‘গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়েছে সরকার’

  


পিএনএস ডেস্ক: আসন্ন একাদশ জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। সেই সাথে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া দেশে কোনো সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে পারে না বলে দাবি করেছে বিএনপি। আজ শনিবার সকালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচনে বেগম জিয়াকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না দেয়ার জন্যই মিথ্যা ও সাজানো মামলায় কারাগারে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। রিটার্নিং অফিসাররা আইন বহির্ভূত ও অন্যায়ভাবে বিএনপি চেয়ারপারসনের তিনটি মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন। এটা সরকারের ষড়যন্ত্রেরই অংশ। তিনটি আসনে তার পক্ষে আপিল করা হয়েছে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চললে দেশনেত্রী প্রার্থিতা ফিরে পাবেন। নির্বাচন কমিশনকে বলবো দেশনেত্রী বেগম জিয়ার প্রতি ন্যায়বিচার করুন। ইসি সংবিধান ও আইন অনুসরণ করলে এবং বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্বাসযোগ্য সিদ্ধান্ত নিলে খালেদা জিয়া অবশ্যই প্রার্থিতা ফিরে পাবেন। খালেদা জিয়া ছাড়া নির্বাচন হলে তা হবে একটি বিশাল প্রহসন।

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ড. সুকোমল বড়ুয়া, মোঃ মুনির হোসেন, খন্দকার মাশুকুর রহমান ও আমিনুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম নিয়মিত নির্বাচন কমিশনে যান এবং সেখানে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এমনকি তিনি নির্বাচন কমিশনে কর্মরত বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকদেরকেও দেখে নেয়ার হুমকি দিচ্ছেন। কয়েকদিন আগে একজন সাংবাদিক এইচ টি ইমামের কাছে প্রশ্ন করেছিলেন যে, ঢাকার আদাবরে আওয়ামী লীগের দুজন মারা গেল, হেলমেট পরে ছাত্রলীগ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা করলো কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেয়া হলোনা, আর বিএনপি অফিসের সামনে পুলিশী হামলার ঘটনায় মামলা হলো এবং গ্রেফতার করা হলো বিএনপি নেতাকর্মীদের? এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি ক্ষেপে যান এবং সাংবাদিককে বলেন-আপনি কী বিএনপি করেন? নোয়াখালীতে মওদুদ আহমদের ওপর ককটেল হামলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এইচটি ইমাম সাংবাদিকদের বলেন- আপনি কি মওদুদ?

বিএনপির এই নেতা জানান, ইসিতে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যরা নিয়মিত যাতায়াত করেন। তারা যতবার নির্বাচন কমিশনে গিয়েছেন ততবার সেখানে কর্তব্যরত সাংবাদিকদের হুমকি-ধামকি দিয়েছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্ন পছন্দ না হলে তাদেরকে রাজনৈতিক দলের কর্মী বলে ট্যাগ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সাংবাদিকদের লিস্ট করে তাদের বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। আগামীকাল রোববার রাতে এইচ টি ইমামের বাসায় ইসি বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের ডাকা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের সাথে মত বিনিময় করবেন বলে ওইদিন রাত ৮ টায় ১ নম্বর হেয়ার রোডস্থ বাসভবনে- এ জন্যে সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এ বার্তা পাঠিয়েছেন। মতবিনিমরের নামে মূলতঃ গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়েছেন এইচ টি ইমাম। এমনিতে ভোট কেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশে নির্বাচন কমিশন কঠোর বিধিমালা জারি করেছে। তাতেও আশ্বস্ত না হতে পেরে এখন গণমাধ্যমকে সম্পূর্ণরুপে নিয়ন্ত্রণ করতে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে।

রিজভী বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সারাদেশে গ্রেফতার ও মিথ্যা মামলার হিড়িকে নেতাকর্মীদের জীবন বিপন্ন ও বিপর্যস্ত। কোনো মামলা ছাড়াই অনেককে গ্রেফতার করা হচ্ছে। নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করা হচ্ছে। তাদেরকে এলাকা ছাড়া করা হচ্ছে, ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। গুম-খুন-অপহরণ করা হচ্ছে। এর দায় নিতে হবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদাকে। কেননা জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের অধীনে। দেশবাসী জানেন, সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচনের জন্য সব রাজনৈতিক দলকে সমান সুযোগ বা সমান্তরাল মাঠ তৈরী করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে উপেক্ষা করে সরকারের সহায়তাকারী আজ্ঞাবহ প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিরোধী দলকে মাঠ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার হীন চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। সিইসি সরকারের নীলনকশা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান।

গণতন্ত্রবিনাশী সরকার পরিকল্পিতভাবে ক্রসফায়ার, গুম, খুন এবং গ্রেফতার, মিথ্যা মামলার দ্বারা নির্যাতনের দমননীতি অবলম্বন করেছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, এই অবস্থায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের সকল সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে। দেশবাসী এখন গভীর শঙ্কা এবং উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে। প্রতিদিন দেশের নাগরিকদের ঘর থেকে বের হওয়ার সময় তারা জানে না যে, আদৌ ঘরে ফিরে আসতে পারবে কি না। তারা স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা নিয়ে চরম অনিশ্চিয়তায় ভুগছে।

রিজভী আরো বলেন, গত ২৪ নভেম্বর শনিবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটদের নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা সংক্রান্ত ব্রিফিং শেষে কে এম নুরুল হুদা সাংবাদিকদেরকে বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনা ছাড়া আইন শৃঙ্খলাবাহিনী কাউকে গ্রেফতার করছে না। আমাদের কথা পুলিশ মান্য করে। আমাদের কথার বাইরে গিয়ে বিনা কারণে কাউকে গ্রেপ্তার করে না। আইনমতো যেভাবে আমাদের যাওয়া দরকার, আমরা সেভাবেই যাচ্ছি। সিইসি কে এম নূরুল হুদার কথাই প্রমাণ করে যে, তফসিল ঘোষণার পরে এখন যে গুম, খুন, গ্রেফতার, মামলা, রিমান্ড চলছে সবই কি তাহলে তার নির্দেশেই হচ্ছে? আমি ইসির প্রতি আহবান জানাবো- সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টি করার লক্ষ্যে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণসহ পুলিশ ও জনপ্রশাসনের সকল অপতৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করুন। ক্রসফায়ার, গুম, খুন, গ্রেফতার মিথ্যা মামলা, দমন, নির্যাতন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিন।

তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে একতরফা নির্বাচনের জন্য পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকধারী পুলিশও দিনকে দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) অফিসকে গুমের নতুন ঘাঁটি বানানো হয়েছে। গত ১৯ নভেম্বর বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী যশোর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আবু বকরের লাশ বুড়িগঙ্গা থেকে উদ্ধারের পর তার সহকর্মী বিএনপি নেতা কেশবপুর উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য সাইফুর রহমানকে ঢাকায় ডেকে এনে মিন্টু রোডে ডিবি কার্যালয়ে ঢুকিয়ে গুম করা হয়েছে। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও তাকে প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না। সাইফুর রহমানের পরিবার ও সহকর্মীদের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের কর্মকর্তা পরিচয়ে একজন ফোন করলে তিনি ঢাকায় আসেন। গত ২৭ নভেম্বর দুপুর ১২টার দিকে তিনি মিন্টু রোডে ডিবি কার্যালয়ে ঢোকেন। এরপর তার আর খোঁজ মিলছে না। এর আগে দলের মনোনয়নপত্র তুলতে ঢাকায় এলে অপহরণ করা হয় একই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা আবু বকরকে (৬৫)। ১৯ নভেম্বর বুড়িগঙ্গায় তার লাশ পাওয়া যায়। সে সময় সাইফুর মেম্বার আবু বকরের সাথে ঢাকায় এসেছিলেন।

তার পরিবার সূত্র জানায়, সাইফুরকে ডিবির কর্মকর্তা পরিচয়ে একজন বারবার ফোন করে ঢাকায় আসতে চাপ দিলে তিনি তা ইউনিয়নের আবদুর রহমানসহ অন্য মেম্বারদের জানান। চেয়ারম্যান আরেক মেম্বার আবদুল লতিফ গাজীকে সাথে দিয়ে তাকে ঢাকায় পাঠান। তারা ঢাকায় এসে ডিবি কার্যালয়ে যান। কিছুক্ষণ পরে ভেতর থেকে একজন লোক এসে সাইফুরকে ডেকে নিয়ে যান।

লতিফ গাজী বলেন, তিনিসহ আরো দুই ব্যক্তি সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। পরে তাদেরকে রাস্তার অপর পাড়ে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলা হয়। এরপর জোহর গেল, আসর গেল; সাইফুর আর আসে না। আমি গেটে যাই খোঁজ নিতে। আমাকে বলা হয়, ভেতরের খবর তারা জানে না। সন্ধ্যার পরে আমি চলে আসি। এরপর আর কোনো যোগাযোগ করতে পারেনি বলে জানান রিজভী।

রিজভী আরো বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে গত ২৬ নভেম্বর অনলাইন এক্টিভিস্ট রবিউল আউয়াল সোহাগকে কুমিল্লা থেকে তুলে নেয়ায় পর এখন পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাচ্ছে না তার পরিবার। অবিলম্বে তাকে প্রকাশ্যে হাজির করার দাবি জানাচ্ছি। আমি বিএনপির পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই-আপনারা এই দেশ এবং এই সমাজেরই মানুষ, কেনো আপনারা সরকারের স্বার্থে মনুষ্যত্বহীন কাজে নিজেদেরকে জড়ান? আপনারা সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল, মত, বিশ্বাসের মানুষের ওপর সহিংস নিষ্ঠুরতা কিভাবে অবলীলায় চালাতে পারেন? এরাও এই দেশেরই মানুষ। আপনারা কী নিশ্চিত যে, আওয়ামী লীগ চিরদিনের জন্য ক্ষমতায় থাকবে? আপনারা কিসের লোভে গণতন্ত্র, নাগরিক স্বাধীনতা, মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিতে কুন্ঠিত হচ্ছেন না? আপনাদের আহবান জানাই- অবৈধ শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থে আপনারা মানুষের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নেবেন না। নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করতে সহায়তা করুন। নিজ দেশের নাগরিকদের গুম-খুনে নিজেদের হাতকে রঞ্জিত করবেন না। আপনারা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা, আপনারা নিরপেক্ষ থাকুন।

রিজভী বলেন, খুলনার বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি ও পুলিশ কমিশনার ভোট জালিয়াতির মাস্টারমাইন্ড। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেটিরই প্রতিফলন নগরবাসী লক্ষ্য করেছে। গত সিটি নির্বাচনে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে খুলনা মহানগরে ৩৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে এসে ৯৬ কেন্দ্রে দায়িত্ব দেয়া হয়। তাদেরকে দিয়ে অভিনব কায়দায় ভোট জালিয়াতির দৃশ্য নগরবাসীর কাছে পরিলক্ষিত হয়েছে। গত সিটি নির্বাচনে সাবেক একজন সেনা কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর বার্তা নিয়ে খুলনায় আসেন। তিনি উর্দ্ধতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে অনানুষ্ঠানিক এক বৈঠকে মিলিত হয়ে প্রধানমন্ত্রীর বার্তাটি পৌঁছিয়ে দেন। সে সময় খুলনায় মানুষের মুখে মুখে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে যে, কে এই সাবেক সেনা কর্মকর্তা। এরকম ঘটনা এবারো পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। খুলনা সিটি নির্বাচনের সময় গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতো বিশেষ একটি গোয়েন্দা সংস্থা এবং র্যাকব। গত চার দিন ধরে খুলনার ৬ থানার ওসি গভীর রাতে অফিসের মতো একটি বাসায় ঢুকে এবং ভোরের দিকে বেরিয়ে যায়- ঘটনাটি জনমনে রহস্য ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এছাড়া হবিগঞ্জ জেলা, ফেনী জেলা, গাইবান্ধা জেলা, যশোর জেলা, বগুড়া জেলায় বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান রিজভী। এসব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারসহ অবিলম্বে তাদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান তিনি।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech