেশে ফেরত আনার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, তিন বছর ধরে মেয়ের সাথে যোগাযোগ নাই। তাকে নিয়ে পরিবারের সদস্যরা খুবই উদ্বিগ্ন। তাকে জরুরিভাবে দেশে ফেরত আনা দরকার। তবে এত দিন শিল্পী কোথায়, কার কাছে ছিলেন সে ব্যাপারে প্রশাসনের কারো কাছ থেকে কিছু জানা সম্ভব হয়নি।

নিখোঁজের সূত্র ধরে গতকাল শনিবার সন্ধ্যার পর শিল্পীর পিতা জয়নাল শেখের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার মেয়ে শিল্পী বেগম জর্দানে যাওয়ার পর তিন বছর ধরেই নিখোঁজ ছিল। তার সাথে আমাগো যোগাযোগ না হওয়ায় আমি ঢাকার সরকারি অফিসে গিয়ে (প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়) কেস করি। কেস করার দেড় মাসের মধ্যে দেশে চলে আসে। তিনি বলেন, দেশে আসার ৫-৬ মাস পর অন্য একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সে আবারো জর্দানে যায়। আগের কোম্পানির মালিক ভালো ছিল না। তবে এবার যে মালিকের কাছে মেয়ে গেছে সেখানে সে ভালো আছে। এখন ঘন ঘন টেলিফোন করতে পারছে। এ পর্যন্ত দেড় লাখ টাকার মতো পাঠিয়েছেও। দুই মাস পর মেয়ের যাওয়ারও দুই বছর পূরণ হবে।

আপনার মেয়ে তিন বছর নিখোঁজ থাকার পর দেশে এসে আবার জর্দানে চলে গেছে সেটা কি কাউকে জানিয়েছিলেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি পরে বিষয়টি সরকারি অফিসে গিয়ে জানিয়েছি। দেশে ফেরার পর জর্দানে তিন বছর আপনার মেয়ে কোথায়, কার কাছে ছিল প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মেয়ে আমাদের কাছে বলেছে, যাওয়ার পর মালিক ও তাদের দালাল মিলে তাকে আটকে রেখেছিল। তাকে ফোনও করতে দেয়নি। আমি যখন কেস করি, তখন এই খবর দালালরা পেয়ে যায়। এরপরই দালাল তাকে এয়ারপোর্টে রেখে আসে। ওই দিন ফ্লাইট মিস হয়। ১০ দিন পর মেয়ে নিজের টাকায় বিমানের টিকিট কেটে দেশে আসে। ৫-৬ মাস দেশে থাকার পর আবার মেয়ে জর্দানে চলে যায়। ওর তো বাড়ি আসারও আবার সময় হয়ে গেছে।

আপনার মেয়ের বয়স কত জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিদেশ পাঠানোর সময় পাসপোর্টে মেয়ের বয়স ২৫ বছর দেখাইছি। আসলে তার বয়স ১৮-১৯ হবে। ৬ মেয়ে ২ ছেলের মধ্যে শিল্পী মেজো জানিয়ে জয়নাল শেখ জানান, আমার এই মেয়ের এখনো বিয়ে হয়নি। আরেক মেয়ে বিউটি (১৭) এক মাস আগে ঢাকার একটি রিক্রুটিং এজেন্সি থেকে সৌদি আরবে গেছে। তার ওপর নির্যাতন চলছে বলে আমাদের জানিয়েছে। তিনি বলেন, সৌদি আরবের বাড়ির মালিক ভালো হলেও ম্যাডাম খুব খারাপ। তবে ঢাকার কোন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিউটি বিদেশে গেছে তা তিনি বলতে পারেননি।

গত রাতে জর্দানে শিল্পীকে পাঠানো রিক্রুটিং এজেন্সি হাসান ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারীর সাথে শিল্পীর তিন বছর নিখোঁজ থাকার পর আবার ফিরে আসা প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলেও বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী বিদেশগামী নারী কর্মীদের বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর হতে হবে। এর কম বয়সী কেউ বিদেশ যাওয়ার ক্লিয়ারেন্স পাবেন না। এটা আইনে রয়েছে। তারপরও কিভাবে জর্দানে পাড়ি জমালেন শিল্পী? শুধু তা-ই নয়, চলতি বছরের আগস্ট মাসে শিল্পীর বোন বিউটিও কিভাবে ১ মাসের ট্রেনিং সার্টিফিকেট ও জনশক্তি ব্যুরো থেকে বহির্গমন ক্লিয়ারেন্স নিয়ে সৌদি আরব যাওয়ার ছাড়পত্র পেল তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সদ্য যোগ দেয়া পরিচালক (বহির্গমন) মজিবুর রহমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।

গতকাল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের মহাসচিব ও সাদিয়া ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান জানান, সৌদি আরব, জর্দানসহ অন্যান্য দেশে নারী শ্রমিকেরা যাওয়ার পর কী কারণে তাদের সমস্যা হচ্ছে সেগুলো নিয়ে স্পেসিফিক আলোচনা হওয়ার পাশাপাশি রিসার্চ হওয়া দরকার। কেন সমস্যায় আছে, কেন মেয়েরা ফেরত আসছে সেগুলোর যদি প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়া যায় তাহলে আর কর্মীরা ফেরত আসবে না। সূত্র: নয়া দিগন্ত

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech