নতুন সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক

  


পিএনএস ডেস্ক: প্রতিরক্ষা দফতর গত ১ জুন তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এতে ২০১৭ সালে প্রথম প্রণীত অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি জোরদার ও সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। ২০১৯ সালের স্ট্র্যাটেজিতে আরো অনেক কিছুর সাথে যুক্তরাষট্র-ভারত সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, এগুলোকে অভিন্ন স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনগণ পর্যায়ে জোরালো সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

এটা স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী ধারাটি (যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত নানা কারণে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নত করতে চাইছে) অব্যাহত রাখা হয়েছে। দুই দেশ ১৯৯৫ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। এরপর ২০০৫ ও ২০১৫ সালে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা কাঠামো চুক্তি করে। দ্বিতীয় বুশ প্রশাসনের সময় দুই দেশ সন্ত্রাসপ্রতিরোধ, পরমাণু সহযোগিতা, চীনের উদীয়মান প্রভাবের মতো অভিন্ন উদ্বেগের মতো ইস্যুর ওপর জোর দিয়ে তাদের সম্পর্ক আরো গভীর করে। এছাড়া ২০১৬ সালে ওবামা প্রশাসন ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদারের মর্যাদা দেয়।

আরো সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৮ সালে দুই দেশের মধ্যকার ২+২ মিনিসটেরিয়াল ডায়ালগের সূচনা করেন। এর জের ধরে নয়া দিল্লি ও ওয়াশিংটন কমিউনিকেশন্স কম্প্যাটিবিলিটি অ্যান্ড সিকিউরিটি এগ্রিমন্ট (সিওএমসিএএসএ) সই করে। এটি ছিল দুই দেশের মধ্যকার তিনটি লজিস্টিকস চুক্তির দ্বিতীয়।

এসব ইতিবাচক ধরার আলোকে মনে হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক কার্যত একটি জোটে পরিণত হয়েছে, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মোকাবিলায় দেশ দুটি তাদের সম্পর্ক আরো গভীর করেছে। অবশ্য এই চিত্রের উল্টা দিকও আছে।

যেকোনো সার্বভৌম দেশের মতো ভারতও তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ অনুসরণ করে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামঞ্চস্যপূর্ণ হতেও পারে, নাও হতে পারে। বিশেষ করে নয়া দিল্লি তার পররাষ্ট্রনীতিতে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করেছে। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের এতে বিস্মিত হওয়া উচিত হবে না।

বিপদ হলো এই যে মার্কিন পক্ষ হয়তো যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক নিয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। এই সম্পর্ককে রূপকভাবে উপস্থাপন করে বলা যেতে পারে যে অনেক আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ককে বিয়ের আগেকার প্রণয়ের সাথে তুলনা করতে পারে এবং অনেক ভারতীয় কৌশলবিদ একে বিয়ের বাধ্যবাধকতাপূর্ণ আইনগত প্রতিশ্রুতিহীন দীর্ঘ মেয়াদি প্রণয় হিসেবে অভিহিত করতে পারে।

অধিকন্তু এ ধরনের সম্পর্কে উভয় পক্ষকে প্রাক-অস্তিত্বশীল বন্ধুত্ব ও তাদের পার্টনারদের হবু স্বজনদের সাথে মানিয়ে নিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভারতের পূর্বেকার বন্ধু ইরান ও রাশিয়াকে গ্রহণ করতে হবে। কারণ এ দুটি দেশের সাথে ভারতের দীর্ঘ মেয়াদি স্বার্থ রয়েছে।

ইরানের ব্যাপারে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিচ্ছে, এই দেশ থেকে তেল আমদানি না করতে। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কয়েক শ’ বছর ধরে ভারত ও ইরানের মধ্যে থাকা বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সম্পর্ককে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফারসি ভাষাকে ভারতীয় ভাষাগুলোর আদিভাষা বিবেচনা করা হয়। অধিকন্তু ফারসি সাহিত্য, কবিতা, শিল্পকলা ও স্থাপত্যের সাথে ভারতের ব্যাপক মিল রয়েছে।

একইসাথে রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্ক সেই স্নায়ুযুদ্ধ আমলের। এ সময় অনেক ইস্যুতে রাশিয়া ও ভারত একই অবস্থানে ছিল। মার্কিন নির্দেশনায় এই সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার নয়।

অবশ্য দীর্ঘ মেয়াদে এস-৪০০ বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রব্যবস্থা নিয়ে রাশিয়ার ওপর ভারতের অব্যাহত নির্ভরশীলতা নিয়ে ওয়াশিংটন উদ্বিগ্ন। মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ভারত ও রাশিয়ার মধ্যকার অস্ত্র চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সামরিক সম্পর্কে বাধার সৃষ্টি করতে পারে। অধিকন্তু, এ ধরনের অস্ত্র হস্তান্তর সিএএটিএসএ (কাউন্টারিং আমেরিকাস অ্যাডভারসারিস থ্রো স্যাঙ্কশনস অ্যাক্ট) হিসেবে পরিচিতি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন।

তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ এবং আগামীতে তা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু তবুও বিস্মৃত হওয়া উচিত হবে না যে দিনের শেষে বেশির ভাগ ভারতীয়ই জোট নিরপেক্ষতা, বহুপক্ষীয় বা স্রেফ নিরপেক্ষতার নীতিমালার পক্ষে অবস্থান করে। অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করার সময় যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট/সাউথ এশিয়ান মনিটর


পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন