ফুলবাড়ীয়ায় ২৬২ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুটি খেলা, লাখো মানুষের জমায়েত ঘিরে উৎসবের আমেজ

  

পিএনএস, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি : ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় দেওখোলা ইউনিয়নের লক্ষীপুর জমিদার আমলের তালুক-পরগনা সীমানায় পৌষের শেষ বিকেলে রোববার (১৩ জানুয়ারি) বসছে ২৬২ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুটি খেলার আসর। এই দিনটি অনুষ্ঠানের জন্য এমনভাবে নির্ধারিত যে নতুন করে আর কোনো দিনক্ষণের প্রয়োজন পড়ে না। সময়মতো লাখো মানুষের জমায়েত ঘটে চিরচেনা এই খেলার মাঠে।

এরই মধ্যে প্রতি বাড়িতে নাইওরি এসে গেছে, নতুন জামা কাপড় পড়েছে সবাই, ইতোমধ্যে পিঠাপুলি বানানোর সমস্ত আয়োজন শেষ করছেন গ্রামের গৃহবধূরা। উৎসবে জবাই করা হবে যে গরু, তাও আনা হয়েছে কিনে। বাদ্যযন্ত্র ঠিক করা হয়েছে, ভোর হতেই উচ্চ স্বরে মাইক বাজবে। উপলক্ষ্য একটাই পৌষের শেষ বিকালে বসছে ২৬২ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুটি খেলার আসরকে কেন্দ্র করে এ উৎসবের আয়োজন।এসময় ঠিকঠাক করে সুর তোলা হবে পুরনো বাদ্যযন্ত্রে।

যেভাবে খেলা চলে ও পূর্ব ইতিহাস-

পিতলের তৈরি ১ মণ ওজনের গুটি করায়াত্ত করে নিজ গ্রামে নিয়ে গুম করা পযন্ত চলে এই খেলা। আর এই খেলাকে কেন্দ্র করে ফুলবাড়ীয়া উপজেলার গ্রামে গ্রামে চলে অন্যরকম উৎসাহ উদ্দীপনা। গোটা পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। ফুলবাড়ীয়ার লক্ষীপুর ও দশ মাইলের মাঝামাঝি বড়ই আটা বন্ধে (মাঠে) খেলার কেন্দ্রস্থল। বিকেল চারটার দিকে খেলা শুরু হয়। সকাল থেকে ফুলবাড়ীয়া ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ত্রিশাল, মুক্তাগাছা উপজেলার লোকজন আসতে থাকে লক্ষ্মীপুর বড়ই আটা বন্ধে। সড়কের অদূরে ভাটিপাড়া, বালাশ্বর, তেলিগ্রামের সংযোগস্থল নতুন সড়ক লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।

এলাকাবাসির সাথে কথা বলে জানা যায়, মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্তের সাথে ত্রিশালের বৈলরের হেম চন্দ্র রায় জমিদারের জমির পরিমাপ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিদার আমলের শুরু থেকেই তালুকের প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল ১০ শতাংশে, পরগনার প্রতি কাঠা জমির পরিমাপ ছিল সাড়ে ৬ শতাংশে। একই জমিদারের ভূখন্ডে দুই নীতির প্রতিবাদে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে। জমির পরিমাপ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ মীমাংসার জন্য লক্ষ্মীপুর গ্রামের ‘বড়ই আটা’ নামক স্থানে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় এই গুটি খেলার। শর্ত ছিল, গুটি যে দিকে যাবে তার হবে তালুক, পরাজিত অংশের নাম হবে পরগনা। জমিদার আমলের গুটি খেলায় মুক্তাগাছা জমিদারের প্রজারা বিজয়ী হন। তালুক পরগনার সীমান্তে জিরো পয়েন্টে ব্রিটিশ আমলে জমিদারী খেলার গোড়াপত্তন।

আমন ধান কাটা শেষে, বোরো ধান আবাদের আগে প্রজাদের শক্তি পরীক্ষার জন্য জমিদারদের এই পাতানো খেলা সেই থেকে চলছে বছরের পর বছর ধরে। প্রতিবারে মতো এবারো ২৬২ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুটি খেলা কাল রোববার পৌষের শেষ বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সকল আয়োজন ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে আয়োজক সূত্রে জানায়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার আব্দুল খালেক জানান, গুটি খেলা ফুলবাড়ীয়া উপজেলার একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খেলা। খেলাকে ঘিরে গ্রামে বিরাজ করে উৎসবের আমেজ।

দেওখোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান হাদী জানান, এ অঞ্চলে এটি একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলা। আর গ্রামে এখন আগের মতো খেলাধুলা না থাকায় গুটি খেলায় হাজারও দর্শকের সমাগম হয়।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল




 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech