যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতার ১৪ দফা প্রকাশ, কার সুবিধা বেশি

  18-06-2026 10:37AM

পিএনএস ডেস্ক: ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ শিরোনামে এক নথিতে ইলেকট্রনিকভাবে সই করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তবে জনসমক্ষে এ চুক্তির শর্ত প্রকাশ না করা নিয়ে বেশ সমালোচনা হচ্ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই যুক্তরাষ্ট্র এটি প্রকাশ করেছে।

মার্কিন প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ১৪ দফার এই নথি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের হাতে তুলে দেন। আল-জাজিরা ও সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হওয়ার ফলে চুক্তির চূড়ান্ত শর্তাবলি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা শুরু হবে।

নথিতে যা রয়েছে :

যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি : ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করবে। এর মধ্যে লেবাননসহ সংশ্লিষ্ট যুদ্ধক্ষেত্রও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। দুপক্ষ ভবিষ্যতে একে অন্যের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক বা শত্রুতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না এবং বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি থেকেও বিরত থাকবে।

দ্বিতীয় দফায় উভয় দেশ একে অন্যের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সম্মান করার অঙ্গীকার করেছে। একই সঙ্গে একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয় দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হবে। উভয় পক্ষের সম্মতিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। এই ৬০ দিনের সময়কালকে অনেক বিশ্লেষক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন, কারণ এখানেই পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলোর চূড়ান্ত সমাধান খোঁজা হবে।

চতুর্থ ও পঞ্চম দফায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্য পথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং তেহরান ৩০ দিনের মধ্যে সমুদ্রপথে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করবে।

অন্যদিকে ইরানও পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এর মধ্যে সমুদ্রে পাতা মাইন অপসারণ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়ও রয়েছে। বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু হওয়া আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

সমঝোতার অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন। ষষ্ঠ দফায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার আঞ্চলিক অংশীদাররা যৌথভাবে ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। এই পরিকল্পনার জন্য কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে এই তহবিল বাস্তবায়নের কাঠামো ৬০ দিনের মধ্যে নির্ধারণ করা হবে। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি ইরানের অর্থনীতির জন্য যুগান্তকারী পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে।

সপ্তম দফায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করেছে। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার গভর্নর বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা আরোপিত প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

খসড়ার অষ্টম দফায় ইরান পুনরায় ঘোষণা করেছে যে, তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে খসড়ায় বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বিষয়সহ পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত অন্যান্য জটিল প্রশ্ন চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনায় নির্ধারণ করা হবে।

নবম দফায় বলা হয়েছে, চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার বর্তমান পারমাণবিক কর্মসূচির অবস্থা অপরিবর্তিত রাখবে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং অঞ্চলে অতিরিক্ত সামরিক শক্তিও মোতায়েন করবে না।

দশম দফায় আরও বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন সেবার জন্য বিশেষ অনুমোদন প্রদান করবে। এর ফলে ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে পুনরায় তেল বিক্রির সুযোগ পাবে।

একাদশ দফায় বলা হয়েছে, আলোচনার অগ্রগতির ভিত্তিতে ইরানের জব্দ বা স্থগিত থাকা অর্থ ও সম্পদ ধাপে ধাপে মুক্ত করে দেওয়া হবে। এই অর্থ ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করা যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লাইসেন্স প্রদান করবে।

দ্বাদশ দফায় চূড়ান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি বিশেষ তদারকি ব্যবস্থা গঠনের কথা বলা হয়েছে।

ত্রয়োদশ দফায় বলা হয়েছে এ সমঝোতা স্বাক্ষরের পর ৪, ৫, ১০ ও ১১ দফার বাস্তবায়ন শুরু হলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত চুক্তির দিকে অগ্রসর হবে।

সবশেষে, চতুর্দশ দফায় বলা হয়েছে যে চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে। এতে চুক্তিটি আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি পাবে এবং উভয় পক্ষের ওপর এর বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা আরও শক্তিশালী হবে।


পিএনএস/এমএইউ

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন