শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর একটি নির্বাচন চান নোয়াখালীর মানুষ

  

পিএনএস, নোয়াখালী প্রতিনিধি : বাংলাদেশের একমাত্র জেলা নোয়াখালী যার নিজের নামে কোনো শহর নেই। মাইজদী নামে পরিচিত জেলা শহর। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত এ জেলার অর্থনীতি মূলত কৃষির উপর নির্ভরশীল। জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। জেলায় ভারি তেমন কোনো শিল্প কল কারখানা গড়ে না উঠলে এ জেলার অনেকে দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তবে জেলার বেগমগঞ্জ ও সোনাপুরে গড়ে উঠেছে বিসিক শিল্প নগরী। এক সময় আল-আমিন গ্রুপের একাধিক উৎপাদন থাকলেও বর্তমানে বন্ধ। তবে রয়েছে গ্লোব গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠান। এছাড়া জেলার দক্ষিণাঞ্চলে ইদানিং পল্ট্রি শিল্প গড়ে উঠছে চোখে পড়ার মতো। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন ও সার্জেন্ট জহুরুল হক, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ আ.লীগের সাবেক সভাপতি আবদুল মালেক উকিল, আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদ, জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এ জেলারই সন্তান। দেশের শীর্ষ রেমিটেন্স পাঠানো জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম নোয়াখালী। নয়টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ জেলার আয়তন ৪ হাজার ২০২ দশমিক ৭০ বর্গকিলোমিটার। এ জেলার সংসদীয় আসন ৬টি। মোট ভোটার ২১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৮৪। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১০ লাখ ৯৬ হাজার ১০৮, নারী ভোটার ১০ লাখ ৫১ হাজার ৫৭৩ জন।

১৯৯১ থেকে ২০১৪ এর নির্বাচন পর্যন্ত কোন আসনে কোন দল নির্বাচিত হয়েছেন তার তালিকা :
আসন-১, ১৯৯১ বিএনপি, ১৯৯৬- বিএনপি, ২০০১- বিএনপি, ২০০৮- বিএনপি, ২০১৪- আ.লীগ। আসন- ২, ১৯৯১ বিএনপি, ১৯৯৬- বিএনপি, ২০০১- বিএনপি, ২০০৮- বিএনপি, ২০১৪- আ.লীগ। আসন- ৩, ১৯৯১ বিএনপি, ১৯৯৬- বিএনপি, ২০০১- বিএনপি, ২০০৮- বিএনপি, ২০১৪- আ.লীগ। আসন- ৪, ১৯৯১ বিএনপি, ১৯৯৬- বিএনপি, ২০০১- বিএনপি, ২০০৮- আ.লীগ, ২০১৪- আ.লীগ। আসন- ৫, ১৯৯১ জাতীয় পার্টি, ১৯৯৬- আ.লীগ, ২০০১- বিএনপি, ২০০৮- আ’লীগ, ২০১৪- আ.লীগ। আসন- ৬, ১৯৯১ আ.লীগ, ১৯৯৬- বিএনপি, ২০০১- স্বতন্ত্র, ২০০৮- স্বতন্ত্র, ২০১৪- আ.লীগ।

নোয়াখালী জেলাতে স্বাধীনতা পরবর্তী বেশিরভাগই বিএনপির কর্তৃত্ব থাকলেও বর্তমানে পুরোটাই আ.লীগের দখলে। আবারও তাই ভোটের মাঠে লাড়াইয়ের প্রস্তুতি চির প্রতিদ্বন্ধী দুই দল আ.লীগ ও বিএনপির। তবে আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে নতুন প্রত্যাশার কমতি নেই। এবারের নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে নোয়াখালী বিভাগ বাস্তবায়ন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন, নোয়াখালী পৌরসভা ও পার্শ্ববর্তী বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী পৌর শহরকে নিয়ে নোয়াখালী সিটি করপোরেশন, সোনাপুর-চেয়ারম্যানঘাট পর্যন্ত রেল লাইন প্রসস্ত করণ, নোয়াখালীতে নতুন রেল বা রেলের নতুন বগি স্থাপন, নোয়াখালীতে প্রস্তাবিত বিমানবন্দর স্থাপন, ইপিজেড স্থাপন, একটি সরকারি ক্যাডেট কলেজ ও একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নির্মাণ অন্যতম। অনেকের মতে জেলার আনাচে-কানাচে নতুন সড়ক পাকা করণ করা হয়েছে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজে নতুন ভবন হয়েছে। এক কথায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে বেশি। কৃষি অঞ্চল হলেও কৃষিতে তেমন উন্নতি হয়নি। তবে কয়েক বছর পূর্বে সুবর্ণচরে নির্মিত হয়েছে বিএডিসির তেল বীজ বর্ধন খামার। জেলার কৃষির উন্নয়নে নিয়মিত খাল খনন, নতুন দীঘি নির্মাণ ও নতুন খাল খননের দাবী জানিয়ে কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

দেশের রাজনীতির হাল হকিকত যাই হোক না কেনো নোয়াখালী জেলার রাজনীতিতে রাষ্ট্র ক্ষমতায় সমাসীন আর ক্ষমতাহীনদের একটি চমৎকার সহাবস্থান বেশিরভাগই ছিলো। সে কারণে জেলায় উল্লেখ করার মত রাজনৈতিক সহিংসতা নেই বলেলেই চলে। একইভাবে বড় দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বড় ধরনের কোনো আভ্যন্তরীণ কোন্দল নেই। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে নোয়াখালী-৬ আসনে আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে হাতিয়া আওয়ামী লীগ দ্বীধা বিভক্ত।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই নোয়াখালী অঞ্চলে আওয়ামীলীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নির্বাচনী তৎপরতা বাড়ছে। এমন প্রচার প্রচারনায় আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টি এগিয়ে থাকলেও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ বিএনপি দৃশ্যত কোনো প্রচার প্রপাগান্ডায় এখনো অনেকটা আড়ালেই। স্ব স্ব রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত ও মনোনয়নের অপেক্ষায় বসে নেই কেউ। এরইমধ্যে শুরু হয়ে গেছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রাপ্তির চেষ্টা। স্ব স্ব এলাকায় চলছে সম্ভাব্য প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা, নির্বাচনী প্রস্তুতি সভা। এদিকে বিএনপির নব গঠিত কমিটি তাদের পুরনো শক্তি এবং আসনসমূহ ফিরে পেতে অনেকটা নিরবেই কাজ করছেন।

জেলার ৬টি আসনে নোয়াখালী ৪ আসন (সদর-সুবর্ণচর) ও নোয়াখালী-৫ (কোম্পানিগঞ্জ-কবিরহাট) আসন ছাড়া বাকি ৪টি আসনেই আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী কেন্দ্রে মনোনয়নের জন্য আর এলাকায় নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় ব্যস্তসময় পার করছেন। নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে হাতিয়া আওয়ামী লীগ দ্বীধা বিভক্ত হয়ে আছে। বর্তমান সংসদ সদস্য আয়শা ফেরদৌস ও তার স্বামী সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলীর বিরু্েদ্ধ বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্ত বিস্তার করতে গিয়ে তিনি হাতিয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছেই অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিতে পরিনত হচ্ছেন বলে মনে করেন দলেরই নেতাকর্মীরা। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সাবেক সাংসদ মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে ভূমি দখল, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডসহ বিভিন্ন অপকর্মের ফিরিস্তি প্রকাশিত হওয়ায় বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়।

জাতীয় নির্বাচনে এবারের নতুন ও তরুণ ভোটার নজরুল ইসলাম (২২) জানান, আমার প্রত্যাশা হচ্ছে একটি অবাধ ও নিরোপেক্ষ নির্বাচন। যেখানে আমি প্রথমবারের মত সুন্দরভাবে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ব্যলটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারি। হাতিয়ার চর কিং ইউনিয়নের মোহাম্মদ জাফর উ্িদ্দন (৩২) জানান, সন্ত্রাস ও প্রভাব মুক্ত নির্বাচন দেখতে চাই। অতীতের মত কেন্দ্র দখল বা সংঘাতময় নির্বাচন দেখতে চাই না। সুবর্ণচর উপজেলার চরবাটার আজাদুল ইসলাম (৪২) জানান, বহু আকাঙ্খিত এবারের নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠ হোক এটাই আমাদের দাবি। নোয়াখালী সদর উপজেলার বিনোদপুর গ্রামের তরুণ ভোটার সাজ্জাদুর রহমান বলেন, গত নির্বাচনে আমরা ভোট দিতে পারিনি। এবার যেনো আমার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারি।

খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক (খানী)’র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম মাসুদ বলেন, বিগত বছরগুলোতে জেলার বিভিন্ন স্থানে সড়ক, পুল, স্কুলভবন, দালানকোঠা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। আমি মনে করছি, আগামি নির্বাচনে মানুষ এর বাইরেও এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও দুনীর্তিকে সবচেয়ে বেশি বিবেচনায় নেবেন। নোয়াখালী জেলায় প্রায় প্রতি দশজনে একজন মানুষ বিদেশে থাকেন, ফলে এখানে প্রবাসী শ্রমবাজারের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা, হাতিয়ার সাথে নোয়াখালী শহরের যোগাযোগ আরো আধুনিক ও নিরাপদ করা, জনপরিসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি, সকল ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক দলীয়করণ ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। তাছাড়াও, নোয়াখালী একমাত্র জেলা যেখানে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কোন পার্ক বা শিশুদের বিনোদনের জায়গা নেই। জেলার প্রায় এক তৃতীয়াংশ জমি বছরজুড়ে জলাবদ্ধ বা অনাবাদি থাকছে। দক্ষিণাঞ্চলে মানুষের যোগাযোগের জন্য ১০ বছর আগে হাতিয়া চেয়ারম্যান ঘাট পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের কথা বললেও সে বিষয়ে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এসকল বিষয় আগামি নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করছি।

নোয়াখালী জেলার সংস্কৃতজন তেল গ্যাস বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির জেলা আহবায়ক আনম জাহের উদ্দিন বলেন, নির্বাচন হলো গণতান্ত্রিক অনেকগুলো ব্যবস্থার মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর দেশের জনগণ স্বাধীন মতামতের মধ্যদিয়ে ব্যাক্তি ও দলের উপর দায়িত্ব অর্পণ করেন। এখন আশঙ্কা হলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা কতটুকু স্বাধীনভাবে আমি আমার মতের অভিব্যাক্তি প্রকাশ করতে পারবো? ইতোমধ্যে শাসক দল একতরফাভাবে নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় নেমে গেছে। শাসক দল ব্যতিত অন্য দলগুলো নির্বাচনী কর্মকান্ডতো দূরের কথা তাদের দলের নিয়মিত কর্মকান্ডও পরিচালনায় বিঘœ হচ্ছে। সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, সামাজিক শক্তি ও ভোটারদের উইনওভার করতে পারবে কি না এটা আমার শঙ্কা আছে।

এলাকার উন্নয়ন পশ্নে তিনি বলেন, উন্নয়ন শুধু অবকাঠামোকে বোঝায় না। এলাকার আর্থসামাজিক, রাজনীতি, আইনের ব্যবস্থা, শাসন ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, জনগণের সকল মৌলিক মানবিক অধিকারসহ সামগ্রিক বিষয়টিই উন্নয়ন। ধরুণ একটা খন্ডিত বিষয় – পদ্মা সেতু। এমন দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা বলি, তেল গ্যাস বন্দরের কথা বলি তাহলে দেখবেন এখানে উন্নয়নের চেয়ে জনগণের স্বার্থ বিঘিœত হয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সুবর্ণচর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ খায়রুল আনম সেলিম বলেন, আমরা চাই নির্বাচন কমিশনের অধিনে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। সকল দলের অংশগ্রহণে একটি উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হোক। আগামি নির্বাচনকে সামনে রেখে দলগতভাবে আমরা সম্পুর্ণভাবে প্রস্তুত। জেলার সামগ্রিক উন্নয়ন ও নির্বাচন দুটোতেই আমরা আছি। আমাদের নেত্রী যাকেই মনোনয়ন দেবেন আমাদের কর্মী বাহিনী তার বিজয়ের জন্যই কাজ করবে। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে ছোট খাটো কিছু সমস্যা থাকতেই পারে। এটা কোনো সমস্যা নয়। জেলার কয়েকটি আসনে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন চাইছেন, এ বিষয়ে আমাদের নেত্রীর সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত হবে।

একসময় নোয়াখালী অঞ্চলকে বলা হতো বিএনপির ঘাঁটি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ৪টি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। অন্যদিকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৬টি আসনে জয়ী হয়। এরমধ্যে ৫টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনে ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছিলো তিনটি, আওয়ামী লীগ দুটি এবং একটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হন। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পাঁচটি এবং একটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হন। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পাঁচটি, আওয়ামী লীগ একটিতে জয়ী হয়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির জেলা ও শীর্ষ প্রর্যায়ের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য একেবারেই স্পষ্ট। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আবদুর রহমান বলেন, দলীয় নেতাকর্মীরা হামলা, মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে থাকলেও আমাদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী। বিএনপি নির্বাচনমূখী দল। বিএনপির মত বড় দলের ক্ষেত্রে নির্বাচন করার জন্য অতিরিক্ত প্রস্তুতি গ্রহণের দরকার নেই। তবে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্তের বাইরে আমাদের যাবার সুযোগ নেই। জেলা বিএনপি ঐক্যবদ্ধ। আমাদের মধ্যে কোনো দলীয় কোন্দল নেই। জেলার ৬টি সংসদীয় আসনে দল যাকেই মনোনয়ন দেবে তার জন্যই সকলে কাজ করবো। আগামী নির্বাচনে নোয়াখালীর ৬টি আসনের মধ্যে ৫টিতে বিএনপি প্রার্থী পরিবর্তন হবার সম্ভাবনা নেই। কেবলমাত্র হতিয়া আসনে পরিবর্তন হতে পারে।

নির্বাচনের মাঠ যতই সরগরম হোক বা সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজের প্রার্থীতা জানান দিতে প্রচার প্রচারণায় ব্যস্ত সময় কাটালেও দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের বাইরে যাবার কারো সুযোগ নেই এমনটাই জানালেন জেলার নেতৃবৃন্দ। আবার সাধারণ মানুষ ও নাগরিক ভাবনায় যে প্রত্যাশা ফুটে উঠেছে তা হলো একটি সুষ্ঠু সুন্দর, নিরোপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।

প্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে :
নোয়াখালী ১ (চাটখিল- সোনাইমুড়ি একাংশ) : এ আসনে বর্তমানে সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এইচ এম ইব্রাহীম। তিনি দীর্ঘদিন থেকে এলাকায় উন্নয়ন কর্মকান্ড ও দলীয় নেতা-কর্মীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি দলের সম্ভাব্য প্রার্থী। দলীয় মনোনয়ন চাইতে পারেন আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার রুহুল আমীন ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম। এছাড়া এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক ছাত্রনেতা তরুণ শিল্পপতি ম্যাপচৌ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসীম উদ্দীন আরমান। দলীয় মনোনয়ন পেতে সম্ভাব্য প্রার্থীরা তৃণমূলে বিভিন্ন কর্মকান্ডের পাশাপাশি কেন্দ্রের সাথেও সমন্বয় রাখছেন। অন্যদিকে এ আসনে বিএনপি থেকে সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। দলীয় সূত্র মতে তার প্রার্থীতার সম্ভাবনা অনেকটাই নিশ্চিত। দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে তার। এ ছাড়া বিএনপি থেকে সাবেক সংসদ সদস্য এডভোকেট সালাউদ্দিন কামরানও মনোনয়ন চাইতে পারেন।

নোয়াখালী-২ (সেনবাগ-সোনাইমুড়ি একাংশ) : এ আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য শিল্পপতি মোরশেদ আলম। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনিও দলের মনোনয়ন চাইবেন। আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করতে চান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ। এছাড়া নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও তমা গ্রুপের চেয়ারম্যান শিল্পপতি আতাউর রহমান ভূইয়া মানিক সম্ভাব্য প্রার্থী। তারা দীর্ঘদিন থেকে এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ ও উন্নয়ন কর্মকান্ডে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। অন্যদিকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে একক প্রার্থী হিসেবে রয়েছে দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক। তিনি নিয়মিত এলাকার নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। মনোনয়নের চেষ্টা করছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা কাজী মফিজুর রহমান। জাতীয় পার্টি থেকে সাবেক ছাত্রনেতা জেলা জাতীয় পার্টির সহ সভাপতি সেনবাগ উপজেলার আহবায়ক হাসান মঞ্জুর একক প্রার্থী হিসেবে মহাজোট থেকে দলীয় মনোয়ন চাচ্ছেন। এবং এলাকায় গণসংযোগ করছেন।

নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) : এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য গ্লোব গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশিদ কিরণ। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলের মনোনয়নের প্রত্যাশায় এলাকায় গণসংযোগ করছেন। এ ছাড়াও দলের মনোনয়ন পেতে কাজ করছেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভপাতি মিনহাজ আহমেদ জাবেদ। বেগমগঞ্জের উন্নয়নে তার ভূমিকা রয়েছে। এ ছাড়াও ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এনায়েত উল্লাহ ও চৌমুহনী পৌরসভার মেয়র আখতার হোসেন ফয়সলের নামও শোনা যাচ্ছে। বিএনপি থেকে একক প্রার্থী হিসেবে নেতা-কর্মীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক সংসদ সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু। তিনি এলাকার উন্নয়নেও ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছেন। নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। মামলাজনিত কারণে তিনি নির্বাচন না করতে পারলে তার সহধর্মিণী শামীমা বরকত লাকী নির্বাচন করবেন বলে জানা গেছে।)

নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) : এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মো. শাহজাহানকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরই মধ্যে তিনি জেলায় রাজনৈতিক অবস্থান অনেক সুসংহত করেছেন। নেতা-কর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও তিনি দলের একক প্রার্থী হিসেবে গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে বিএনপির হেভিওয়েট একক প্রার্থী হিসেবে নেতা-কর্মীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও তৃণমূল বিএনপি পূণর্গঠনের সমন্বয়ক মো. শাহজাহান। এই আসনে বিকল্পধারার কেন্দ্রীয় মহাসচিব ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেজর (অব.) আবদুল মান্নানও নির্বাচন করতে পারেন এমন গুঞ্জন রয়েছে।

নোয়াখালী-৫ (কোম্পানীগঞ্জ-কবিরহাট) : নোয়াখালীতে এ আসনকে ‘ভিআইপি’ আসন বলা হয়। এই আসনে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হলেও নিজ সংসদীয় এলাকার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যেও তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। অন্যদিকে তার বিপরীতে এ আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী সাবেক আইনমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনিও দলের একক প্রার্থী হিসেবে নিয়মিত এলাকায় যোগাযোগ রাখছেন। ভিআইপি প্রার্থী দুজনই এলাকায় গণসংযোগসহ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করছেন।

নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) : এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের আয়েশা ফেরদৌস। আগামি নির্বাচনে তিনি দলের মনোনয়ন চাইবেন। এ ছাড়াও তার স্বামী সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী, সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক ওয়ালী উল্লাহ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি শিল্পপতি মাহমুদ আলী রাতুল ও জেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ সম্পাদক আমির হোসেনও মনোনয়ন প্রত্যাশী। অন্যদিকে এই আসনে জেলা বিএনপির সহ সভাপতি ও হাতিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি শিল্পপতি মো. আলাউদ্দিন মনোনয়নের জন্য এগিয়ে আছেন। দলীয় বিভিন্ন কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত থেকে এলাকায় কর্মী সমর্থকদের আস্থা অর্জন করেছে। স্বতন্ত্র সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী ফজলুল আজিমও একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। তবে দলীয়ভাবে নাকি সতন্ত্র প্রার্থী হবে সে বিষয়টি স্পস্ট নয়।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech