মৃত্যুর আগে যা বলে গিয়েছেন সেই মা!

  

পিএনএস ডেস্ক :ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাসপাতালের ছাদ থেকে ফেলে নবজাতক সন্তানকে হত্যার পর ঝাঁপ দিয়ে মায়ের আত্মহত্যার ঘটনায় জনমনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই সর্বত্র একই আলোচনা, কী কারণে নবজাতককে হত্যার পর সীমা আত্মহত্যা করলো?

শুক্রবার (১৯ অক্টোবর) সকালে জেলা শহরের পুরাতন জেলরোডের দি ল্যাব এইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালের ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে সীমা আক্তার (২৫) নামের এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার আগে ৪ দিন আগে জন্ম নেওয়া তার ছেলে শিশু সন্তানকে ছাদ থেকে ফেলে হত্যা করেন তিনি।

সিজারিয়ান অপারেশনের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের লাইফ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার শিশু ও জেনারেল হাসপাতালে ৩০২ নম্বর কক্ষে চিকিৎসাধীন ছিলেন সীমা। তার পাশের ৩০৩ নম্বর কক্ষে থাকা ফরিদা খাতুন বলেন, শুক্রবার (১৯ অক্টোবর) সকালে আত্মহননের আগের রাতে দীর্ঘ সময় সীমা কার সঙ্গে যেন মোবাইল ফোনে ঝগড়া করেছিলেন। তার ছেলেটিও রাতভর চিৎকার করেছে। কাকে যেন সীমা মোবাইল ফোনে বলছিলেন, ‘যা তরে দিয়া যামু। সকালে দেখবা আমি কি করি।’

সীমা আক্তার সদর উপজেলার বাসুদেব ইউনিয়নের ঘাটিয়ারা গ্রামের লেবানন প্রবাসী মনির মিয়ার স্ত্রী। এ ঘটনায় সদর মডেল থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।

সীমার বাবা আখাউড়া উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের কল্যানপুর গ্রামের শ্যামায়ন মিয়া বলেন, ‘পারিবারিকভাবে যৌতুক ছাড়াই সীমার বিয়ে হয়। ছেলে পক্ষও কোনো কিছুর দাবি করেনি তখন। আমরা আর্থিকভাবে খুবই অস্বচ্ছল হওয়ায় বিয়ের সময় সীমাকে তেমন কিছু দিতে পারিনি। কিছু দিতে না পারার কারণে শ্বশুরবাড়ির লোকজন সীমাকে সব সময় মানসিক নির্যাতন করতেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘ঘটনার আগের রাতে বাবার বাড়ি থেকে কিছু দেওয়া বিয়য়টি নিয়ে স্বামীর সঙ্গে সীমার ঝগড়া হয়। এ সময় সম্ভবত মনির হাসপাতালের বিল দিতে পারবে না বলে জানায় এবং শিশুটির পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এ জন্য সীমা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে।’

সীমার দাদি আমেনা খাতুন ডিংরাজের অভিযোগ, সীমা বাবার বাড়ি আসতে চাইলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন অনুমতি দিতে চাইতেন না। শ্বশুরবাড়িতে অনেকের অনুমতি নিয়ে চলতে হতো তাকে।

তিনি বলেন, ‘গরিব বইল্যা নাতিনডারে কইছিলাম কোনো মতে সংসারটা করতে। মরছে পরেও শ্বশুরবাড়ির কেউ একবার আইয়্যা দেখছে না।’

আখাউড়া উত্তর ইউনিয়ন পরিষদ সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য সালমা বেগম বলেন, ছেলে পক্ষের যৌতুকের দাবি না থাকলেও কিছু দিতে না পারার কারণে মেয়েটাকে তারা প্রায়ই অপমান করতেন। সীমা তার দাদিকে প্রায় বলতো, আমারে বিয়া দিছ একটা স্বামীর কাছে আর আমার এহন ১২ জন গার্জেন বিছাইরা বাইরা কইরা বাড়িত আওয়ন লাগে (অনেক অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে আসতে হয়)।

নিহতের স্বামী মনিরের বড় ভাই শামীম ভূঁইয়ার স্ত্রী লায়লি আক্তার বলেন, বিয়ের সময় সীমা বাবার বাড়ি থেকে একটি আংটিও আনেনি। সব ঠিকই ছিল। মনিরের সঙ্গে সীমার কোনো ঝগড়া হয়নি।

এদিকে, হাসপাতালের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ও পথচারীদের কাছে থাকা মোবাইলের ভিডিও ফুটেজ থেকে দেখা গেছে, গত শুক্রবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে নবজাতক ছেলেকে কোলে নিয়ে সীমা ৩০২ নম্বর কক্ষ থেকে বের হয়ে কিছুক্ষণ এদিকে-ওদিক হাঁটাহাঁটি করে লাইফ কেয়ার হাসপাতালের ভেতরের সংযোগ সিঁড়ি দিয়ে পাশের দি ল্যাব এইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড স্পেশালাইজড হাসপাতালে যান। ওই হাসপাতালের পাঁচ তলার ছাদে উঠে নবজাতককে নিচে ফেলে দেন। এসময় রাস্তায় থাকা লোকজন তাকে লাফ দিতে নিষেধ করতে থাকলেও মুহূর্তের মধ্যেই হাসপাতালের ছাদে শুয়ে তিনি গড়িয়ে নিচে পড়ে যান। এতে ঘটনাস্থলেই মা-ছেলের মৃত্যু হয়।

পুলিশ, নিহতের পরিবার ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ অক্টোবর প্রসব ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর রাতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সীমা একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। শুক্রবার ৯টার দিকে তার বাড়ি ফেরার কথা ছিল।

হাসপাতালের বিল দিতে না পেরে সীমা এ কাজ করেছেন বলে প্রথম দিকে শোনা গেলেও অনুসন্ধানে এর কোনো সত্যতা মেলেনি।

এ বিষয়ে কথা হয় হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন খানের সঙ্গে। বিল সংক্রান্ত জটিলতার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমরা রোগীর হাতে কোনো বিল দেইনি। বিল দেওয়ার কথা ছিল সকাল ১০টার পরে। আর ঘটনাটি ঘটেছে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম বাবু জানান, এই ঘটনার তদন্ত চলছে। আমরা মোবাইল কল লিস্টসহ সকল বিষয় তদন্ত করব। তদন্ত ছাড়া কী কারণে ঘটনাটি ঘটলো তা বলা যাচ্ছে না।

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech